![]()


সুনামগঞ্জ, সংবাদদাতা ::
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি প্রবাসী আলী আহমেদ দুলাল গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে কারাভোগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার নোয়াখালী গ্রামের এই প্রবাসী ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
জীবিকার তাগিদে এক সময় আমিরাতে পাড়ি জমানো আলী আহমেদ বলেন, “দেশে যখন পুলিশ গুলি চালাচ্ছে, মানুষ মরছে, ইন্টারনেট বন্ধ, হাসপাতালগুলোতে সেবা নেই—তখন প্রবাসে থেকেও আমি চুপ থাকতে পারিনি।”
সেই অবস্থান থেকেই ১৯ জুলাই তিনি আবুধাবিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ।
কিন্তু সেই প্রতিবাদ সভার পর শুরু হয় ভয়াবহ অভিযান। আলী আহমেদের অভিযোগ, আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা বি এম জামাল তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে উসকানি দেন এবং ‘জঙ্গি ও উগ্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ফলস্বরূপ আমিরাত কর্তৃপক্ষ ৫৭ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে অনেককে ১০ বছর, ১১ বছর ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আলী আহমেদ নিজেও এক পর্যায়ে যাবজ্জীবন সাজা পান।
কারাবন্দি অবস্থার বর্ণনায় আলী আহমেদ বলেন, “আমাকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে, হাতকড়া ও পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো। কখনো মৃত্যুর হুমকি, কখনো ‘কালেমা’ পড়তে বলা হতো। প্রায় আড়াই মাস পুরোপুরি বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম।”
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দেশে ফেরার সময়ও তাকে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন থেকে আটক করা হয়। তার দাবি, “আমার সাথে থাকা মালপত্র, সোনা—কিছুই ফেরত পাইনি।”
এই দীর্ঘ দুর্ভোগের অবসান ঘটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে। আলী আহমেদ বলেন, “ড. ইউনূসের অনুরোধে আমাদের অনেককে ক্ষমা করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তবে এখনও ২৫ জন বাংলাদেশি সেই কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যাদের দ্রুত মুক্তি জরুরি।”
চার মাসের অজানা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানো আলীর স্ত্রী মরিয়ম আক্তার বলেন, “স্বামীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। সন্তানদের মুখ চেয়ে প্রতিদিন কাঁদতাম। তিনি এখন নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরেছেন।”
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, “আলী আহমেদের সাহসিক ত্যাগের কথা জেনে তাকে একটি দোকান ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেন তিনি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারেন। আমরা সবসময় তার পাশে আছি।”
আলী আহমেদের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, শুধু দেশের মাটিতেই নয়, প্রবাসেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষরা নিরব থাকেননি। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।