![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দেশে ফিরিয়ে আনার’ লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জন শিক্ষককে শনাক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন; তবে কোন প্রক্রিয়ায় তাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের কমিটি গঠন ‘আইনের পরিপন্থি’।
তারা এও বলছেন, কারও রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার করতে পারে না। ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতার’ অভিযোগে শিক্ষকদের তালিকা করার বিষয়টিকে প্রশাসনের ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
গত ১৩ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের গোপন তৎপরতা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়।
“প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষক গোপন তৎপরতায় লিপ্ত আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জন শিক্ষকের নাম শনাক্ত করা গেছে।”
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয়টি ‘খতিয়ে দেখে করণীয় নির্ধারণ’ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন এবং আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ইকরামুল হক।
আরও কারও নাম শনাক্ত করা গেলে তাদের বিষয়টিও এই কমিটি খতিয়ে দেখবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
কীসের ভিত্তিতে প্রশাসন এই শিক্ষকদের শনাক্ত করেছে—জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা কারও তালিকা করিনি। কারা করেছে, তাও আমি জানি না। উপাচার্য আমাদের একটি কমিটি করে দিয়েছেন। আমরা এখনো বসিনি।”
উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে তালিকা প্রণয়নের ভিত্তি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) তথ্য চেয়েছে। তাদেরকে তথ্য দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আমরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি মাত্র, আমরা নিজেরা তালিকা করিনি।”
‘যুক্ত না হয়েও তালিকায় নাম’
সম্প্রতি একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ‘পরিবেশ তৈরি’ এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘গোপন তৎপরতা’ চালাতে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষক টেলিগ্রাম অ্যাপভিত্তিক একটি ‘গোপন গ্রুপে’ যুক্ত রয়েছেন। ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে ওই গ্রুপের মাধ্যমে কার্যক্রম সমন্বয় করা হচ্ছে।
তালিকায় থাকা অন্তত তিন শিক্ষক দাবি করেছেন, তারা এ ধরনের কোনো তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত নন। তারা হলেন—শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান এবং অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি এ ধরনের কোনো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত নই। তালিকায় আমার নাম কীভাবে এসেছে, তা আমি জানি না।”
অধ্যাপক মশিউর রহমান বলেন, “আমার কোনো টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট নেই। এর আগে কখনো অ্যাকাউন্ট খুলিনি। আমি কীভাবে যুক্ত হলাম বা প্রশাসন কীভাবে তালিকা করল, তা শুধু তারাই বলতে পারবে। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউজিসির সঙ্গে যে সভা ডেকেছিলেন, সেটি ছাড়া টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের কোথাও আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
আর অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত বলেন, “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নামের সঙ্গে আমার নামের মিল রয়েছে। সম্ভবত সেখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভুল করে আমার নাম তালিকাভুক্ত করেছে। আমি এমন কোনো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত নই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চিঠি দিলে আমি সেটাই তাদের জানাব।”
কমিটি নিয়েও প্রশ্ন
‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা’র অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে কমিটি গঠন করেছে, তার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও আইনজ্ঞরা।
তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো কমিটি গঠন করা যায় না। কেবল পত্রিকায় কী ছাপা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বা শনাক্ত করা আইনের পরিপন্থি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব গণমাদ্যমকে বলেন, “রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে কোনো ব্যক্তি লিপ্ত হলে তার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রচলিত আইন আছে। রাষ্ট্র আইনগতভাবে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা করে কমিটি গঠন করা বা শিক্ষকদের তালিকা করা আইনগতভাবে বৈধ নয়। এটি শিক্ষকদের আতঙ্কে ফেলার শামিল।”
তবে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে কমিটি করতে পারে। উপাচার্য মহোদয় এটি করে দিয়েছেন, যা পরে সিন্ডিকেটে অনুমোদন হবে।”
সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এই কমিটি করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পত্রিকায় একটি খবর আমাদের নজরে এসেছে। সেটি খতিয়ে দেখতেই এই কমিটি।”
বিচার কোন আইনে?
কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে নেই।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর ৫৬(৩), ১ম সংবিধির ৪৫(৩) এবং অর্ডিন্যান্স ও রেগুলেশন চ্যাপ্টার ২০-এর বিধি ১৩ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘অশিক্ষকসুলভ ও নৈতিক স্খলনজনিত’ অপরাধ।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বিধি ১৩(২) অনুযায়ী এসব অপরাধে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ ও চাকরি থেকে বরখাস্তের মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কেবল নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার দায়েই কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা যেতে পারে এবং এর জন্য একটি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে। এখানে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ কোনো সরাসরি উল্লেখ নেই।
একইভাবে প্রথম সংবিধির ৪৫(৩) ধারায় শাস্তির কথা থাকলেও ৪৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী কোনো কর্মচারীর রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোনো বৈধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না, যদি না তিনি সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা নেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, “আইনে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে বা রাজনৈতিক মতামতের কারণে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, “ঢালাওভাবে অভিযোগ করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আদালতে তা খারিজ হয়ে যাবে।”
আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়, সেখানে কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড করলে তার কী শাস্তি হবে—তার উল্লেখ নেই। ফলে এ বিষয়ে কমিটি গঠনের কোনো এখতিয়ার প্রশাসনের নেই। এ ধরনের কমিটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে রাজনীতি করছে, তা-ই প্রতীয়মান হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রবিরোধিতা মানে একটি দেশকে অন্য দেশের অংশ করার চেষ্টা, মানুষ মারা বা দেশের কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তো এসবের সঙ্গে জড়িত নন। আর যদি জড়িত হনও, তবে রাষ্ট্রীয় আইনে ব্যক্তি হিসেবে তার বিচার হবে। ঢালাও অভিযোগের শিকার শিক্ষকদের এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”
তবে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, “আমাদের কমিটি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। এটি যদি ফৌজদারি অপরাধ হয়, তবে বিধি মোতাবেক বিচার হবে।”