![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
এনডিটিভি ও দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাইগারের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে তদন্ত নতুন মোড় নিয়েছে।
পুলিশের দাবি, হামলাকারীরা প্রথমে সালমানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাড়িটি রেকি করে। সেখানে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে তারা পরিকল্পনা বাতিল করে। পরে তুলনামূলক কম নিরাপত্তায় থাকা অন্য কোনো তারকাকে নিশানা করার নির্দেশ পায় তারা। শেষ পর্যন্ত বলিউড অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ছেলে টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
এ ঘটনার পর সালমানের নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। মুম্বাই পুলিশের পাশাপাশি তার সুরক্ষায় বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে।
সালমানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের অত্যাধুনিক সাবমেশিনগান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জার্মান অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হেক্লার অ্যান্ড কচের তৈরি এমপি৫ এসডি৬।
তদন্তকারীদের দাবি, সালমান ছাড়াও অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার ও আমির খানসহ বেশ কয়েকজন তারকার বাড়ি আগে থেকেই রেকি করেছিল হামলাকারীরা। তুলনামূলক কম নিরাপত্তায় থাকা তারকাদের সহজ নিশানা হিসেবে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে সন্দেহ তাদের। এ হামলার জন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে পরিকল্পনা কারীদের দেড় লাখ রুপির চুক্তি হয়েছিল বলেও পুলিশের দাবি।
গ্রেপ্তার যারা
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার মুম্বাইয়ের জুহুতে পুষ্পা নরসি গ্রাউন্ডে ফুটবল ম্যাচ শেষে টাইগারের গাড়ি বের হওয়ার সময় দুজন ব্যক্তি সেটি লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে টাইগারের গাড়িচালক এবং গাড়ির পাশে থাকা একজন অটোরিকশাচালক আহত হন।
হামলাকারীদের সহযোগী তৃতীয় একজন কিছুটা দূরে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। টাইগারকে লক্ষ্য করে সাত রাউন্ড গুলি চালানোর পর তিনজন একটি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান। জয়পুরগামী ট্রেনে ওঠার আগে আন্ধেরি পশ্চিম রেলস্টেশনের কাছে মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে যান তারা।
হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা রেহান রহিসউদ্দীন (১৮) ও ফুল সিং (১৮) এবং বিহারের বেগুসরাইয়ের বাসিন্দা হৃতিক মাহতোকে (২২) সোমবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে এই তিন অভিযুক্ত আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মুম্বাই এসেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন—এমন দাবি পুলিশের।
এরপর হরিয়ানার সোনিপত থেকে সমীর নামের আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, এই চারজন লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সক্রিয় নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। টাইগারের গাড়িতে যারা গুলি চালিয়েছিলেন, তাদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল এই নেটওয়ার্ক।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন কুনাল, সুমিত, রাধা ও ববিতা। তাদের বয়স ১৯ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। কুনাল ও সুমিতের বাড়ি হরিয়ানার সোনিপত জেলায়। রাধা ও ববিতা উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা।
রাধা ও ববিতা হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উত্তর প্রদেশ থেকে মুম্বাইয়ে নিয়ে যান এবং কুনালের নির্দেশে সেগুলো অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেন বলে সূত্রগুলোর দাবি। গ্রেপ্তার চারজনকে মুম্বাই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল।
তদন্তকারীদের ধারণা, এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে জড়িত চক্রটির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ঘটনায় মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
হামলার ছক যেমন ছিল
পুলিশের দাবি, হামলাকারীরা মুম্বাইয়ে বেড়াতে আসা ব্যক্তির পরিচয়ে একটি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেলে করে ২০ দিন ধরে শহরে ঘুরে বেড়ান।
শহরে থাকার সময় আন্ধেরি ইস্টের চার থেকে পাঁচটি হোটেল বদলান তারা। পুলিশের ধারণা, নজর এড়াতেই বারবার থাকার জায়গা পরিবর্তন করা হয়েছিল।
রেকি করে হামলাকারীরা বুঝতে পারেন, সালমান এতটাই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন যে তাদের পক্ষে অভিনেতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে তারা বুঝতে পারেন, টাইগার শ্রফের সঙ্গে তেমন কোনো নিরাপত্তাবলয় থাকে না। তখন তারা নিশানা বদলে টাইগারের গতিবিধি অনুসরণ করতে থাকেন।
টাইগার ওই স্টেডিয়ামে আছেন—এ তথ্য হামলাকারীরা একজন অটোরিকশাচালকের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে পুলিশের ভাষ্য। এর আগে ১১ অক্টোবর তারা টাইগারকে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেদিন অভিনেতা সেখানে যাননি।
এরপর শনিবার তারা অস্ত্র হাতে পান এবং রোববার গুলি চালান। সেদিন সাতটি গুলি ছোড়া হয়। আরও গুলি চালানোর চেষ্টা করলে একটি বন্দুকে ত্রুটি দেখা দেয়। পরে তারা পালিয়ে যান।
হামলায় দেশি ও বিদেশি—দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। তবে বিদেশি অস্ত্রটির নির্দিষ্ট মডেল বা কারিগরি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
টাইগারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর মুম্বাই থেকে পালানোর সময় হামলাকারীরা অজ্ঞাত একটি স্থানে অস্ত্র দুটি ফেলে যান। মুম্বাই পুলিশ এখন সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হামলার জন্য অস্ত্রধারীদের ৫০ হাজার রুপি অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। হামলার পর বাকি এক লাখ রুপি পরিশোধ এবং বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় তাদের।
‘সালমানের সঙ্গে কাজ করলেই হত্যা করা হবে’
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দিন রোববারই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও বার্তা সামনে আসে। সেখানে এক ব্যক্তিকে হিন্দিতে বলতে শোনা যায়, “আমি অনিল পণ্ডিত। আমি লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছোট ভাইয়ের মতো।
“পুরো চলচ্চিত্রশিল্পে যে আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করবে না, কিংবা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবে, তাকেই হত্যা করা হবে। এটিই প্রথম এবং শেষ সতর্কতা।”
এই অনিল পণ্ডিতই নতুন বার্তায় বলেছেন, সালমান ক্ষমা না চাইলে তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। অভিনেতা ক্ষমা চাইলে তাদের আর কোনো শত্রুতা থাকবে না বলেও দাবি করেছেন তিনি। পাশাপাশি সালমানের সঙ্গে যারা যোগাযোগ রাখেন, তাদের এবং তার পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন অনিল।
ভারতের রাজস্থানের প্রভাবশালী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সালমানের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে শুটিং করতে গিয়ে সালমান খান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করেন। বিরল প্রজাতির এই হরিণকে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করেন।
এরপর সালমানের বিরুদ্ধে মামলা করে বিষ্ণোই সম্প্রদায়। এ মামলায় ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় সালমানের। পরে অবশ্য জামিনে মুক্তি পান তিনি।
কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ায় লরেন্স বিষ্ণোই সালমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরপর একাধিকবার সালমান ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ওপর হামলার চেষ্টা করে বিষ্ণোই গ্যাং।
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার আগে, ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলে মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীকে গুলি করে হত্যা করে বিষ্ণোই গ্যাং বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টাইগার ও সালমান একসঙ্গে কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে বলিউড প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার ‘হিরোপান্তি’ সিনেমায় প্রথম নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন টাইগার।
শোনা যায়, সালমানই মূলত নাদিয়াদওয়ালাকে টাইগারকে সিনেমায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। টাইগারের বাবা জ্যাকি শ্রফ একাধিক চলচ্চিত্রে সালমান খানের সঙ্গে কাজ করেছেন।