![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার ঐতিহাসিক পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) শুনানির প্রথম দিনে মামলার বাদি পক্ষ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে যে, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার লক্ষ্যেই তাঁদের জীবনকে পরিকল্পিতভাবে বিভীষিকাময় করে তুলেছে মিয়ানমার। গত এক দশকের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো গণহত্যার মামলা যা পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৈশ্বিক আইনি প্রেক্ষাপটে এই মামলাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর রায়ের প্রভাব কেবল মিয়ানমার নয়, বরং গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান মামলার ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী আইনি নজির তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতের শুনানিতে রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থা তুলে ধরে বলেন, এই সহজ-সরল মানুষগুলো শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন দেখতেন। অথচ মিয়ানমার তাঁদের সেই স্বপ্নকে অস্বীকার করে ধ্বংসযজ্ঞের নিশানা বানিয়েছে।
জ্যালো আরও উল্লেখ করেন যে, রোহিঙ্গাদের ওপর এমন নৃশংস সহিংসতা চালানো হয়েছে যা সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ওই সময় নির্বিচার হত্যা, গণধর্ষণ এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোকে জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দল ‘স্পষ্টত গণহত্যার উদ্দেশ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
মুসলিম প্রধান ৫৭টি দেশের জোট ওআইসি-র সমর্থনে ২০১৯ সালে এই মামলাটি দায়ের করেছিল গাম্বিয়া। প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি উপস্থিত থেকে এসব অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে আদালত ২০২২ সালে মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তিগুলো খারিজ করে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানির পথ প্রশস্ত করেন।
এর আগে ২০২০ সালে আইসিজে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার এবং গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমান শুনানিটি সেই মূল অভিযোগগুলো প্রমাণের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ১৪ কার্যদিবস ধরে এই আইনি লড়াই চলবে। এই দফার শুনানিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথমবারের মতো সরাসরি রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। তবে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই বিশেষ সাক্ষ্যদানের সেশনগুলোতে সাধারণ জনগণ বা সংবাদকর্মীদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করছে, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বিচারের মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবশেষে ন্যায়বিচার পাবে।