সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

চায়ের দোকানে থালা ধোয়া থেকে বলিউড-হলিউড জয়, ওম পুরির জীবনগাথা

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

শৈশবে চায়ের দোকানে থালাবাসন ধুতেন, স্বপ্ন ছিল ট্রেনচালক হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য লিখে রেখেছিল অন্য গল্প—একদিন তিনি হয়ে উঠবেন ভারতের অন্যতম অভিনেতা, যিনি বলিউড ও হলিউড—দুই জায়গাতেই সাফল্য পাবেন। তিনি ওম পুরি। আজ ১৮ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন। ওম পুরির জীবনসংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সাফল্যের কাহিনি আজও মানুষকে নাড়া দেয়।

১৯৫০ সালের ১৮ অক্টোবর পাঞ্জাবের পাতিয়ালায় জন্ম ওম পুরির। তবে তাঁর পরিবার সঠিক জন্মতারিখ জানত না। মা বলতেন, তিনি জন্মেছিলেন দশেরা উৎসবের দিনে। তাই ওম পুরি নিজেই ঠিক করেন, ১৮ অক্টোবরই হবে তাঁর জন্মদিন। ছয় বছর বয়সে পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে কাজ শুরু করেন তিনি। চায়ের দোকানে থালা ধোয়া থেকে শুরু করে নানা ছোটখাটো কাজ করতেন। এমনকি তাঁর বাবা একসময় চুরির অভিযোগে জেলে গেলে সংসারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় ছোট্ট ওমের কাঁধে।

ট্রেনচালকের স্বপ্ন থেকে অভিনেতা হওয়ার যাত্রা

শৈশবে ওম পুরির ভীষণ পছন্দ ছিল ট্রেন। কখনো কখনো ট্রেনের ভেতরেই রাত কাটাতেন তিনি। বড় হয়ে ট্রেনচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে। নিজেকে গড়ার লক্ষ্যে ভর্তি হন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি)। সেখানেই তৈরি হয় তাঁর অভিনয়ের ভিত। পরবর্তী সময়ে ভারত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকদের মন জয় করেন অসাধারণ অভিনয়ে।

৪৫ বছরের ক্যারিয়ারে হিন্দি, ইংরেজি ও বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সিনেমায় অসংখ্য ছোট-বড় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওম পুরি। শৈল্পিক ধারার সিনেমার পাশাপাশি ‘চাচি ৪২০’, ‘মকবুল’, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর মতো মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতেও প্রশংসা অর্জন করেছেন।

ওম পুরি বলেছিলেন, “আমার জন্য প্রকৃত শক্তিশালী সিনেমা ছিল ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে, যখন শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালানি, বাসু চ্যাটার্জি, মৃণাল সেন ও গুলজার অসাধারণ সিনেমা করেছেন।”

‘আক্রোশ’ দিয়ে পরিচিতি, সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে

ওম পুরির চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয় মারাঠি ছবি ‘ঘাসিরাম কোটওয়াল’ দিয়ে। তবে বলিউডে তাঁর বড় সাফল্য আসে ১৯৮০ সালের ‘আক্রোশ’ ছবিতে। সমাজের বাস্তবতাকে নতুনভাবে দেখানো এই ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের সমানভাবে মুগ্ধ করে। ছবির জন্য তিনি পান ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্র অভিনেতার পুরস্কার।

এরপর তিনি উপহার দেন একের পর এক স্মরণীয় ছবি—‘আরোহণ’, ‘অর্ধ সত্য’, ‘জানে ভি দো ইয়ারোঁ’, ‘চাচি ৪২০’, ‘হেরা ফেরি’, ‘মালামাল উইকলি’। প্রতিটি চরিত্রেই যেন নতুনভাবে জন্ম নেন তিনি।

ওম পুরির দুটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্বাচন করতে হলে ‘আক্রোশ’ ও ‘অর্ধ সত্য’-এর কথা আসবে। এই দুটি সিনেমায় তাঁর অভিনয়ের বিশাল পরিসর তাঁকে শুধু হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনেতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেনি, ভারতীয় সিনেমার নবতরঙ্গ ধারাকেও দৃঢ় করেছে।

হলিউডেও ওম পুরির জয়যাত্রা

ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে ওম পুরি নিজের প্রতিভার ছাপ রাখেন হলিউডেও। অভিনয় করেন ‘সিটি অব জয়’, ‘উলফ’, ‘দ্য ঘোস্ট অ্যান্ড দ্য ডার্কনেস’-এর মতো ছবিতে। চরিত্র বড় হোক বা ছোট, তাঁর উপস্থিতি সব সময়ই ছিল তীক্ষ্ণ ও জীবন্ত। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল চরিত্রকে বাস্তবের মতো করে তুলে ধরা।

