সর্বশেষ আপডেট : ৫২ মিনিট ১৫ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তুরাব হত্যা : একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

১৯ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর দিন। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একজন তরুণ সাংবাদিকের অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি পরিবারের অনন্ত কান্না এবং সংবাদমাধ্যমের জন্য দায়িত্ব পালনের চরম মূল্য দেওয়ার প্রতীক। ২০২৪ সালের এই দিনে সিলেট নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ছররা গুলিতে নিহত হন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার ও জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব (এটিএম তুরাব)।

আজ তাঁর শাহাদাতের দুই বছর পূর্ণ হলো। রাষ্ট্র বদলেছে, সরকার বদলেছে, অনেক রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি একটি প্রশ্ন—শহীদ সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার কবে হবে?

সেদিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের পর সিলেটের বন্দরবাজার ও কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কর্মসূচি চলছিল। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে অন্যদিনের মতোই ক্যামেরা ও নোটবুক হাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তুরাব।

তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ ছিলেন না। তাঁর একমাত্র দায়িত্ব ছিল ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করা, ইতিহাসের জন্য সত্যকে ক্যামেরাবন্দি করা।

কিন্তু মুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি এসে বিদ্ধ করে তুরাবের শরীর। পরে ময়নাতদন্তে চিকিৎসকরা তাঁর শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির চিহ্ন শনাক্ত করেন। গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিভার ও ফুসফুস। মাথাতেও আঘাত ছিল। প্রথমে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলেও সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

একজন সাংবাদিক তাঁর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্যামেরা হাতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের শেষ অ্যাসাইনমেন্ট।

তুরাবের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নতুন সম্ভাবনায় ভরা। মাত্র তিন মাস আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী তানিয়া ইসলাম তখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। তুরাবেরও শিগগিরই যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্য লিখেছিল অন্য গল্প। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্ত্রী স্বামীর শেষ মুহূর্ত কিংবা জানাজাও দেখতে পারেননি। মেহেদির রঙ শুকানোর আগেই তিনি হয়ে যান বিধবা। আজও সেই অপেক্ষা শেষ হয়নি।

সহকর্মীদের কাছে তুরাব ছিলেন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং অত্যন্ত কর্মঠ একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন বিয়ানীবাজারে মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে। পরে দৈনিক জালালাবাদে যোগ দিয়ে ফটোসাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি পান। নিজের মেধা, পরিশ্রম ও সাহসিকতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে জাতীয় দৈনিকের ব্যুরো প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

যারা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তারা বলেন—তুরাব ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী। নতুন কোনো সংবাদ, নতুন কোনো ছবি কিংবা ভালো কোনো রিপোর্ট করতে পারলেই শিশুর মতো আনন্দিত হতেন।

মৃত্যুর আগের দিনও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের ছররা গুলি অল্পের জন্য তাঁকে এড়িয়ে যায়। সহকর্মীদের কাছে সেই ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কেউ ভাবতেও পারেননি, পরদিন একই ধরনের গুলিই তাঁর জীবন কেড়ে নেবে।

তুরাব দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করতেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক ছিল। সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা সাদেক কাউসার দস্তগীরের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—যে সাংবাদিককে পুলিশ চিনত, যার গায়ে স্পষ্টভাবে সাংবাদিক পরিচয় ছিল, তিনিই কীভাবে পুলিশের গুলির লক্ষ্যবস্তু হলেন?

বিচার কতদূর? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।

তুরাব নিহত হওয়ার পাঁচ দিন পর তাঁর বড় ভাই থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও সেটি প্রথমে মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা রুজু হয়।

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।

দুই বছরে গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র দুজন অভিযুক্ত। মামলাটি কোতোয়ালি থানা থেকে পিবিআই হয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তাধীন।

তদন্ত চলছে, সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে, তদন্ত দল বারবার সিলেট সফর করছে—কিন্তু চার্জশিট এখনো হয়নি।

ফলে শহীদ পরিবারের পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা।

একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের অপেক্ষা

তুরাবের মা এখনও ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চান। তাঁর স্ত্রী চান, স্বামী হত্যার বিচার নিজের চোখে দেখতে। ভাই-বোনেরা চান, রাষ্ট্র অন্তত প্রমাণ করুক—দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত একজন সাংবাদিকের রক্ত বৃথা যায় না। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা সেই আশাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

সাংবাদিক হত্যার বিচার শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়

তুরাব হত্যা শুধু একজন ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড নয়। এটি সংবাদপেশার নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্নও।

যে সমাজে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক নিহত হন এবং দীর্ঘ সময়েও বিচার শেষ হয় না, সেখানে অন্য সাংবাদিকদের জন্যও একটি ভয়াবহ বার্তা তৈরি হয়।

একজন ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরাই তাঁর কলম। তুরাব সেই কলম দিয়ে ইতিহাস লিখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস লেখার আগেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন তিনি।

ইতিহাস যেন ভুলে না যায়

বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব।

তিনি অস্ত্র হাতে রাজপথে নামেননি। তিনি গিয়েছিলেন সত্যকে সংরক্ষণ করতে।

আজ তাঁর তোলা অনেক ছবি হয়তো হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাওয়ার নয়।

ন্যায়বিচারই হোক প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি

শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের শাহাদাতের দুই বছর পূর্ণ হলো। এই দুই বছরে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনও বাকি—তাঁর হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

তুরাবকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেটিই হবে তাঁর পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়, সাংবাদিক সমাজের প্রতি সম্মান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আইনের শাসনের একটি শক্তিশালী বার্তা।

শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: