![]()


সেন্টমা’র্টিন। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। পর্যট’কদের কাছে ‘দক্ষিণের স্বর্গ’ নামেও পরিচিত। বিগত কয়েক বছর ধরে এই দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে পর্যট’কদের আনাগোনা। এতে অ’পরিক’ল্পিতভাবে গড়ে উঠছে স্থাপনা। পর্যট’কদের অসচেতনতা সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন মা’রাত্মক হু’মকির মুখে। ফলে প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ নানা জলজ প্রা’ণী এবং জীব- বৈচিত্র্য এখন বিলুপ্তির পথে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় স’ম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।
সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির ২৪তম বৈঠকে তিনি এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এদিকে সেন্টমা’র্টিন দ্বীপে পর্যট’কদের সংখ্যা সীমিত করতে যাচ্ছে সরকার। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় স’ম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২২তম সভায় সেন্টমা’র্টিন দ্বীপের পর্যট’কদের গমনাগমন নিয়ন্ত্রণপূর্বক বেসাম’রিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সমন্বয়ে কী’ভাবে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায় সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্থায়ী কমিটিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কা’মাল জানিয়েছেন, সেন্টমা’র্টিন এখন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেখানকার পর্যটন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাছে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে একটি সফটওয়্যারও তৈরি করা হয়েছে। সেন্টমা’র্টিন দ্বীপের পর্যট’কদের গমনাগমন নিয়ন্ত্রণপূর্বক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে প্রতিদিন ১২৫০ জন পর্যট’ক যেতে পারবে। তবে সেখানে রাত্রি যাপন করা যাবে না। সেন্টমা’র্টিনে প্রতিদিন ১২৫০ জন পর্যট’কের চাপ অ’তিরিক্ত হবে কিনা এবং কী’সের ভিত্তিতে উক্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে সাবের হোসেন চৌধুরী তা জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন জানান, পর্যটনের সংখ্যা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক সার্ভিসেস সংস্থার মাধ্যমে এসেসমেন্ট করা হয়েছিল। তারা প্রতিদিন ১০০০ পর্যট’কের ধারণক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির বৈঠকে ১২৫০ জন পর্যট’কে সীমিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত ১২৫০ জনকে ভিত্তি ধরেই পরবর্তী কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। বৈঠকে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আমাদের কক্সবাজার, কুয়াকা’টা সৈকতের দূষণের একটা বড় কারণ সিগারেটের বাঁট। এ জন্য আম’রা ধূমপানমুক্ত দ্বীপ করতে চাই। সেন্টমা’র্টিনে যারা যাবে, সেখানে ধূমপান করা যাবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ সেন্টমা’র্টিন দ্বীপে বিভিন্ন পথে যাতায়াত করেন। সেখানে রাত্রি যাপনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকেই তা মানছেন না। ফলে রাত্রি যাপনে সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল ও মোটেল। এতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যত্রতত্র প্লাস্টিকের বর্জ্য, পাথর তোলা, সৈকতের বালি অ’পসারণ ক্রমাগত বেড়েই চলছে। দ্বীপের ভূগর্ভস্থ সুপেয় মিঠা পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। ফলে কিছু কিছু নলকূপে আসছে লবণাক্ত পানি। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১৪টি বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও মানছেন না এই দ্বীপে আসা পর্যট’করা। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, প্রতিদিন যদি পর্যট’কদের সংখ্যা সীমিত করে ১০০০ থেকে ১২০০ জন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে এখানকার ভা’রসাম্য ধরে রাখা সম্ভব হবে। পরিবেশবিদরা বলছেন, সেন্টমা’র্টিন রক্ষায় সরকারের দেয়া বিধিনিষেধ মানা হেচ্েছ না। মানুষের কোলাহল এবং সৈকত ও পানিতে অ’তিরিক্ত দূষণের কারণে দ্বীপের বহু উদ্ভিদ ও প্রা’ণী এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হু’মকির মুখে পড়েছে সামুদ্রিক কাছিম। এই দ্বীপ হচ্ছে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্র।
জানা যায়, এককালে দ্বীপটিতে ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পাঁচ প্রজাতির ডলফিন, চার প্রজাতির উভচর প্রা’ণী, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রা’ণী, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ট বা কড়ি জাতীয় প্রা’ণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই প্রজাতির বাদুড়সহ নানা প্রজাতির প্রা’ণীর বসবাস ছিল। এসব প্রজাতির অনেকগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব জীববৈচিত্র্য। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমা’র্টিন দ্বীপকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে সরকার। তবে দুই দশকের বেশি সময়েও নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছেই। তবে এবার পর্যটন সংখ্যা সীমিত করে সেন্টমা’র্টিনকে রক্ষায় উঠে পড়ে লেগেছে সরকার। পাশাপাশি ধূমপান মুক্ত দ্বীপ করতে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির পরাম’র্শ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু স’ম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।