ওম পুরি বলেছিলেন, “সিনেমার দুই রকম আছে—একটি শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য, অন্যটি হৃদয় স্পর্শ করে। দুটিরই নিজস্ব গুরুত্ব আছে।”

ওম পুরি। এক্স থেকে

জীবনদর্শন ও অভিনয় নিয়ে ভাবনা

মৃত্যুর কিছুদিন আগে, ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার একজন অভিনেতা হিসেবে অবদান তখনই স্পষ্ট হবে যখন আমি এই পৃথিবী ছেড়ে যাব এবং বিশেষত চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীরা আমার সিনেমা দেখবে।”

ওম পুরি ছিলেন সমাজসচেতন ও বিকল্পধারার সিনেমার অনুরাগী। তিনি মনে করতেন, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালানি, বাসু চ্যাটার্জি, মৃণাল সেন ও গুলজারের মতো নির্মাতারা অসাধারণ সিনেমা তৈরি করেছেন।

অন্যান্য অনেক অভিনেতার মতো তিনি কখনো একরকম চরিত্রে আটকে যাননি। বরং জীবনের কাছাকাছি বাস্তব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এ ক্ষেত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ, সাধু মেহের ও স্মিতা পাতিলের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে।

ওম পুরি সিনেমার প্রচার ও সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতেন। তারকাখ্যাতি নিয়ে কখনো অহংকার দেখাতেন না। তাঁর ধ্যানধারণা ছিল সহজ—অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা। তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের একজন ভাবতেন।

ওম পুরি। এক্স থেকে

ব্যক্তিজীবনের উত্থান-পতন

ওম পুরির ব্যক্তিজীবনেও ছিল নানা উত্থান-পতন। দুবার বিয়ে করেন তিনি—প্রথমে অভিনেত্রী সীমা কাপুরকে, পরে সাংবাদিক নন্দিতা পুরিকে। জীবনের কিছু বিতর্কিত অধ্যায় সংবাদে এলেও, তাঁর কাজ সব সময়ই ছাপিয়ে গেছে সেসব।

অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। শুধু অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন বহু তরুণ অভিনেতার প্রেরণা। এনএসডি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও নবীন শিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন তিনি।

২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন ওম পুরি।

আলোচিত পাঁচ চরিত্র ও চলচ্চিত্র

১. ‘আক্রোশ’, ১৯৮০

এই ছবির জন্য ওম পুরি পান ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্র অভিনেতার পুরস্কার। এখানে তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি নিজের বোনকে হত্যা করেন, যাতে সে তাঁর স্ত্রীর মতো দুর্ভাগ্য ভোগ না করে।

২. ‘আরোহণ’, ১৯৮২

ওম পুরির আরেকটি উল্লেখযোগ্য হিন্দি ছবি ‘আরোহণ’। এখানে তিনি একজন দরিদ্র কৃষকের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

৩. ‘গান্ধী’, ১৯৮২

রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ‘গান্ধী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা দর্শকদের নজর কাড়েন ওম পুরি। এখানে তিনি নাহারি চরিত্রে মাত্র ৯০ সেকেন্ডের জন্য উপস্থিত ছিলেন। তবু ওম পুরি বলেছেন, “এই ছোট্ট শটও জীবনের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছিল।”

৪. ‘জানে ভি দো ইয়ারোঁ’, ১৯৮৩

একের পর এক গম্ভীর সিনেমার পর ওম পুরি অভিনয় করেন হালকা ধরনের ছবি ‘জানে ভি দো ইয়ারোঁ’-তে। ছবিটি দুই ফটোগ্রাফারের গল্প, যেখানে তাঁরা একটি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হন। প্রথমে বক্স অফিসে সফল না হলেও পরে এটি কাল্ট ক্ল্যাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

৫. ‘ইস্ট ইজ ইস্ট’, ১৯৯৯

জটিল চরিত্রে ওম পুরির পারদর্শিতা বোঝা যায় এই সিনেমায়। এখানে তিনি একটি পাকিস্তানি পরিবারের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন। পরিবারটি ১৯৭০-এর দশকে স্যালফোর্ডে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কম বাজেটের এই ব্রিটিশ কমেডি সিনেমাটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। পরে ছবিটি বাফটা পুরস্কারে সেরা ব্রিটিশ ছবির সম্মান জেতে।

ওম পুরি। এক্স থেকে

ওম পুরি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ওম পুরিকে দর্শক মনে রাখবে তাঁর অভিনয়কৌশলের জন্য, যেখানে সাধারণ মানুষ তাঁর চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছে। কত সিনেমায় অভিনয় করেছেন, কত উপার্জন করেছেন কিংবা ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল—সবই সময়ের সঙ্গে মুছে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর চরিত্রের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি চিরকাল দর্শকের মনে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: