![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু থেকেই নাটকীয়তা, অপ্রত্যাশিত ফলাফল এবং আলোচিত মুহূর্তে ভরপুর। তবে মাঠের খেলার বাইরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি নতুন নিয়ম—বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ম্যাচে প্রতি অর্ধে একবার করে তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক রাখা হচ্ছে। পুরো ম্যাচে দুইবার এই বিরতি কার্যকর হচ্ছে, যেখানে খেলোয়াড়রা পানি পান, বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।
ফিফা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষাই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তবে সমালোচকদের মতে, বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বার্থের নতুন মাত্রা।
বিশ্বকাপের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ ঘিরে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ফুটবলকে কেন ‘সকার’ বলা হয়?
ফিফা জানিয়েছে, সব ম্যাচেই এই বিরতি বাধ্যতামূলক থাকবে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন। এর আগে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বা রেফারির সিদ্ধান্তে পানি পানের বিরতি দেওয়া হলেও এবার নিয়মটি সার্বজনীন করা হয়েছে।
২০১৪ বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের কারণে কিছু ম্যাচে ‘কুলিং ব্রেক’ দেওয়া হয়েছিল। তবে তখন এটি ছিল পরিস্থিতিভেদে রেফারির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এবার সেটিই ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নামে ফিরেছে এবং আবহাওয়া বা স্টেডিয়ামের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন, তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম কার্যকর থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ফুটবলবিশ্বে তৈরি হয়েছে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া। একাংশের মতে, ফুটবল একটি অবিচ্ছিন্ন গতির খেলা, যেখানে ম্যাচের রিদম ও চাপ ভেঙে গেলে খেলাটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের আশঙ্কা, এই নিয়ম ফুটবলকে ধীরে ধীরে থেমে থেমে চলা এক সিস্টেমে পরিণত করতে পারে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন জানা যায়, হাইড্রেশন ব্রেক চলাকালে সম্প্রচার সংস্থাগুলো বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে অনেকেই এটিকে বাণিজ্যিক স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখছেন।
ব্রিটিশ সাংবাদিক হেনরি উইন্টার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এই নিয়ম ফুটবলকে চার ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং অর্থের প্রভাবে খেলার স্বাভাবিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইক জানান, ইনডোর বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার ম্যাচেও একই নিয়ম কার্যকর হওয়া যৌক্তিক নয়, বরং পরিস্থিতিভেদে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে কিছু কোচ এই নিয়মকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি কার্যত ‘কৌশলগত টাইমআউট’-এর মতো কাজ করছে, যেখানে দল পুনর্গঠন এবং কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছে।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, এখন ম্যাচ চার ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে এবং এই বিরতি কোচদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরতি ম্যাচের গতিপথেও প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে বিরতির পর ম্যাচের গতি ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কারণ কোচরা এই সময়ে সরাসরি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে কৌশল পুনর্গঠন করতে পারছেন।
তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় এই ধরনের বিরতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে হাইড্রেশন ব্রেক এখন শুধু একটি স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থা নয়, বরং বিশ্বকাপে খেলার ছন্দ, কৌশল এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফুটবলবিশ্বে এখন প্রশ্ন একটাই—এটি কি আধুনিক ফুটবলের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, নাকি খেলার স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারানোর শুরু?