সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রায়নগর ট্রিপল মার্ডার : বাবুলের বক্তব্যে বড় পরিবর্তন

প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক, এখন দাবি চুরির উদ্দেশ্যে ঢুকেছিলেন;
১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আসলেই কী বলেছেন?

স্টাফ রিপোর্টার ::

সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার বক্তব্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে পুলিশকে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের পেছনে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বলা হলেও পরে সেই বক্তব্য থেকে সরে এসে চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় প্রবেশ এবং ধরা পড়ে যাওয়ার পর তিনজনকে হত্যার দাবি করেছেন তিনি।

চার দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার (২০ আগস্ট) বাবুল মিয়াকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক ফারহানা সুলতানার আদালতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি।

কোর্ট ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বাবুল আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাঁর জবানবন্দির লিখিত কপি এখনো গণমাধ্যমের হাতে আসেনি। ফলে আদালতে তিনি ঠিক কী বলেছেন, তার বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রথম বক্তব্যে ছিল প্রেমের সম্পর্ক

গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল প্রথমে দাবি করেছিলেন, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে তিনি তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান। সেখানে তাঁকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে তাহমিনা বাধা দেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ হলে বাবুল তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করেন বলে তখন পুলিশকে জানান।

তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং পরে তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁদেরও হত্যা করেন বলে প্রথমদিকে বাবুলের বক্তব্য ছিল।

এই বক্তব্য সামনে আসার পর হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য মোটিভ হিসেবে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

পরে বদলে যায় বাবুলের বক্তব্য

তবে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল ভিন্ন বক্তব্য দেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, বাসাভাড়া পরিশোধের জন্য অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় চুরির উদ্দেশ্যেই তিনি মিতালী ১১১ নম্বর বাসায় প্রবেশ করেছিলেন। বাসায় ঢোকার পর গৃহকর্মী তাহমিনার কাছে ধরা পড়ে গেলে নিজের অপরাধ আড়াল করতে তাঁকে হত্যা করেন। এরপর তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও এবং পরে আব্দুস সাত্তারকেও হত্যা করেন বলে বাবুল দাবি করেছেন।

অর্থাৎ, একই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাবুলের বক্তব্যে এখন দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে।

প্রথম বক্তব্য: প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং পরপর তিনটি হত্যা।
পরবর্তী বক্তব্য: চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশ, ধরা পড়ে যাওয়ার পর অপরাধ গোপন করতে তিনজনকে হত্যা।

চুরির দাবির সঙ্গে মিলছে কিছু আলামত

পুলিশের তদন্তে বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা এবং কিছু কাগজপত্র তছনছ অবস্থায় পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। বাবুলের নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার পর তিনি বাসায় টাকা খুঁজতে থাকেন এবং প্রায় ১৫ হাজার টাকা পান।

পরে দরজায় নক করার শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে যান বলে দাবি করেছেন তিনি। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি যাওয়ার পথে কোথাও ফেলে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। তবে পুলিশ এখনো ছুরিটি উদ্ধার করতে পারেনি।

সিসিটিভিতেও মিলেছে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাসার মূল গেটের ক্যামেরায় সকাল ৯টা ২৬ মিনিটের পর বাবুলকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসা থেকে বের হওয়ার দৃশ্য ওই ক্যামেরায় ধারণ হয়নি। পাশের একটি বাসার আইপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত ক্যামেরায় বাবুলকে হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত এলাকা ত্যাগ করতে দেখা যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গ্রেপ্তারের সময় বাবুলের হাত ও আঙুলে আঘাতের চিহ্ন এবং ব্যান্ডেজও দেখা যায়। তাঁর দাবি, রং করার কাজে ব্যবহৃত একটি ছুরি দিয়েই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি।

অন্য কোনো মোটিভ কি রয়েছে?

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাবুলের কোন বক্তব্য সত্য?

নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের মেয়ে সেলিনা সুলতানা থানায় দায়ের করা এজাহারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ও উল্লেখ করেছেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

ফলে শুধু বাবুলের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক তথ্য, লুট হওয়া অর্থ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য মিলিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।

এখন গুরুত্বপূর্ণ ১৬৪ ধারার জবানবন্দি

বাবুল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে কোর্ট পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি প্রথমে পুলিশের কাছে দেওয়া প্রেমের সম্পর্কের বক্তব্য রেখেছেন, নাকি পরবর্তী চুরির বক্তব্যই দিয়েছেন—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পরই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

তাই তদন্তের এই পর্যায়ে চুরির উদ্দেশ্যে তিন খুন, নাকি এর পেছনে আরও কোনো মোটিভ রয়েছে—কোনটি সত্য, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বাবুলের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে রায়নগর ট্রিপল মার্ডারের রহস্যের আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকি রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: