![]()


মোহাম্মদ মকিস মনসুর ::
কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু হৃদয় থেকে কখনো হারিয়ে যান না। তাঁদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, স্নেহমাখা কথা, আন্তরিক হাসি আর ভালোবাসার স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসে। মনে হয়, এই তো সেদিন কথা হলো, এই তো সেদিন দেখা হলো—অথচ দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেল! আজও মন মানতে চায় না, প্রিয় জি এম মাহমুদ ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। খুব মিস করছি মাহমুদ ভাই, ভীষণ মিস করছি!
আজ ২৪ অক্টোবর বিশিষ্ট সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ, কমিউনিটি নেতা ও মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ আলহাজ্ব জি এম মাহমুদ মিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছরের এই দিনে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে নিজ বাসভবনে লন্ডন সময় রাত ১২টা ১৪ মিনিটে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনে তৈরি হয়েছে এমন এক শূন্যতা, যা সময়ের সঙ্গে হয়তো নীরব হয়ে আসে, কিন্তু কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
মৌলভীবাজার জেলা সদরের বালিকান্দি গ্রামের এই কৃতী সন্তান শুধু একটি নাম ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, আস্থা ও ভরসার জায়গা। তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত আপনজন—আত্মার আত্মীয়, স্নেহশীল এক অভিভাবক। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল হৃদয়ের, ভালোবাসার, আন্তরিকতার। তিনি আমাকে যে স্নেহ করতেন, যে মমতা দিয়ে কাছে টেনে নিতেন, তা আজও গভীরভাবে অনুভব করি। তাঁর স্মৃতিগুলো মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। কত কথা, কত স্মৃতি, কত মুহূর্ত আজ শুধু স্মৃতির পাতায়! ইচ্ছে করে, আর একবার যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারতাম, আর একবার যদি সেই স্নেহমাখা কণ্ঠ শুনতে পেতাম!
মাহমুদ ভাই, আপনি নেই—কিন্তু আপনার স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে জীবন্ত। আপনার মতো ভালো মনের মানুষকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পৃথিবীর সব সম্পর্কের হিসাব হয়তো বোঝানো যায়, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নেওয়া একজন মানুষের অনুপস্থিতির কষ্ট কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না। কিছু শূন্যতা কেবল নিজের হৃদয়েই অনুভব করা যায়—আপনাকে হারানোর শূন্যতাও তেমনই।
আলহাজ্ব জি এম মাহমুদ মিয়া ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ ও প্রবাসী কমিউনিটির নিবেদিত সংগঠক। একসময় কানাডায় ব্যবসা ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি সিলেট ডিভিশন অব ক্যুইবেকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি এবং কানাডা বাংলা স্কুলের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
মৌলভীবাজার সমিতি, মৌলভীবাজার জেলা আন্দোলন, সিলেট বিভাগ বাস্তবায়ন আন্দোলন এবং মৌলভীবাজারে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিচালিত কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততা ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অন্বেষা’, মৌলভীবাজারের প্রবাসী দাতা হিসেবেও তিনি অবদান রেখেছেন। নিজ এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
তবে আমার কাছে মাহমুদ ভাইয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি একজন অসাধারণ ভালো মানুষ ছিলেন। তাঁর অর্থ-সম্পদ, সামাজিক অবস্থান কিংবা সাংগঠনিক পদমর্যাদার চেয়েও বড় ছিল তাঁর সুন্দর মন। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, মানুষকে সম্মান করতেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করতেন। তাঁর আচরণে ছিল বিনয়, কথায় ছিল আন্তরিকতা, আর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যে ছিল এক অনন্য মায়া।
আমি বিশ্বাস করি, অর্থ-সম্পদ কিংবা ক্ষমতা কাউকে প্রকৃত অর্থে বড় করে না। মানুষ বড় হয় তার সততা, সুন্দর আচরণ, বিনয়, মানবিকতা এবং অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতায়। মাহমুদ ভাই তাঁর জীবন দিয়ে এই সত্যেরই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়কারী, পরহেজগার ও ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। তাঁর জীবনের সরলতা, আন্তরিকতা ও পরোপকারিতা তাঁকে আমার কাছে আরও শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে।
প্রবাসের মাটিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং তা ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, শালীনতা, ব্যক্তিত্ব এবং ভিন্নমতের মানুষকেও সম্মান দিয়ে সঙ্গে নিয়ে চলার মানসিকতা। মাহমুদ ভাইয়ের মধ্যে এসব গুণের সমন্বয় ছিল। কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির কল্যাণে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যোগাযোগ, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করতে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও তাঁর ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। ডেইলি সিলেট ও দৈনিক মৌলভীবাজার ডটকমের চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ইউকে বিডি টিভির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। সংবাদকর্মীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা এবং মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে আরও আপন করে তুলেছিল।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বারবার মনে হচ্ছে, মানুষ চলে গেলেও তার ভালো কাজগুলো থেকে যায়, তার ভালোবাসা থেকে যায়, মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো থেকে যায়। মাহমুদ ভাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর মানবিকতা, তাঁর স্নেহ, তাঁর পরোপকারিতা এবং মানুষের জন্য কাজ করার প্রেরণা আমাদের মাঝে বেঁচে আছে।
মাহমুদ ভাই, আপনার অনুপস্থিতি প্রতিদিন অনুভব করি। বিশেষ করে এমন দিনে, যখন আপনার স্মৃতিগুলো আরও বেশি করে মনে পড়ে, তখন হৃদয়ের গভীর থেকে শুধু একটি কথাই বেরিয়ে আসে—আপনাকে খুব মিস করছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনার জীবনের সব ভালো কাজ কবুল করেন, আপনার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন এবং আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আল্লাহ যেন আপনার শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এই শোক বহন করার শক্তি দেন।
আপনি চলে গেছেন, মাহমুদ ভাই; কিন্তু আপনার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা কখনো শেষ হবে না। আপনার মতো মানুষেরা মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন—তাঁদের কাজের মধ্যে, তাঁদের ভালোবাসার মধ্যে, তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতির মধ্যে।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রিয় মাহমুদ ভাইয়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিনম্র দোয়া। মহান আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক : চেয়ারম্যান, ইউকে বিডি টিভি, প্রেসিডেন্ট, গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে