![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশে নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। সেই লক্ষ্য পূরণেই বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, সকল ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা প্রদানসহ যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়তে চায়, যে রাষ্ট্র তার সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। অপরদিকে নাগরিকগণ রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সকল নাগরিক দায়িত্ব পালন করবে। এভাবেই রাষ্ট্র-সরকার এবং নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব-আস্থা এবং আলাপের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে সকলের কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র এবং সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহায়তা।
শুক্রবার জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আগের দিন ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধান এ কথা বলেন।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে ‘কেউ কেউ নানাভাবে গুজব রটাচ্ছে’ জানিয়ে দেশবাসীকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানাভাবে গুজব রটাচ্ছে। সোশাল মিডিয়ার আশ্রয় নিয়ে কেউ কেউ মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে।
দেশে কোনো রকমের সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা বিদ্বেষ যেন আমাদের সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ না হয়, সে বিষয়ে আমি সজাগ দৃষ্টি রাখতে সকলের প্রতি আহ্বান জানাই। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
হিন্দু সম্প্রদায়কে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার-আমার- আমাদের সকলের অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, বিএনপি বিশ্বাস করে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সবার প্রতি আমার আহ্বান, আসুন, আমরা সবাই ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সৌহার্দ্য -সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুভ জন্মাষ্টমীর উৎসবের পরই আপনাদের সামনে আসন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব দুর্গাপূজা। আপনারা সকল উৎসব আয়োজন শান্তিতে স্বস্তিতে নিরাপদে পালন করুন। আমি আবারও জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছার পাশাপাশি দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
গীতা পাঠ দিয়ে এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর আগে হিন্দুদের তরফে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ফুল দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। সরকারপ্রধানও ফুল দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানান, যা গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সূবর্না সিকদার।
অনুষ্ঠানে নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সারাদেশে পুরোহিত ও সেবাইতের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইএফটি’র মাধ্যমে এ অর্থ পৌঁছে যায়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে বন্দি দেবকী ও বাসুদেবের বেদনাহত ক্রোড়ে জন্ম নিয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
অবতার হিসেবে তিনি প্রেম, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। ব্রতী হন অত্যাচারী ও দুর্জনের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ভালো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। দুষ্টের দমন করতে একইভাবে যুগে যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে আসেন, সত্য ও সুন্দর ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন—এটাই সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনই ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত। বাংলাদেশেও গণতন্ত্রকামী জনগণের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে কংসরূপী সেই ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটিয়ে এবার দেশ পুনর্গঠনের পালা। একটি রাষ্ট্র এবং সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলন থাকে; এটিই বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানে যারা সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হিসেবে বিবেচিত, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা সফরে গেলে আমরা সবাই কিন্তু কথিত সংখ্যালঘু। বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু—এসব পরিচয় কোনো মুখ্য বিষয় নয়। অতএব, সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আসুন সবাই নিজেদেরকে বাংলাদেশি ভাবি। রাষ্ট্র এবং সমাজে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ বৈষম্য সৃষ্টির কারণ না হয়, সেই উপলব্ধি থেকেই দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখতে করতে স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। আমাদের সকল নাগরিকের গর্বিত পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ একে ওপরের সঙ্গে মিলেমিশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম এবং সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে কংস চরিত্রের মানুষেরা রাষ্ট্র এবং সমাজে বিভেদ বিরোধ সৃষ্টি জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা চালিয়েছে। সমাজ বিরোধী অপশক্তি আর যাতে মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, আর কেউ যেন বিরাজমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য আমাদের সকলকে অবশ্যই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতির বন্ধন অটুটু রাখা নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ নিতাই স্বামী মহারাজ, বিএনপির সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী।