![]()



‘আপনারা হয়তো টের পাননি বা খবর রাখেননি। করো’না রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউগুলো কিন্তু আবারও ভরে গিয়েছে। অনেকদিন ফোন আসেনি আইসিইউ বেডের খোঁজের জন্য,কিন্তু আবারও সেটা শুরু হয়েছে। সবাই একটু সতর্ক হন’—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এভাবেই লিখেছেন বেসরকারি এভা’র কেয়ার হাসপাতা’লের স্পেশালিস্ট রেজিস্ট্রার ডা. নাকিব শাহ আলম।
একই কথা লিখেছেন ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতা’লের ভ্যাস্কুলার সার্জন ডা. সাকলায়েন রাসেল। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে ফোন আসছে। হাসপাতাল লাগবে, বেড লাগবে আইসিইউ লাগবে।আপনজনের মৃ’ত্যুর খবরগুলো বাড়ছে, কারণ একটাই করো’না! খালি হয়ে যাওয়া হাসপাতালগুলো আবারও ভরে উঠছে! সিট সংকট শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।আমাদের মনে হয় আরেকটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন!’
দেশে করো’নার সংক্রমণ আবার বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (১৭ মা’র্চ সকাল ৮টা থেকে ১৮ মা’র্চ সকাল ৮টা) পর্যন্ত করো’নাতে শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ১৮৭ জন। যা কী’না গত তিনমাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ৯ ডিসেম্বরের পর আজ বৃহস্পতিবার (১৮ মা’র্চ) একদিনে শনাক্ত ২ হাজার ছাড়িয়ে গেলো। ৯ ডিসেম্বর শনাক্ত ছিল ২ হাজার ১৫৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় দৈনিক শনাক্তের হার ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ আর এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
গত ১৭ মা’র্চে শনাক্তের হার ছিল সাত দশমিক ৬৮ শতাংশ, ১৬ মা’র্চে আট দশমিক ২৯ শতাংশ, ১৫ মা’র্চে নয় দশমিক ৪৮ শতাংশ, ১৪ মা’র্চে সাত দশমিক ১৫ শতাংশ, ১৩ মা’র্চে ছয় দশমিক ২৬ শতাংশ, ১২ মা’র্চে ছিল ছয় দশমিক ৬২ শতাংশ, ১১ মা’র্চে ছিল পাঁচ দশমিক ৮২ শতাংশ আর ১০ মা’র্চে ছিল পাঁচ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থ্যাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে করো’নাতে দৈনিক শনাক্তের হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
এ অবস্থায় সবার মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্ম’দ খুরশীদ আলম জানিয়েছেন, নতুন করে এখন যারা আ’ক্রান্ত হচ্ছেন তাদের বেশীরভাগই তরুণ, তাদের বেশিরভাগেরই আইসিইউ লাগছে। তিনি বলেন, ‘গেলো দুই মাস আম’রা স্বস্তিতে ছিলাম, তাই এখন আম’রা কোনও কিছু মানছি না। সামনের দিকে আরও বড় ধরনের বিপদে পড়তে যাচ্ছি, যদি আম’রা স্বাস্থ্যবিধি না মানি।’ করো’নার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় দেশের সব হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এরইমধ্যে প্রশাসনসহ সিভিল সার্জন অফিসগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সারাদেশে আইসিইউগুলো প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতর তথ্যমতে সারাদেশে করো’না আ’ক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৫৫৮টি। তার মধ্যে রোগী ভর্তি আছেন ২৮৬ জন, বাকী’ ২৭২টি শয্যা খালি রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করো’না ডেডিকে’টেড ১০টি সরকারি হাসপাতা’লে আইসিইউ রয়েছে ১১৭টি, তার মধ্যে রোগী ভর্তি আছেন ৮৮ জন আর ফাঁকা রয়েছে ২৯টি। অ’পরদিকে, বেসরকারি ৯টি হাসপাতা’লের ২৮১টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে রোগী আছেন ২০১ জন আর শয্যা ফাঁকা রয়েছে ৮০টি।
