সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকার এম সাইফুর রহমান

প্রফেসর ড. মো: আলিমুল ইসলাম :

প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ। সমাজের সব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি আমৃত্যু কাজ করছেন। দাতাদের সাহায্যনির্ভরতা থেকে অর্থনীতিকে বের করতে বাণিজ্য উদারীকরণ করেছেন। বিদেশি সাহায্য ছাড়াও যে দেশ চলতে পারে দেশের উন্নতি হতে পারে, সেই ধারণাও দিয়েছিলেন সাইফুর রহমান। তিনি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে চালু করেন ভ্যাট আইন।

এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তক এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান রূপকার।দেশের দীর্ঘতম সময়ের ও সফল অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মৌলভীবাজারের বাহার মর্দন থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক মহান রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, দূরদর্শী নেতা এবং দেশের উন্নয়নের একজন পথপ্রদর্শককে হারায়। তার জীবনের কাজ এবং স্বপ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করেছে।

সাইফুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করে এ উপমহাদেশ তথা গোটা বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীত দাঁড় করিয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক বিষয়গুলো ছিল তাঁর নখদর্পণে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশের অর্থনীতিকে শক্ত কাঠামোর উপর দাঁড় করানোর ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। এম সাইফুর রহমান ১৯৩২ সালে তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল বাছিত এবং মা তালেবুননেসা। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন এম সাইফুর রহমান। মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত লন্ডনে পড়াশুনা করেন এবং দি ইনস্টিটিউট অভ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অভ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস (আইসিএইডাব্লিউ) থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টে ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬২ সালে তিনি পেশাজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্যও ছিলেন। তিনি ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সরকারের অর্থ, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ভ্যাট, তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংক-টু-ব্যাংক ঋণপত্র ও বন্ডেড ওয়‍্যারহাউস সুবিধা চালুসহ অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কারে পেইনফুল সিদ্ধান্তগুলো সাইফুর রহমানই নিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে তিনি সবচেয়ে বেশি সংস্কার করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার অন্যতম রূপকার তিনি। ১৯৯৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্নর নির্বাচিত হন। ১৯৮০ – ১৯৮২ মেয়াদে তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, আইএফএডিতেও বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত তিনি এশিয়ানএ উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী ও পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করলে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের প্রায় সব নেতার সাথে তিনিও গ্রেফতার হন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী (অর্থ মন্ত্রণালয়) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৪ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পুনরায় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে মৌলভীবাজার-৩ ও সিলেট-৪ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি সিলেট-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির সাফল্যের সাথে সাইফুর রহমান নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশে মুক্ত বাজার সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রবর্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি স্বপ্ন দেখতেন- গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বেকার সমস্যা দূর করন, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, মানব সম্পদকে দক্ষ করে গড়ে তোলার। তাঁর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন নীতিমালার কারণেই আজ কৃষি, পোল্ট্রি, হ্যাচারী, দুগ্ধ ও গরুর খামার এবং যুব প্রশিক্ষণ সহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রবর্তিত ভ্যালু এডেড টেক্সেস (ভ্যাট), কর ব্যবস্থার সংস্কার, শিল্প ব্যবস্থায় প্রাইভেটাইজেশন এবং উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা বাংলাদেশর অর্থনৈতিক অবস্থার আমুল পরিবর্তন সাধন করেছে। বলা যায় তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিনত করতে তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। তিনি কৃষি ও কৃষকের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন। কৃষকরা যাতে তাদের জীবনমান উন্নত করতে পারে, তা নিয়ে তিনি ভাবতেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, কৃষিই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বস্তিবাসী মানুষের মানবাধিকারের কথাও তিনি বলতেন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে। তিনি প্রবাসীদের বলতেন, বিনিয়োগ হলো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এজন্য তিনি দেশের পর্যটন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প ইত্যাদি খাতে প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার জন্য বলতেন। দেশের আর্থিক নীতি, শিল্প ও বাণিজ্য, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মূলত মানুষ তার কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকে। সাইফুর রহমান তাঁর কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার তাঁর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করছে।

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: