![]()


মারুফ হাসান ::
একটি মনোনয়নপত্র, একটি আসন, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের রাজনৈতিক প্রত্যাশা। শেষ মুহূর্তে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে স্বাভাবিকভাবেই আসে হতাশা। কিন্তু সিলেট বিএনপির কয়েকজন নেতার ক্ষেত্রে গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকেই, চেয়েছিলেন দলীয় মনোনয়ন। শেষ পর্যন্ত দলের টিকিট না পেলেও নির্বাচনের মাঠে দলের প্রার্থীর পাশে থেকেছেন সবাই। এরপর একে একে তাদের কেউ হয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, কেউ জেলা পরিষদের প্রশাসক, কেউ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, কেউ ওয়াসার চেয়ারম্যান, কেউ রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানির পরিচালক। এমনকি একজন পেয়েছেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব।
ফলে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন, নাকি নির্বাচনী মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের অন্যভাবে জায়গা করে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া?
যোগ্য ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে মনে করেন বিএনপির একাধিক নেতা। পক্ষান্তরে বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলের মহোউৎসবে মেতে উঠেছে সরকার।
সিলেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে একের পর এক বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি দখলদার রাজনীতির অংশই মনে করছেন সাধারণ জনগণ।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রত্যাশা ছিল সিলেট-৩ আসন ঘিরে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পান এম এ মালিক।
মনোনয়ন না পাওয়ার পরও কাইয়ুম চৌধুরী থেমে থাকেননি। সিলেট জেলার ছয়টি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের নির্বাচনী সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার কিছুদিন পরই আসে নতুন দায়িত্ব। ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। সিসিকের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাকে প্রশাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে যোগদানের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ সংসদীয় রাজনীতির কাঙ্ক্ষিত জায়গাটি না পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বসেছেন সিলেট নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে।
সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীমেরও ছিল সংসদ নির্বাচনের প্রত্যাশা। সিলেট-৬ আসনে তিনি বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী।
১৫ মার্চ, তাকে সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। নিয়োগের বিষয়টি একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
একই সময়ে সিলেট বিভাগের জেলা পরিষদগুলোতেও বিএনপির কয়েকজন নেতাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে শামীমের নিয়োগটি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পুনর্বাসন হিসেবে নয়, বৃহত্তর একটি ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও আলোচনায় আসে।
রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর গল্পটি কিছুটা আলাদা। তিনি সংসদীয় কোনো আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন না। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র হিসেবে নগর রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে।
১১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। পদটি গ্রেড-২ মর্যাদার এবং চুক্তিভিত্তিক।
সিলেটের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণও তাই আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সিলেট-৩ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. আবদুস সালাম, যিনি এম এ সালাম নামে পরিচিত। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পান এম এ মালিক।
কাইয়ুম চৌধুরী পরে হন সিসিক প্রশাসক। আর ২০ জুন সরকার ব্যারিস্টার মো. আবদুস সালামকে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাও প্রকাশ করেছে।
একটি সংসদীয় আসনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া দুই নেতাই পরে পেলেন জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এটিই হয়তো এই নিয়োগ-ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।
সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী।
নির্বাচনে ওই আসনে দলীয় মনোনয়ন পান আরিফুল হক চৌধুরী। পরে ৯ আগস্ট মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে সিলেট ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তার মেয়াদ তিন বছর।
এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা—সিলেট নগরের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এখন একজন সক্রিয় রাজনীতিকের হাতে।
সর্বশেষ ১৭ আগস্ট জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন পান সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. বদরুজ্জামান সেলিম।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে তিনিও সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে আগের পরিচালককে পরিবর্তন করে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সিলেট অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে তার অন্তর্ভুক্তি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
এছাড়া সিলেটের বাহিরে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী। জেলা পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটেও বর্তমানে তাকে প্রশাসক হিসেবে দেখানো হচ্ছে এবং সেখানে ১৬ মার্চ ২০২৬ থেকে তার দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে। তিনি সুনামগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন।
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, যিনি ভিপি মিজান নামে পরিচিত। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসনে তিনিও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
আর হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আলী মুকিব আব্দুল্লাহ। ৩১ মার্চ তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফলে সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—চার জেলাতেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরা জেলা পরিষদের নেতৃত্বে এসেছেন।
বিষয়টিকে দলীয়করণের মধ্যে না ফেলে বিএনপি নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন এটিকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার নেতাদের মূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন।
সিসিক প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরীও নিয়োগকে দলীয়করণ বলতে নারাজ। যোগ্য ব্যক্তিদেরই সরকার দায়িত্ব দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাজনীতিবিদদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিলে সাধারণ মানুষের সমস্যা ও প্রত্যাশা দ্রুত বোঝা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মনে করেন, রাজনৈতিক নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বসানোর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের দিকে যেতে পারে। তার মতে, এসব পদে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
যদি নাগরিক সেবা সহজতর হয়, যদি জেলা পরিষদের কাজ গতি পায়, পানি সরবরাহের সংকট যদি কমে যায়, নগর পরিকল্পনা যদি বাস্তবসম্মত হয়, কিংবা গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাপনায় যদি উন্নতি আসে—তাহলে রাজনৈতিক দলীয়করণের বিতর্ক অনেকটাই ম্লান হবে বলে মনে করনে সাধারণ মানুষ।