সর্বশেষ আপডেট : ১১ ঘন্টা আগে
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফ্রেব্রুয়ারী….


মোঃ কায়ছার আলী: “নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা”? মাতৃভাষা সমাসবদ্ধ পদ। ব্যাকরণের দিক দিয়ে ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। অভিধানে লেখা আছে স্বদেশের ভাষা। ভাষা খেলা করে জিবের ডগায়। ঘোষিত হয় গলার মধ্য দিয়ে। প্রাণ লাভ করে ফুসফুসে। আসলে ওর জন্ম বুকের মধ্যে। উৎস মানুষের মন। আমাদের মাতৃভাষা তিব্বতের গুহাচারী, মনসার দর্প চুর্ণকারী আরাকানের রাজসভায় মনিময় অলঙ্কার। বরেন্দ্রভূমির বাউলের উদাস আহ্বান। মাইকেল মধুসূধন দত্ত, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম, বাঙ্গালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর ভাষা আমার মাতৃভাষা, আমাদের মাতৃভাষা, বাঙ্গালীর মাতৃভাষা। প্রতিটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ যেমন পুষ্টিকর ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য মাতৃভাষা পুষ্টিকর। ভাষা যে কোন জাতির সৃজনশীল ধী শক্তির অপূর্ব সৃষ্টি। জাতির মেধার অনন্য লালন ক্ষেত্রে। জাতির মননের আকর্ষনীয় স্থাপত্য। সারা বিশ্বে প্রায় সব ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এ রকমই হয়ে থাকে। আজ মহান একুশে ফ্রেরুয়ারী-বাঙ্গালীর ভাষার মাস। শুধু বাংলা ভাষাই নয়। পৃথিবীর ছোট-বড় সব জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা আর গুরুত্ব তুলে ধরার মাস। কৃষ্ণচূড়ার রক্ত লালে রাঙ্গনো বসন্তে আবার ফিরে এসেছে সেই ফেব্রুয়ারী মাস। মাতৃভাষাকে চির অম্লান করে একটা সংগ্রামের জাগ্রত চেতনার মাস। একটা লাল তারিখের অণু-পরমাণুতে গড়া নবচেতনার মাস, জীবন দর্শনের মাস। স্বার্থসিদ্ধির কালো মেঘের বক্ষ বিদীর্ন করে সূর্য ওঠার মাস। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবী তথা বাঙ্গালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সোপানের মাস। আর্থ-সামাজিক অধিকার বঞ্চিত বাঙ্গালী জাতির তার সকল বঞ্চনাকে এ ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে মুর্ত করতে চায়। ফলে দেখা যায় যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার পরও এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ দিবস ও শহীদ মিনারের আবেদন এতটুকু কমেনি। ইতিহাস গড়ে উঠে, ইতিহাস রচিত হয়। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ইতিহাস এমনি ভাবে প্রাণ পেয়েছে যদিও তার প্রতি বাঁকে বাঁকে রয়েছে নির্মল রক্ত কণিকার মণিমুক্ত। পাকিস্তানের শাসকেরা বাংলাভাষাকে কোনদিন সু-নজরে দেখেননি। তাদরে বদ্ধমূল ধারনা ছিল যে, বাংলা হিন্দুর ভাষা, হিন্দু সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাই শাসক গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করলেন। ১৯৪৯ সালের ১২ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত খান গণ পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে একটি ‘মূলনীতি কমিটি’ গঠন করেন এবং পাকিস্তানের সংবিধান রচনার মৌল বিষয়বস্তু নির্ধারনের ভার এই কমিটির উপর ন্যস্ত করা হয়। ১৯৫০ সালে ‘মূলনীতি কমিটির’ রিপোর্ট প্রকশিত হয়। এই রিপোর্ট পূর্ব বাংলার জনমন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ এতদিন যা দাবি করে এসেছে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তার কোনটিতে তা স্থান পায় নি। ১৯৫১ সালের ১৬ই অক্টোবর লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হস্তে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দীন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেন। তিনি ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে ভাষার প্রশ্নটি আবার উত্থাপন করেন এবং পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তিটি আবার ঘোষণা করেন- “একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। এবার কিন্তু প্রতিবাদের ঝড় তুমুল আকার ধারণ করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ১৯৫২ সালের ২১ শে ফের্রুয়ারী তারিখে অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক পরিষদের আসন্ন অধিবেশনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেন। ২১ ফের্রুয়ারীর পূর্বে কয়েকটি পথসভা, পতাকা দিবস পালন এবং সর্বত্রই জনগণের উৎসাহ উদ্ধীপনা প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা জনগণের ভাষার এই মৌলিক দাবিটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে তা ব্যাপক ভিত্তিক এক আন্দোলনের পত্তন করেন। