সর্বশেষ আপডেট : ২৪ মিনিট ১১ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

দিল্লিতে বন্ধ হল আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের সেমিনার, অনুমতি দেয়নি পুলিশ

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েনের মধ্যে ‘নতুন বিতর্ক এড়াতে’ একটি সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়েছে দিল্লির পুলিশ, যেখানে আলোচক হিসেবে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

নয়া দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় (এফসিসি) শনিবার সন্ধ্যায় এই সেমিনার ও সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। এফসিসি সাউথ এশিয়া ও বেলজিয়ামভিত্তিক হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়লগ টু আ পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রসপারিটি’ শীর্ষক এ আয়োজন করছিল।

তবে ‘কিছু বিতর্কের’ কারণ দেখিয়ে দিল্লি পুলিশ শেষ মুহূর্তে সেমিনারটি আয়োজনের অনুমতি দেয়নি বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার ও দ্য প্রিন্ট।

শনিবার সন্ধ্যায় আয়োজকদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দিল্লি পুলিশের ‘হস্তক্ষেপের’ কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হয়েছে এবং এই আকস্মিক পরিস্থিতি আয়োজকদের ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’।

এফসিসির এক কর্মকর্তা দ্য প্রিন্টকে বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিলক মার্গ থানায় গিয়ে তারা নিরাপত্তা চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু থানার পক্ষ থেকে সিল ও স্বাক্ষরসহ চিঠিতে হাতে লিখে জানানো হয়, “প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কিছু বিতর্ক থাকায় এই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়নি।”

দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মা পুলিশি হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

তিনি দ্য প্রিন্ট-কে বলেছেন, এফসিসির কোনো প্যানেল আয়োজনে পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন নেই এবং পুলিশ তাদের অনুষ্ঠানে কোনো হস্তক্ষেপ ‘করেনি’।

তবে নিরাপত্তা চেয়ে লেখা এফসিসির ওই চিঠির ছবি ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে, যেখানে পুলিশের মন্তব্য ও অনুষ্ঠান করার অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেই লেখা রয়েছে। তিলক মার্গ থানার সিল ছিল এবং থানার ওসির স্বাক্ষরও দেখা গেছে সেখানে।

সেমিনার সামনে রেখে আয়োজকরা সেশাল মিডিয়ায় যে পোস্টার প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে আলোচক হিসেবে দশজনের নাম ছিল।

ওই তালিকায় ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম মাহমুদ। এছাড়া ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি নূরুন নবী, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম এবং নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে।

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার বীণা সিক্রি, সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ওন্দ্রেজ দোস্তাল, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আসিফ ইকবাল, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল এ এফ এম গোলাম জিলানী নামও আলোচকদের তালিকায় দেখা যায়।

তবে ভিসা না পাওয়ায় জিলানী ভারতে যেতে পারেননি। তিনি দ্য ওয়্যারকে বলেন, তার ভিসার প্রক্রিয়া চলছিল এবং কেন অনুষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

পুলিশ অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেওয়ার পেছনে বাংলাদেশের কোনো বিষয় নেই দাবি করে জিলানী বলেন, “এটি বাংলাদেশ বা ভারতের বিষয় নয়। এটি ইউরোপ-এশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে।”

হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দল বা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়; মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও শিক্ষা নিয়ে তারা কাজ করেন।

তবে দ্য ওয়্যার লিখেছে, সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন এবং ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন ইউরোপে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করে আসছে।

কেন বন্ধ হল অনুষ্ঠান?

এ বিষয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। পুলিশের নথিতে শুধু ‘কিছু বিতর্কের কারণে’ অনুষ্ঠানটির অনুমতি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এফসিসির প্রেসিডেন্ট ওয়ায়েল আওয়াদ দ্য প্রিন্টকে বলেন, অনুষ্ঠানটি ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা’। কেন পুলিশ অনুমতি দেয়নি, তা তিনি জানেন না।

তবে এফসিসি-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দ্য প্রিন্টকে বলেছেন, গত ৫ অগাস্ট এই ক্লাবেই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। আর তারপর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল বাংলাদেশ।

ওই সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতাকে বক্তা হিসেবে রাখা এবং রোহিঙ্গা অধিকার কাজ করা আরেক বক্তার উপস্থিতির কারণে অনুষ্ঠানটি নিয়ে দিল্লির আপত্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

নতুন বিতর্ক এড়াল পুলিশ?

২৯ অগাস্টের এই ঘটনা ঘটেছে ৫ অগাস্ট দিল্লির এফসিসিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ২৪ দিন পর।

২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর সেটিই ছিল দিল্লিতে প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তৃতা দেওয়ার ঘটনা।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে এফসিসি আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে অডিও কলে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।

তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তার দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর জারি রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

এফসিসির ওই অনুষ্ঠানের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লির সহযোগিতা চেয়ে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনা যেন ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য বা এমন কোনো কর্মকাণ্ড না করতে পারেন, যা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

ভারত তখন বলেছিল, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, এটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং সেখানে যেসব বক্তব্য দেওয়া হতে পারে, তার সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়।

কিন্তু তারপরও ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বক্তৃতা দিলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে এমন একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর।

একই সঙ্গে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বাংলাদেশের অনুরোধের কোনো জবাব না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনাতেও পড়ে।

ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে তারেকের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে ৫ অগাস্টের অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ স্পষ্ট করে যে, এই সফরের জন্য আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।

১৬ অগাস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ চায়, ওই পরিবেশ তৈরির জন্য ভারত শেখ হাসিনাসহ অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করুক। পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিদেরও ফেরত দেওয়ার দাবি জানায় ঢাকা।

এর আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা ‘প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায়’ পর্যালোচনা করছে।

সম্প্রতি কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের দাবি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে ২৯ অগাস্ট দিল্লিতে এফসিসির অনুষ্ঠানটি সরাসরি বাংলাদেশকেন্দ্রিক না হলেও, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বক্তাদের উপস্থিতি এবং শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপড়েনের কারণে ঘটনাটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: