![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গঠিত জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যেন কাটছেই না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জোটের নেতৃত্বের ভূমিকা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শরিক দলগুলোর মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগে জোটের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস জোট ছেড়ে যাওয়ায় কাগজে-কলমে ১১ দলীয় ঐক্য থাকলেও কার্যত এটি এখন ৯ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে।
জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জোটের ভবিষ্যৎ কাঠামো, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নেজামে ইসলাম পার্টিসহ আরও দু-একটি দল জোট ছাড়ার বিষয়ে ভাবছে। একই সঙ্গে হেজাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসার ঘরানার সাতটি দলকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগও রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইসলামপন্থি রাজনীতির সমীকরণে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে মনে করছেন অনেকে।
তাদের মতে, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে জোটগত পুনর্বিন্যাসের আভাস দেখা যাচ্ছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন এ জোটের ভবিষ্যৎ ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শরিকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরে তা অন্য শরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে জোটের ছোট দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ও দূরত্ব বাড়ছে। অবশ্য প্রকাশ্যে কোনো সংকটের কথা স্বীকার করছেন না জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা। তাদের ভাষ্যমতে, জোটে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। জোটের সম্প্রসারণের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের সঙ্গে প্রতিটি দল আছে। সংসদে আছে। তবে কিছু কারণে তারা কর্মসূচিতে থাকছে না। শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জোট-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াত ও শরিক দলগুলোর অবস্থান এক নয়। জামায়াত স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই ও বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ (এলডিপি) জোটের বেশিরভাগ শরিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
শরিক দলগুলোর অভিযোগ, এ বিষয়ে তাদের মতামতকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না জামায়াত। ফলে তারা বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, জামায়াতকে বাদ দিয়েই জোটের বাকি শরিক নিজেদের মধ্যে আসন ও এলাকা সমন্বয়ের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে জোটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা করছে শরিক দলগুলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় দুই দলের সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সমঝোতারও সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব উদ্যোগ জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান আন্দোলনে এর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলেই তাদের ধারণা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে এগোনোর বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণও মনে করছেন কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, জামায়াত ও শরিক দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। সেই প্রভাব ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
হেজাফতের উদ্যোগে আসছে নতুন জোট, সন্দেহ জামায়াতের: ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দুটি দলকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে হেফাজতের আমিরের উপস্থিতিতে কওমি মাদ্রাসার ঘরানার ৭ দল বৈঠকে বসে। বৈঠকে অংশ নেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সেখানে অতীতের মতপার্থক্য ও বিভেদ পেছনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। নতুন জোটের সম্ভাব্য কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রস্তাব বা রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে সেই প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর হেফাজতের দায়িত্বশীল নেতারা আবার বৈঠকে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এখনই ১১ দলীয় ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে বা নতুন জোট হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা ও মতবিনিময় শেষে নতুন রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে কি না তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে।
হেফাজতের আলেমদের তত্ত্বাবধানে নতুন কোনো ঐক্য বা জোট গঠিত হলে তাতে যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের একাধিক নেতা। তারা বলেছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই নেওয়া হবে।
অপরদিকে ১১ দলীয় জোট থাকা কওমি ঘরানার বাকি দলগুলো বলছে, সবকিছু এখনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে আছে। নতুন জোটে যোগ দেওয়া কিংবা বর্তমান জোটে থাকার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার কালবেলাকে বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্য থাকা। জোট ছাড়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই। আর কওমি ঘরানার ৭ দলের মধ্যে ঐক্য হলে তখন দেখা যাবে। কারণ এ ঐক্য এখনো চূড়ান্ত নয়। আলোচনা পর্যায়ে আছে, আরও সময় লাগবে।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ৭ দলের নতুন জোট গঠন হলে অবশ্যই রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকবে। আমরা আগে এক সঙ্গে ছিলাম। মাঝে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হেফাজতের মুরব্বিরা আবারও উদ্যোগ নিয়েছেন। একসঙ্গে দুটি জোটে কারও থাকার সুযোগ নেই। তাই যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে দলগুলোকে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৭ দলের ঐক্য দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। আমরা তখন হয়তো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। আর যদি জোট না হয় তা হলে আমরা এককভাবে অংশ নেব।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য সবাই একসঙ্গে বসেছিল। প্রতিটি দলের লিখিত পরামর্শ জমা দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এগোবে। জোট বা ঐক্য হতে আরও সময় লাগবে।
নতুন এ জোট গঠনের উদ্যোগের পেছনে বিএনপি সরকারের ইন্ধন আছে বলে সন্দেহ করছে জামায়াত। তাদের শঙ্কা, ৭ দলের মধ্যে ঐক্য হলে জোট থেকে কয়েকটি দল বেরিয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক পন্থায় মোকাবিলা করতে না পেরে সরকার ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে; পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলন আরও বেগবান হবে। সেখানে আরও অনেক দলের সমর্থন থাকতে পারে।
দুই দলের জোট ছাড়ার নেপথ্যে: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা ও সংরক্ষিত নারী আসনে ছাড় না পাওয়ায় খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ ছাড়া জোটে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ছাত্রদের নতুন দল এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ থেকেই শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। এ ছাড়া সংসদে উচ্চ কক্ষ গঠন নিয়ে অশ্চিয়তা এবং স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিতে পারে—এসব ক্ষোভের কারণেই খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলন জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খেলাফত মজলিসের নেতারা মনে করেন, সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার সময়ে তাদেরকে ন্যায্য আসন দেওয়া হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ অন্যান্য জাতীয় সংকট নিয়ে আন্দোলন চলমান রয়েছে। কিন্তু এর ফাঁকে জামায়াত তাদের প্রার্থী ঘোষণা করছে, নির্বাচনি প্রচারণা কৌশলে চালিয়ে নিচ্ছে। তাই নির্বাচন পরবর্তীতে জোটে মূল্যায়ন না পেয়েই তারা এখন থেকে এককভাবে কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্য প্রয়োজন হলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীরের নেতৃত্ব ‘সমমনা ইসলামপন্থি’ ব্যানারে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টির মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে। এরপর যোগ দেয় জামায়াতে ইসলামী। পরবর্তী সময়ে এনসিপি, এবি পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও এলডিপিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হলে সেটি ১১ দলীয় ঐক্যে রূপ নেয়। তবে সংসদ নির্বাচন ঘিরে আসন ভাগাভাগির বিরোধে ভোটের আগেই জোট ছাড়ে ইসলামী আন্দোলন। পরে বাংলাদেশ লেবার পার্টি যোগ দিলে জোটে সদস্য দল ১১টিই থাকে। কিন্তু গত জুনে খেলাফত আন্দোলন ও গত শনিবার খেলাফত মজলিস জোট থেকে বেরিয়ে যায়।