গত অক্টোবর –নভেম্বরে যে পরিমাণ রোগী ছিল তার দ্বিগুণ রোগী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লের কোভিড ইউনিটে ভর্তি বলে জানান হাসপাতা’লের মেডিসিন ও ইনফেকশাস ডিজিজ বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মা’রুফ।
নতুন সংক্রমণে জটিলতা বেশি কী’না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজন্য গবেষণা প্রয়োজন। তবে অনেক রোগী পাচ্ছি যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে বেশি। আর করো’নায় আ’ক্রান্ত রোগী যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হয়,তাদেরই আম’রা সিভিয়ার রোগী হিসেবে বিবেচনা করি। একইসঙ্গে তরুণ রোগী বেশি পাচ্ছি এবার।
ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মা’রুফ বলেন, প্রথমবারের সংক্রমণের সময় দেখেছি, ধীরে ধীরে সংক্রমণের হার বেড়েছে, ধীর গতিতে নেমেছে। কিন্তু এবারের সংক্রমণ একটা ‘শার্প রাইজ’ হচ্ছে। শার্প রাইজ মানে হচ্ছে এর ট্রান্সমিশন খুব দ্রুত হচ্ছে। ‘আইসিইউর জন্য এখন ফোন কল বাড়ছে এখন’—বলেন ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা বলেন, আ’ক্রান্তের হার খুব দ্রুত বাড়ছে। ঢাকা মেডিক্যালের ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাবে আজ আ’ক্রান্তের হার ২৬ শতাংশ। তাদের মধ্যে নন কোভিড ইউনিটে কাজ করা মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। আর আ’ক্রান্তের হারের পাশাপাশি সিভিয়ার রোগীর সংখ্যাও বেশি। এবারের স্ট্রেইনটি মা’রাত্মক সংক্রামকই শুধু নয়, বিপজ্জনকও বটে। এটি বিদ্যুৎগতিতে আগের স্ট্রেইনটিকে প্রতিস্থাপন করবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, নতুন ভেরিয়েন্ট মানেই বেশি বিপদজনক,বেশি সংক্রামক,বেশি মৃ’ত্যু। হাসপাতা’লে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগেরই আইসিইউ লাগছে কারণ অবস্থা খা’রাপ না হলে মানুষ হাসপাতা’লে আসছে না। এই ভাই’রাসকে প্রতিরোধ করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনও বিকল্প নেই জানিয়ে ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানলে সবাই ভালো থাকবেন। নো মাস্ক নো সার্ভিসের পর যেমন সংক্রমণ কমে এসেছিল, সেভাবে আবারও চেষ্টা করা দরকার।
করো’নায় আ’ক্রান্ত ও করো’নার উপসর্গের রোগী লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মন্তব্য করে জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হাসপাতা’লে খালি শয্যা পাওয়া যাচ্ছে না। অধিকাংশ আইসিইউতে বেড নেই। মহাদু’র্যোগ দরজায় আবার কড়া নাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান অ’স্ত্র হলো, মাস্ক পরা,স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং করো’নার টিকা নেওয়া। নয়তো প্রতিটি অবহেলার দায় শোধ করতে হতে পারে।
দেশের কোভিড ডেডিকে’টেড অন্যতম হাসপাতাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এই হাসপাতা’লের আইসিইউ কখনোই শূন্য থাকেনি, তবে রোগীদের ওয়েটিং লিস্ট ( অ’পেক্ষমান তালিকা) কমে এসেছিল। এই হাসপাতা’লের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ( আইসিইউ) র প্রধান ডা. শাহ’জাদ হোসেন মাসুম বলেন, আইসিইউর ওয়েটিং লিস্ট বড় হচ্ছে আর ওয়ার্ডে ভর্তি পিকে চলে গেছে। আমাদের ক্যাপসিটি প্রায় আম’রা ক্রস করে চলে গেছি।
আগে আম’রা আইসিইউ থেকে অনেক রোগীকে কেবিনে স্থা’নান্তর করতে পারতাম অর্থাৎ তারা সুস্থ হতেন,ভালোর দিকে যেতেন কিন্তু এখন রোগীরা খা’রাপ হয়ে যাচ্ছে বেশি,শিফট কম করতে পারছি—বলেন তিনি।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন