সর্বশেষ আপডেট : ৩০ মিনিট ২৪ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ইউক্রেনকে গোপন তথ্য দিয়ে ৩০০ রুশ সেনা হত্যা, রাশিয়ার এক কর্মকর্তা সম্পর্কে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গোপনে অবস্থান নিয়ে ইউক্রেনকে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন ২৬ বছর বয়সি এক রুশ সেনা কর্মকর্তা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলায় ৩০০ জনের বেশি রুশ সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরে সম্মুখযুদ্ধের রেখা পেরিয়ে ইউক্রেনে পালিয়ে যান তিনি এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি ইউনিটে যোগ দেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তার নাম লেফটেন্যান্ট লেভ স্তুপনিকভ। রুশ সেনাবাহিনীতে নিজের পদ ব্যবহার করে তিনি ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাকে সংবেদনশীল সামরিক তথ্য সরবরাহ করতেন। সেনাদের চলাচল, যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং নজরদারি ড্রোন ও নিরাপত্তা ক্যামেরার মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের নাগাল ছিল তার।

তবে গোপনে ইউক্রেনকে সহায়তা করার সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। ইউক্রেনে পৌঁছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিলেও একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার স্ত্রী অভিযোগ করেন, তিনি রাশিয়ার পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্কের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

যেভাবে ইউক্রেনকে হামলায় সহায়তা করেন

বুদিয়নি মিলিটারি একাডেমি অব দ্য সিগন্যাল কর্পস থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর স্তুপনিকভকে একটি ব্যাটালিয়নের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব ছিল ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি উগলেদার দখল করা।

তার দায়িত্ব ছিল সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিটের যোগাযোগ সচল রাখা এবং নজরদারি ব্যবস্থার তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি গোপনে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দাদের কাছে রুশ সেনাদের অবস্থান ও পরিকল্পিত চলাচলের নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করতেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব ইউক্রেনের এক হিমশীতল সকালে সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে সরে যাওয়ার জন্য স্তুপনিকভ পেটে ব্যথার ভান করেন। এর কিছুক্ষণ পরই ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র তার দেওয়া অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানে।

ওই হামলায় রুশ কর্নেল গুসেইন মুসায়েভসহ ৬৮ জন রুশ সেনা নিহত হন। মুসায়েভ কিয়েভের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলায় আরও ৬০ জন আহত হন।

হামলার পর ইউক্রেনের এক যোগাযোগকারী স্তুপনিকভকে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চান, ‘বিস্ফোরণ হয়েছে? একটি ছবি পাঠাও।’

জবাবে স্তুপনিকভ লেখেন, ‘সেখানে শুধু মাংস।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের পক্ষে তথ্য সংগ্রহের বৃহত্তর একটি গোয়েন্দা তৎপরতার অংশ ছিলেন স্তুপনিকভ। এ কার্যক্রমে রাশিয়ার এমন নাগরিকদের সহায়তা নেওয়া হয়, যারা ইউক্রেনকে সামরিক তথ্য দিতে আগ্রহী। হাজারো মানুষ—সেনাসদস্য থেকে শুরু করে গৃহিণী পর্যন্ত—এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ইউক্রেনের গোয়েন্দা এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন বদলে দেয় তার অবস্থান

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরোধিতা থেকেই নিজের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্তুপনিকভ।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর সময় ইউক্রেনের শহরগুলোর ওপর দিয়ে রুশ হেলিকপ্টার উড়তে এবং বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখতে পান তিনি। এসব দৃশ্য তাকে আতঙ্কিত করে তোলে।

স্তুপনিকভ বলেন, ‘তারা নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা ফেলছিল। এটা ছিল অশুভ।’

যুদ্ধ চলার মধ্যেও তার সহযোদ্ধারা কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন, তা বুঝতে পারছিলেন না তিনি। বাড়িতে স্ত্রী লিজার সঙ্গে সন্ধ্যায় রুশ বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভিডিও এবং ইউক্রেনের হাতে বন্দি রুশ যুদ্ধবন্দিদের সাক্ষাৎকার দেখতেন।

সামরিক একাডেমিতেও তার মতো চিন্তাভাবনার কয়েকজন ক্যাডেট ছিলেন। চোখাচোখির মাধ্যমে তারা একে অপরের মনোভাব বুঝতে পারতেন। তাদের কেউ কেউ একাডেমি ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আবেদনগুলো মাসের পর মাস ঝুলে ছিল।

নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে স্তুপনিকভ বলেন, ‘আমি আমার আবেগ প্রকাশ করতে পারতাম না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি জ্বলছিলাম।’

ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করেন মা

স্তুপনিকভের মা তাতিয়ানা ইয়ান্তসেনও পুতিনের বিরোধী ছিলেন। ৪৯ বছর বয়সী এই অফিসকর্মী পুতিনের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তার ছেলে সম্মুখযুদ্ধে দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর, তিনি দিমিত্রো কারপেঙ্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারপেঙ্কো একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার, যিনি ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।

কারপেঙ্কো এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রুশ তথ্যদাতাদের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। ইউটিউবে রুশ যুদ্ধবন্দিদের ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেও তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু রুশ সেনা বাড়ি ফেরার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে সামরিক তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে কারপেঙ্কো ঘোষণা দেন, ইউক্রেনের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য তথ্য দিতে আগ্রহী রুশ সেনাসদস্যদের ২ লাখ ৫০ হাজার রুবল বা প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডলার দেওয়া হবে।

শেষ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই স্তুপনিকভের পালানোর পরিকল্পনা করা হয়। এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে স্তুপনিকভ, কারপেঙ্কো ও ইউক্রেনীয় স্কাউটরা বিপজ্জনক সম্মুখযুদ্ধের রেখা পেরিয়ে যাওয়ার পথ নির্ধারণ করেন।

যেভাবে সম্মুখযুদ্ধের রেখা পেরিয়ে পালান

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাতে নিজের রুশ ইউনিট থেকে পালিয়ে উত্তরের দিকে ইউক্রেনীয় অবস্থানের দিকে রওনা হন স্তুপনিকভ। একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার থেকে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় অপারেটররা তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

প্রায় ৪০ মিনিট পর তিনি এমন একটি গাছের সারির কাছে পৌঁছান, যেখানে ইউক্রেনের ৭২তম ব্রিগেডের সেনারা অবস্থান করছিলেন।

রুশ সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে নিজেদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ইউক্রেনীয় সেনারা সতর্ক হয়ে যান। একটি বাঙ্কার থেকে উঁকি দিয়ে তারা তার দিকে রাইফেল তাক করে সংকেত-শব্দ জানতে চান।

স্তুপনিকভ পূর্বনির্ধারিত উত্তর দেন, ‘পিনাট শপ’। এরপর তাকে ইউক্রেনীয় হেফাজতে নেওয়া হয়।

পরে তিনি রাশিয়ান ভলান্টিয়ার কর্পসে (আরভিসি) যোগ দেন। এই ইউনিটে জাতিগতভাবে রুশ সদস্যরা রয়েছেন, যারা পুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। বর্তমানে স্তুপনিকভ সেখানে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মা ও বোনের ইউক্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্তুপনিকভের মা ও বোন একটি করে ব্যাকপ্যাক ও স্যুটকেস গুছিয়ে মলদোভা যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ইউক্রেনে প্রবেশ করে কারপেঙ্কোর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

এদিকে, কয়েক মাস ধরে রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের ফোন সামলাচ্ছিলেন তাতিয়ানা। কর্মকর্তারা তার ছেলেকে জীবিত পাওয়া গেলে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর জন্য তাকে চাপ দিচ্ছিলেন। তাতিয়ানা তখন উদ্বিগ্ন মায়ের মতো আচরণ করে বলতেন, ছেলেকে খুঁজে বের করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এক বছর পর কারপেঙ্কোর সঙ্গে দুই ঘণ্টার একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন স্তুপনিকভ। এতে তার পক্ষত্যাগ এবং ইউক্রেনকে দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

তবে স্তুপনিকভের দাবি, তার কর্মকাণ্ড প্রায় এক দশক আগে সামরিক একাডেমিতে নেওয়া শপথের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ সেই নীতিগুলোই ধ্বংস করেছে বলে তিনি মনে করেন।

স্তুপনিকভ বলেন, ‘আমি কি আমার শপথের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি? আমি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছিলাম। কিন্তু পুতিন এই তিনটিই ধ্বংস করেছেন।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: