![]()


মারুফ হাসান ::
বহু কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ। শেষ মুহুর্তে সিলেট জেলার ছয়টি আসনে প্রার্থী ও সমর্থকেরা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের তথ্য ও ভোটারদের মতামত বলছে—একটি আসনে কোনো পক্ষ স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকলেও বাকি পাঁচটি আসনে সমানে সমান বা ত্রিমুখী লড়াইয়ের চিত্র তৈরি হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রধান লড়াই ঘুরছে বিএনপি ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের ঘিরে।
মর্যাদার আসন সিলেট–১: সম্মানের লড়াই
সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট–১ আসন ঐতিহ্যগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে—এই আসনে যে দল জয়ী হয়, সেই দলই জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার গঠন করে।
এ আসনে বিএনপির খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে। নারী ও তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং দলীয় ইমেজ—সব মিলিয়ে ভোটারদের নজর এখন এই দুই প্রার্থীর দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনাই বেশি।
সিলেট–২: সহানুভূতির ভোটে স্বস্তিতে বিএনপি
বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর নিয়ে গঠিত সিলেট–২ আসনে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদী লুনা তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে আছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এম ইলিয়াস আলীর প্রতি সহানুভূতি ও পারিবারিক ভোটব্যাংক এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আলোচনায় থাকলেও এই আসনে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেট–৩: শেষ মুহূর্তে সমানে সমান লড়াই
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ নিয়ে গঠিত সিলেট–৩ আসনে শুরুতে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও শেষ দিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। প্রার্থী পরিবর্তন, প্রবাসী ফ্যাক্টর এবং জোটের মাঠ সক্রিয় হওয়ায় ভোটের সমীকরণ পাল্টে গেছে। ফলে এখানে সমানে সমান লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সিলেট–৪: ‘মেয়র বনাম চেয়ারম্যান’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা
কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর নিয়ে গঠিত এই আসনে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের মধ্যে মর্যাদার লড়াই জমে উঠেছে। উন্নয়ন ইস্যু ও স্থানীয় ভোটব্যাংক—দুই পক্ষেরই শক্ত অবস্থান থাকায় ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সিলেট–৫: ত্রিমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্র
কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ আসনে সবচেয়ে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জোট প্রার্থী, বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। ধর্মীয় ভোটব্যাংক, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং দলীয় সমর্থন সব মিলিয়ে এই আসনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফল অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিলেট–৬: সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার নিয়ে গঠিত সিলেট–৬ আসনে বিএনপি ও জোট প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীও আলোচনায় আছেন। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এ আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। শেষ মুহূর্তে দলীয় ঐক্য ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এখানে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন।
সিলেটের ছয়টি আসনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বলছে, একটি আসনে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও বাকি পাঁচটিতে সমানে সমান বা ত্রিমুখী লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে শেষ মুহূর্তের ভোটই বড় ভূমিকা রাখবে।
সব কিছুর পর সিলেটের ভোট এবার জাতীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার সিলেট জেলায়। এখানে মোট ভোটার ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৯৭০ জন, নারী ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৮ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৮ জন। গত নির্বাচনের তুলনায় সিলেট জেলায় ভোটার বেড়েছে তিন লাখ ৯৮ হাজার ৬৫ জন। ভোটারের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার ২২ লাখ ৭৪ হাজার ১০৩ জন। এ জেলায় ভোটার বেড়েছে তিন লাখ ৫১ হাজার ৯৩৪ জন।