সর্বশেষ আপডেট : ৪৯ মিনিট ৪০ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিয়ানীবাজারে বালু উত্তোলন নিয়ে উত্তেজনা, অবরুদ্ধ ৬ জনকে উদ্ধার

চাঁদা দাবির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকি

বিয়ানীবাজার সংবাদদাতা ::

সিলেটের বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদী থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, হামলা ও অবরুদ্ধ করে রাখার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের দীঘলবাক এলাকায় ড্রেজার, নৌকা ও চার শ্রমিককে আটকে রাখার পর বিরোধ মেটাতে যাওয়া আরও দুই ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করা হয়। পরে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে চার শ্রমিক ও ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে, ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চার সাংবাদিক বাধা ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের কারণে তাঁরা ড্রেজার ও শ্রমিকদের আটকে রাখেন। তাঁদের আশঙ্কা, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে বসতবাড়ি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে, ইজারাদার জুবের আহমদ অভিযোগ করেছেন, এলাকার উন্নয়নের নামে চাঁদা দাবি করে তা না পেয়ে একটি পক্ষ এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তবে অভিযুক্তরা চাঁদা দাবি ও হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দীঘলবাক এলাকায় কুশিয়ারা নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু সরানোর কাজ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ইজারাদারপক্ষের বিরোধ দেখা দিলে ড্রেজার, নৌকা ও চার শ্রমিক আটকা পড়েন। সকাল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তাঁদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন। তিনি উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। প্রথমে স্থানীয়রা সমাধানে রাজি হলেও পরে ইজারাদারপক্ষের সব নৌযান নদী থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। এতে সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

পরে পার্শ্ববর্তী দুবাগ ইউনিয়নের গোয়ালপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেন বিরোধ মেটাতে ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের অভিযোগ, মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় কয়েকজন তাঁদের মারধর করে ফেলে দেন এবং পরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

নাজিম উদ্দিন ও জাকির হোসেনের অভিযোগ, হামলাকারীরা তাঁদের পকেট থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নিয়ে গেছে এবং একটি মূল্যবান চশমা ভেঙে ফেলেছে। এ ঘটনায় তাঁরা থানায় অভিযোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন।

ইজারাদার জুবের আহমদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় চুনু মিয়ার ইন্ধনে ফয়ছল আহমদ মিজু, নোমান আহমদ, এমরান আহমদ, আশরাফসহ ১০ থেকে ১২ জন এ ঘটনায় জড়িত। তাঁর দাবি, এলাকার উন্নয়নের নামে তাঁদের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। প্রথম দফায় অর্থ দেওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় দাবি করা অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় নদীভাঙনের বিষয়টি সামনে এনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়।

তবে ড্রেজারটি ইজারার নির্ধারিত এলাকার বাইরে ছিল বলে স্বীকার করেছেন জুবের আহমদ। তাঁর ভাষ্য, নদীর পানি কমে যাওয়ায় তাঁদের বালুবোঝাই স্টিমার তলদেশে আটকে যায়। পরে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আর্থিক বরাদ্দের বিনিময়ে নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে নদীর তলদেশ থেকে বালু সরানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করলে অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় বলে দাবি করেন তিনি।

জুবের আহমদ আরও জানান, স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ড্রেজার দিয়ে বালু সরানোর বিষয়ে সমঝোতার একটি অডিও রেকর্ড তাঁর কাছে রয়েছে, যা তিনি সাংবাদিকদের দিয়েছেন। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেকর্ডিংয়ে ফয়ছল আহমদ মিজু নামে এক যুবককে পরদিন সকাল থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার আশ্বাস দিতে শোনা যায়। তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের নির্দেশে বর্তমানে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে বলেও জানান জুবের আহমদ।

অভিযুক্ত চুনু মিয়া বলেন, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ড্রেজারের শ্রমিকদের ইজারাদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেনকে নিরাপত্তার জন্য তাঁর বাড়িতে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ওপর কোনো হামলা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন দৈনিক নয়াদিগন্ত ও জালালাবাদ পত্রিকার প্রতিনিধি তোফায়েল আহমেদ, দৈনিক কালবেলা ও সিলেটের ডাকের প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম সাজু, দৈনিক তৃতীয় মাত্রার প্রতিনিধি জয়নুল ইসলাম এবং দৈনিক সুরমা মেইলের প্রতিনিধি মো. জয়নুল ইসলাম।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন আহমদ ও আশরাফ আহমদ নামে দুই যুবক তাঁদের দিকে তেড়ে আসেন। এ সময় তাঁদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করার পাশাপাশি গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকরা।

শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন বলেন, ইজারাবহির্ভূত জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয়রা ড্রেজার ও শ্রমিকদের অবরুদ্ধ করে রেখেছেন—এমন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ইউএনওর নির্দেশে মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে রাতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় চার শ্রমিক ও স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়।

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করেছে। বর্তমানে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিয়ানীবাজারের ইউএনও উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয়রা শ্রমিক ও কয়েকজন ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ পাঠিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ জানাননি। তবে দীর্ঘ সময় কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখাও উচিত হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার বিষয়ে ইউএনও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা অনুচিত। তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: