![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
বিএনপির নতুন সরকার আগামী বছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব করেছে, তাকে দিকনির্দেশনাহীন বলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের শরিক দলটি বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, এই বাজেট জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে এবং অনেকাংশে ‘ফাঁপা বুলি’ ও ‘প্রতারণামূলক’ বাজেটে পরিণত হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকালে এনসিপির আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ।
আগের দিন বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন।
নতুন অর্থবছরের জন্য তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন, যাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর তারেক রহমানে নেতৃত্বে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এনসিপির এমপি আতিক মোজাহিদ বলেন, “এনসিপি মনে করে এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট। এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং অনেকাংশে ‘ফাঁপা বুলি’ ও ‘প্রতারণামূলক’ বাজেটে পরিণত হয়েছে।”
তবে দলটি বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু ‘ইতিবাচক’ দিক রয়েছে, যদিও সামগ্রিক বিশ্লেষণে বাজেটটি ‘বাস্তবসম্মত নয়’।
রাজধানীর বাংলা মোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির ‘ছায়া বাজেট কমিটি’র প্রধান আতিক মোজাহিদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড়।
“কিন্তু বর্তমান ভঙ্গুর ও ঋণনির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতায় এত বড় বাজেট ‘কাল্পনিক’ ও ‘অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী’। বাজেটটি সংখ্যাভিত্তিক বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে ইশতেহারনির্ভর প্রতিশ্রুতির ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে।”
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘অবাস্তব ও কাল্পনিক প্রত্যাশা’ বলে দাবি করেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের গড়া দলটি।
বাজেট দেওয়ার আগে গেল ৬ জুন এনসিপির পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ‘ছায়া বাজেট’ দেওয়া হয়।
ক্ষমতায় আসা মাস চারেকের মাথায় বিএনপির নতুন সরকারের বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় এনসিপি বলেছে, “সরকার এনবিআরের জন্য উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা অর্জনের বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা দেয়নি। এনবিআর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
সরকার ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায় সম্ভব হবে না বলছে এনসিপি।
“ফলে শুরু থেকেই আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।”
আতিক মোজাহিদ বলেন, “এটি দিকনির্দেশনাহীন বাজেট, অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকা তারা কোথা থেকে, কার পকেট কেটে আনবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার পথরেখা এই বাজেট বক্তৃতায় নেই।”
এনসিপির পর্যবেক্ষণ, বাজেটে বিপুল ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেই ব্যয় নির্বাহের নির্ভরযোগ্য অর্থের উৎস স্পষ্ট নয়। এ কারণে পরবর্তীতে বাজেট সংকোচন বা ব্যয় কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা জনগণের প্রত্যাশাকে ‘হতাশ’ করবে।
ব্যাংক ঋণনির্ভরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
দলটির সংসদ সদস্য আতিক মোজাহিদ বলেন, “দেশের বৈদেশিক ঋণ ইতোমধ্যে ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের পরিমাণও প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ব্যাংকিং খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।”
অনেক ব্যাংক ‘কার্যত সংকটে’ রয়েছে দাবি করে বিরোধী দলের এ এমপি বলেন, “বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ কিংবা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।”
তিনি বলেন, “রাজস্ব ঘাটতি পূরণে শেষ পর্যন্ত সরকার যদি টাকা ছাপানোর পথে যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। অথচ একই সঙ্গে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর-ভ্যাট কমানোর কথা বলছে, যা পরস্পরবিরোধী।”
এনসিপির মূল্যায়ন, “দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাব থাকলেও নিয়মিত কর দেন খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন। এতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর উৎসে কর আরোপেরও বিরোধিতা করেছে এনসিপি। দলটি মনে করছে, এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়বেন।
অর্থ পাচার ও কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে বাজেটে কোনো ‘সুস্পষ্ট অবস্থান নেই’ তুলে ধরে আতিক মোজাহিদের বলেন, “এটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই উদ্বেগজনক।”
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ চেয়ে এনসিপির দাবি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সেই অর্থ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে নাকি সেবার মান উন্নয়নে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
বাজেটের কিছু দিক নিয়ে এনসিপি সরকারের ‘প্রশংসাও’ করেছে।
মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সম্প্রসারণ একটি ‘যুগান্তকারী’ পদক্ষেপ বলে মনে করে তরুণদের দলটি।
এনসিপি বলেছে, “ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু সঠিক দিক।”
এছাড়া, শিল্প, সেবা, আইসিটি ও আধুনিক কৃষিতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহায়তা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি,
ষ্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য কর ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এনসিপি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, “লুটতরাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি যেভাবে দুর্বল করা হয়েছে এবং অর্থনীতিকে যেভাবে বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধনির্ভর করে তোলা হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট একটি রূপান্তরমুখী (ট্রান্সফরমেটিভ) বাজেট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
“এমন একটি বাজেটের প্রত্যাশা ছিল, যা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক ভিত্তিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেবে।”
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত।
সেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবদিন শিশির।