![]()


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে স্বতন্ত্র আর বিকল্প প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি। এসব প্রার্থী একদিকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন, অন্যদিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে দল। যদিও তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়।
তবে দলটির নেতাদের আশা, স্বতন্ত্র হিসেবে দলের যেসব নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, শিগগিরই তাদের কেন্দ্রে ডাকা হবে। দায়িত্বশীল নেতারা প্রথমে তাদের বোঝাবেন; দল ক্ষমতায় গেলে বিভিন্নভাবে মূল্যায়নের আশ্বাস দেবেন। এতেও কাজ না হলে কঠোর হবে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
জানা গেছে, সারাদেশে ৫২ আসনে দলের ৭১ স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। তারা বিএনপির পদধারী ও সাবেক নেতা। তবে বাছাইকালে অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। এর পরও অনেক আসনে বিএনপি নেতা প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। সূত্র জানায়, দলের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এরই মধ্যে ৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবু অনমনীয় বিদ্রোহীরা মাঠ ছাড়ছেন না। এর মধ্যে মিত্র দলের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের তৎপরতায় বেকায়দায় পড়েছেন জোট নেতারা।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের মতো ছয়টি আসনে ঘোষিত বিকল্প প্রার্থী নিয়েও বিব্রত তৃণমূল নেতাকর্মী। শেষ পর্যন্ত দল কাকে মনোনয়ন দেবে, তা নিয়ে চলছে হিসাবনিকাশ। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় এক পক্ষ খুশি হলেও আরেক পক্ষ ক্ষোভে নিষ্ক্রিয় হতে পারে। এতে ভোটের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
বিকল্প প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে নেতাকর্মী
সম্প্রতি ছয়টি আসনে বিকল্প প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এর ফলে কারা কোন নেতার সঙ্গে থাকবেন, তা নিয়ে বাড়ছে জটিলতা। যদিও জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক তৎপরতায় কয়েকটি আসনে বিকল্প প্রার্থীরাই এগিয়ে।
জানা গেছে, সিলেট বিভাগে তিনটি আসনে বিকল্প প্রার্থী রেখেছে বিএনপি। সিলেট-৬ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে। সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলকে। সুনামগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেলকে।
বগুড়া-২ আসনটি মিত্র দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সেখানে বিকল্প হিসেবে বিএনপি নেতা মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে আছেন কবির আহমেদ ভূঁইয়া। যশোর-৪ আসনে বিকল্প প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী। এ আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইকালে ঋণখেলাপির দায়ে পূর্বনির্ধারিত প্রার্থী টি এস আইয়ুবের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণার পর মতিয়ার রহমান ফারাজীকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
নেতাকর্মীরা জানান, এসব বিকল্প প্রার্থী নিয়ে যেমন নানা নেতিবাচক সমালোচনা রয়েছে, তেমনি অনেক আসনে তারা হয়ে উঠেছেন ‘আশীর্বাদ’। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিকল্প প্রার্থী ঘোষণায় উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এই আসনে প্রথমে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তিনি বয়োবৃদ্ধ। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। মনোনয়ন পাওয়ার পর শুরুতে ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি গণসংযোগ করলেও এখন তা করতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে নেতাকর্মীরা বিকল্প প্রার্থীর পক্ষেই শক্ত অবস্থান নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কসবা থানা বিএনপি নেতা ফয়সল আহমেদ।
সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুলকে নিয়ে চলছে চরম বিতর্ক। কোনোভাবেই তাঁকে প্রার্থী হিসেবে মানতে পারছেন না এলাকার নেতাকর্মী। আর এ কারণে তারা চূড়ান্ত ঘোষিত প্রার্থী আনিসুল হককে নিয়ে মাঠে আছেন। এ বিষয়ে সবাই একাট্টা।
২০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা
রাজনৈতিক সমীকরণ, দলীয় কোন্দল ও মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতাবিষয়ক জটিলতা কাটাতে প্রাথমিকভাবে ঘোষিত আসনের ১৭টিতে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে বিএনপি। মিত্র দলগুলোর নেতারা নিজস্ব প্রতীকে ৯টি এবং ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করবেন। এসব আসনে বিএনপি নিজেদের প্রার্থী সরিয়ে মিত্র দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। আবার কোনো কোনো আসনে বয়স্ক, ঋণখেলাপিসহ আরও কিছু কারণে প্রার্থী বদল করেছে দলটি। এসব আসনে যোগ্যরা মূল্যায়িত হওয়ায় নেতাকর্মীর মধ্যে স্বস্তি এলেও বেশ কিছু আসনে ক্ষোভ রয়ে গেছে।
এসব আসনের অধিকাংশ স্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের নেতারা। দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এরই মধ্যে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন, মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, আবদুল খালেক, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে, সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী হাসানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্যান্য আসনেও একই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দলটি। তবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগের কথা বিবেচনায় তাদের ব্যাপারে দল এখনও নমনীয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও তাদের সঙ্গে বসবেন। এ ক্ষেত্রে ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দেখবে বিএনপি। তার পরও নির্বাচনের মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল।
নাটোর-১ আসনে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুলকে প্রার্থী করা হয়েছে। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। তিনি বলেন, দল সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবে– জেনেই মানুষের আবেগের কথা ভেবে নির্বাচনের মাঠে আছি। দলের একটা পদে আছি। দল থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলে এই পদেও থাকব না।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে কিছু আসন ছেড়ে দিয়েছি। ওই আসনগুলোতে আমাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। এখানেও আমাদের যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমরা বসব; তাদের বোঝানোর চেষ্টা করব। এরপরও না শুনলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।
বিপাকে মিত্র দলের প্রার্থীরা
জোটের সমঝোতার আওতায় ঢাকা-১২, ভোলা-১, পটুয়াখালী-৩, সিলেট-৫, নীলফামারী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। কৌশলের অংশ হিসেবে শরিক দল থেকে পাঁচ নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪, এলডিপির রেদোয়ান আহমদ কুমিল্লা-৭, বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ থেকে ধানের শীষে ভোট করবেন। এ ছাড়া ১২ দলীয় জোটভুক্ত ‘অনিবন্ধিত’ জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাস যশোর-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ থেকে নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে প্রায় প্রতিটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।
জোট নেতারা বলছেন, পরিস্থিতি এতটাই জটিল, তারা সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেছেন। তাদের শঙ্কা, তৃণমূলের বিদ্রোহীরা জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারেন। একাধিক আসনে যার ফল প্রভাবিত হতে পারে।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে অসন্তোষের বিষয় তুলে ধরতে গতকাল তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। বৈঠকে জোটের শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার না করে আলোচনার মাধ্যমে বসিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান নুর। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বহিষ্কার হলে ওই সব নেতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেন।’ জবাবে তারেক রহমান বিষয়টি ইতিবাচকভাবে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান ভিপি নুর। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমানের নমনীয় হওয়ার আশ্বাস জোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন জোট নেতারা।
বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে চারটি আসন ভাগ করেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই আসনগুলোতে বিএনপির লোকজন প্রার্থী হয়ে জোটপ্রার্থীদের সাহায্য করছেন না। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, আমি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করছি। আশা করি, তৃণমূল নেতারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করবেন। সৌজন্যে: সমকাল