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এই আন্দোলনকে চেয়েছিলেন বানচাল করতে। যদিও আন্দোলনের যৌক্তিকতা ছিল সন্দেহাতীত। পাকিস্তানের শতকরা আটজন লোক উর্দুতে কথা বলে। অথচ তা হবে রাষ্ট্রভাষা এবং যে ভাষার দেশের শতকরা ৫৬ জন লোক কথা হলে তা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করবে না- এই যুক্তি একমাত্র নির্বোধ ছাড়া সকলেই বোঝে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার ছিল বলদর্পী ও ক্ষমতালোলুপ। তাই একুশে ফেব্রুয়ারী হরতালকে বানচাল করার জন্য শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান প্রমুখ অকালে ঢলে পড়ল, ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো- এবং সব কিছই শুধুমাত্র মাতৃভাষার দাবিতে। পরবর্তী ১৯৫৩ সালের কমিটির রিপোর্টের আলোকে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম ‘সরকারী ভাষা’ হিসেবে মর্যাদা দানের সুপরিশ করা হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে আমাদের মাতৃভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ আরো ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। লেখক, কবি, সাহিত্যিক. দার্শনিক প্রমুখ প্রত্যেকে মাতৃভাষায় তাদের কাব্য, সাহিত্য ও মতবাদ রচনা করেছেন এবং সম্মানিত হয়েছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজীতে লিখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় বাংলা ভাষায় লিখে আবার সম্মানিত হয়েছেন। বর্তমানে পৃথিবীতে ৬৭০০ এর উপরে ভাষা আছে। বর্তমান শতকে অধিক ভাষা হারিয়ে যাবে অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা দিনে দিনে আরো সম্প্রসারিত হোক। সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলা ভাষার অনেক উন্নতি বা পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান সরকারে দক্ষ এবং আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে সাধারণ অধিবেশনে ভাষা শহীদদের আত্বত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাকে যথার্থ স্থানে স্থান দেওয়ায় ১৮৮ টি দেশের সমর্থনে সারা বিশ্বে আজ যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিবসটি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে পালিত হচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ বলা যাবে না যার সেদিন ভাষা শহীদদের বুকে গুলি চালিয়েছিল। তাদের দেশেও আজ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক একটি অর্জনের কথা লিখছি। নিউইয়র্ক সিটির ১৮০০ পাবলিক স্কুলে বাংলা শিশুদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১১ লাখ স্কুল ছাত্র/ছাত্রীর ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলা ভাষায় সুযোগ পাবে। নিজেদের বাবা মায়ের ভাষার সঙ্গে আরও সুন্দরভাবে পরিচিতি হওয়ার সুযোগ মিলবে। এজন্য অভিনন্দন জানাই নিউইয়র্ক স্কুল চ্যান্সেলর কংগ্রেসম্যান নিদিয়া ভ্যালেসকুয়েজকে। ২৩শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রঙ্গানে যে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল এবং পরের দিন ২৪শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সালের শহীদ শফিউর রহমানের গর্বিত পিতার হাতে উদ্বোধনের পরে আজ সেই ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি চির প্রবহমান নদীর ধারার মত দেশ ও বিদেশে অবস্থিত সকল শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভে আবাল বৃদ্ধবণিতার মাধ্যমে ফুলে ফুলে বা ভালবাসার মালায় মালায় সিক্ত হয়ে শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে ভরে উঠেছে। আর অন্তরের অন্তস্থল হতে হৃদয়ের সমস্ত অনুভুতি দিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত এবং প্রয়াত সুরকার আলতাফ মাহমুদ এর সুরে কালজয়ী গানটি দলে দলে গাইছে “আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলতে পারি”…।

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
০১৭১৭-৯৭৭৬৩৪, [email protected]

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: