![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
নেপাল–তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলের সময় গাছে উঠে প্রাণে বেঁচে যায় আট বছরের জোয়াল ঘালে। তিন দিন ধরে ছেলেকে মৃত ভেবে খুঁজে বেড়ানো মা শেষ পর্যন্ত রয়টার্সের এক সাংবাদিকের সহায়তায় তার সন্ধান পান।
নেপালের পাহাড়ি নদী বেয়ে যখন প্রলয়ংকরী ঢল নেমে একের পর এক জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছিল, তখন ছুটে জঙ্গলে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় ছোট্ট জোয়াল ঘালে। বয়স মাত্র আট বছর। তখন স্কুলে ছিল সে। দুর্যোগের মুহূর্তে বুদ্ধি করে পাহাড়ি জঙ্গলে ছুটে গিয়ে গাছের ওপর উঠে বসে। আর তাতেই বেঁচে যায় জোয়াল।
গত বুধবারের ঘটনা এটি। নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে প্রবল বেগে কাদাপানি ও পাথরের ঢল নেমে আসে। এখন পর্যন্ত ৬২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯২৪–এ দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি।
পরদিন বৃহস্পতিবার নেপালের উত্তরাঞ্চলের দুর্যোগকবলিত রাসুয়া জেলা থেকে জোয়ালকে উদ্ধার করা হয়। এক পা ভাঙা ও মুখে কাটা দাগ থাকা শিশুটিকে পরে হেলিকপ্টারে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছে সে।
সন্তান নিখোঁজ হওয়া মা মাট্টি মায়া তামাং ভেবেছিলেন, আকস্মিক ঢলের সময় স্কুলে থাকা তাঁর দুই ছেলে হয়তো আর বেঁচে নেই। এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেকটিতে ছুটেছেন। ত্রাণ ও উদ্ধারকেন্দ্রেও খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু পাননি। অবশেষে তিন দিন পর শুক্রবার বড় ছেলে জোয়ালের দেখা পান তিনি।
রয়টার্সকে মাট্টি মায়া তামাং বলেন, “একে একে চার জায়গায় গেছি। কোথাও তালিকায় আমার সন্তানদের নাম ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম, দুই সন্তানের কেউই আর বেঁচে নেই। কান্না ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।”
রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তরের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় পাহাড়ি ঢলে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের শনাক্ত ও নিবন্ধনের কাজ করছে সংস্থাটি। নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সন্তানের খোঁজ দিলেন সাংবাদিক
দুই সন্তানের খোঁজে বৃহস্পতিবার হন্যে হয়ে ছুটছিলেন মাট্টি মায়া তামাং। একপর্যায়ে তিনি রয়টার্সের সাংবাদিক শাহানা বজ্রাচার্যের ফোন নম্বর পান। তথ্যের আশায় তাঁকে ফোন করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে নুয়াকোটের একটি হাসপাতালে ছোট্ট জোয়ালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শাহানার। একটি শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়েছে—এমন খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানত না, শিশুটির পরিবার কোথায় আছে কিংবা কেউ বেঁচে আছেন কি না।
ততক্ষণে উন্নত চিকিৎসার জন্য জোয়ালকে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার আশায় জোয়ালকে নিয়ে একটি ভিডিও করার কথা জানান শাহানা। জোয়ালও তাতে রাজি হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ফোন নম্বর রেখে আসেন শাহানা। আশা ছিল, জোয়ালকে খুঁজতে নিশ্চয়ই কেউ ফোন করবেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেলের খোঁজে তাঁকে ফোন করেন মাট্টি মায়া তামাং।
রয়টার্সকে মাট্টি মায়া তামাং বলেন, “উনি যখন বললেন, জোয়াল কোথায় আছে, সেটা জানেন; তখন কথাটা সত্যি বলে মনে হচ্ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আর কখনোই ছেলেকে খুঁজে পাব না।”
যদিও এর আগেই তিনি ছোট ছেলেকে জীবিত খুঁজে পেয়েছিলেন। বড় ছেলের সন্ধান পাওয়ার পর তিনি বলেন, “মনে হলো, আমার জীবনটা যেন আবার ফিরে পেলাম।”
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে স্কুল
বুধবার সকালে অন্য দিনের মতো দুই ছেলে গাড়িতে করে স্কুলে যায়। বাড়িতে ছিলেন মাট্টি মায়া তামাং। তিনি তাঁত বুনছিলেন। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো আওয়াজ শোনেন।
তিনি বলেন, “দেখতে পাচ্ছিলাম, সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছিল, আমার ছেলেরাও নিশ্চয়ই ভেসে গেছে।”
তিনি ছেলেদের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্বাভাবিক সময়ে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে ১৫–২০ মিনিট লাগলেও তখন পুরো এলাকার চেহারা বদলে যায়। স্কুলের ভবনও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
তিনি বলেন, কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল—কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর ও কাদা।
হাতে ছিল ২০ রুপি
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নুয়াকোটের ১৫ শয্যার চক্রদেব হাসপাতালে ছিল জোয়াল। সেখানেই তার দেখা পান শাহানা।
জোয়ালের ডান পা ভেঙে গেছে। মুখে আঁচড় আর আঘাতের দাগ। তখনও তার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট।
কর্মকর্তারা জানান, যে পুলিশ সদস্যরা শিশুটিকে উদ্ধার করেছিলেন, তাঁরাই রুপিগুলো দিয়েছিলেন। হাসপাতালে যেতে রাজি করাতে শিশুটিকে এই টাকা দেওয়া হয়েছিল।
শাহানা ধীরে ধীরে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে জোয়াল জানায়, ঢলের মুহূর্তে সে স্কুলে পড়ছিল। হঠাৎ চারপাশ একেবারে অন্ধকার হয়ে যায়।
শিশুটি জানায়, এক বন্ধুর সঙ্গে সে স্কুল থেকে দৌড়ে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে যায়। ঢলের পানি থেকে বাঁচতে গাছে উঠে পড়ে। তখন শাহানা জানতে চান, “ভয় পেয়েছিলে?” জোয়াল মাথা নেড়ে বলে, “না।”
মা–ছেলের আবার দেখা
জোয়ালের পরিবারের সদস্যরা শুক্রবার কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ছুটে আসেন। আগের দিন চিকিৎসার জন্য সেখানে নেওয়া হয়েছিল তাকে।
দুর্যোগের পর থেকে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় শাহানা তাঁদের জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন। দুই ঘণ্টার যাত্রা শেষে তাঁরা রাজধানীতে পৌঁছান। ছেলের শয্যার পাশে নীরবে এসে দাঁড়ান মাট্টি মায়া তামাং।
জোয়ালের বাবা জাপানে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। তিনিও ছেলের কাছে আসার জন্য রওনা হয়েছেন।
বুধবারের এই দুর্যোগ রাসুয়ার মানুষের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত মাট্টি মায়া তামাং। হাসিমুখে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “সব সময়ই ও ভীষণ দুষ্টু। হাড় ভাঙার ঘটনা ওর জীবনে এটাই প্রথম নয়।”