সর্বশেষ আপডেট : ৬ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

চাঁদাবাজি ও হত্যা : নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়

মুফতি আ. জ. ম. ওবায়দুল্লাহ ::

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সামান্য চাঁদা না দেওয়ায় একজন নিরীহ ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর মেরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটা কোনো নাটকের দৃশ্য নয়, বাস্তবতার এক জঘন্য চিত্র। এই বর্বরতা, এই পাষণ্ডতা সভ্যসমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ আমরা তা নিজের চোখে দেখছি, সংবাদপত্রের শিরোনামে পড়ছি, ভিডিওচিত্রে প্রত্যক্ষ করছি।

আজ প্রশ্ন জাগে, কোন সভ্যসমাজে আমরা বাস করছি? মানুষ কি এতটাই নিষ্ঠুর, এতটাই বেহায়া হয়ে গেছে যে, সামান্য অর্থের বিনিময়ে জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না? ভাবতেও গা শিউরে ওঠে, একটি মানুষের জীবন আজ এতটাই তুচ্ছ, সামান্য টাকার জন্যও তা হারাতে হয়! জাহিলিয়াত আজ যেন হার মানিয়েছে এসব দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ডের কাছে।

একসময় মানুষ অন্ধকারে সন্তান কবর দিত, আজ আলোর জগতে মানুষ পাথর দিয়ে অপরাধহীন মানুষকে হত্যা করে। পার্থক্য শুধু কালের, মনোভাবের নয়। সেই জাহিলি মানসিকতা আজও টিকে আছে, বরং আরো ভয়ংকর ও নগ্নভাবে আত্মপ্রকাশ করছে।

আমরা যদি বাস্তবতার মুখোমুখি হই, দেখব—চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন, গুম ও ধর্ষণ—এগুলো আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। বরং প্রতিটি অপরাধ একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কের অংশ। একটি দুষ্টচক্র, একটি অবৈধ রাজনীতি, একটি অপরাধপুষ্ট প্রশাসনিক শিথিলতা এর পেছনে সক্রিয়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই অপরাধীদের অনেকেই সামাজিক, রাজনৈতিক, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় নিরাপদ জীবনযাপন করে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না। দেশের মানুষ আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একজন নাগরিক তার নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ নন, পথে চলা নিরাপদ নয়, প্রতিবাদ করা নিরাপদ নয়—এ কোন রাষ্ট্র, কোন গণতন্ত্র, কোন সভ্যতা? আমরা যদি এখনই সংকটের গভীরতা অনুধাবন না করি, যদি যথাযথ প্রতিরোধ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করি, তবে ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার, আরো রক্তাক্ত হবে।

এ ধরনের অপরাধ যেহেতু দিন দিন বাড়ছে, এর মানে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ। বিচারব্যবস্থা শ্লথ, তদন্তে পক্ষপাতিত্ব, পুলিশি গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরাধীর পরিচয় আড়াল করা—এসবই অপরাধীদের উৎসাহ দেয়। যখন একজন অপরাধী দেখে, সে অপরাধ করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, তখন সে শুধু খুন নয়, আরো বড় অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করবে না।

বিচারহীনতা যেকোনো সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। মিটফোর্ড হত্যার মতো ঘটনা যদি দ্রুততম সময়ে বিচার না পায়, যদি খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হয়, তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের আলোচনাও কয়েক দিন পর থেমে যাবে। শুধু এখানেই শেষ নয়, এ হত্যাকাণ্ডই আরেকটি হত্যাকাণ্ড টেনে নিয়ে আসবে, তা খুব বেশি দূরে নয়।

আজ এই চরম নির্মমতা ও পাশবিকতার পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণ, তা হলো—আমাদের নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। আমাদের সমাজ থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও ধর্মীয় জ্ঞান। আজ শিশুদের শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য, চরিত্র গঠনের জন্য নয়। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে এক শ্রেণির ‘শিক্ষিত বর্বর’, যারা আইন জানে, সমাজ জানে, কিন্তু বিবেকহীন।

একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হবে, যখন মানুষ নৈতিকতা ও ধর্মীয় চেতনায় ফিরে আসবে, তাহলে তারা অপরাধ থেকেও দূরে থাকবে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে, মসজিদ-মাদরাসায়, স্কুল-কলেজে খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে আল্লাহভীতি ও মানবিকতা শেখাতে হবে। ইসলামে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছেÑ‘যে ব্যক্তি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল’। (সুরা মায়েদা : ৩২)

খুনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তার বাস্তবায়ন খুবই ধীরগতি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহ পায়। এ জন্য প্রথম কাজ হলো দ্রুত বিচারের আওতায় এনে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। পাথর দিয়ে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি যথেষ্ট নয়। আর এই শাস্তি হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক, দ্রুত এবং জনসমক্ষে কার্যকর করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো খুনি এমন কাজ করতে সাহস না পায়। আইন যতদিন পর্যন্ত দুর্বল থেকে যাবে, অপরাধী ততদিন সাহসী হয়ে উঠবে।

চাঁদাবাজি ও খুন দমনে সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন, অপরাধীর অতীত ইতিহাস এবং দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। চাপের মুখে পড়ে সংবাদ গোপন করা, অপরাধীর পরিচয় আড়াল করা, এসব গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

চাঁদাবাজির বেশির ভাগ ঘটনাতেই দেখা যায়, কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নাম জড়িত থাকে। অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঢাল ব্যবহার করে থানায় প্রভাব খাটায়, মামলার কার্যক্রম ব্যাহত করে। এই রাজনৈতিক অপশক্তির রক্তচোষা হাত ভেঙে দিতে হবে। যেই অপরাধ করবে, সে যে দলেরই হোক, তার প্রকৃত বিচার অবশ্যই হতে হবে।

চাঁদাবাজি ও অপরাধ দমনে নৈতিক ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে, সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি চালিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় সুশৃঙ্খল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সিসিটিভি, আলোকসজ্জা, স্থানীয় নজরদারির মাধ্যমে চাঁদাবাজদের মোকাবিলা করতে হবে। ভয় নয়, সাহসী প্রতিবাদই হতে পারে সমাজ রক্ষার ঢাল।

চাঁদাবাজি একটি পুরোনো সমস্যা। তবে ইদানীং এটি রূপ নিয়েছে সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধে। কিছু বখাটে যুবক রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা গ্যাং সদস্যরা এখন একেকটি এলাকাকে ‘নিজস্ব এলাকা’ দাবি করে চাঁদা তোলে, ব্যবসায়ীকে হুমকি দেয়, যারা টাকা দিতে অস্বীকার করে, তাদের শাস্তি দেয়। সোহাগের মৃত্যু সেই চাঁদাবাজ সন্ত্রাসেরই এক ভয়ংকর নমুনা। এটা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মুখে চপেটাঘাত।

এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ না গড়লে তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়বে। শুধু মিটফোর্ড নয়, আজ দেশের প্রায় প্রতিটি শহরেই ব্যবসায়ীদের নীরবে চাঁদা দিতে হয়। কেউ মুখ খুললে তার পরিণতি হয় সোহাগের মতো করুণ। তাই প্রতিটি থানার অধীনে চাঁদাবাজদের তালিকা প্রণয়ন করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার করে বিচার করতে হবে। প্রশাসনের ভেতরে থাকা অপরাধ-সাহায্যকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।

সোহাগের মৃত্যু একটি প্রাণের মৃত্যু নয় শুধু, এটি আমাদের সমাজের বিবেকের মৃত্যু। আমরা যদি আজ জেগে না উঠি, প্রতিবাদ না করি, প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে আগামীকাল হয়তো আমাদের কেউ এ রকম বর্বরতার শিকার হবে। সেদিন শুধু আফসোস করার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

আমরা চাই, রাষ্ট্র জেগে উঠুক। বিচার বিভাগ কার্যকর হোক। প্রশাসন নিরপেক্ষ হোক। আর জনগণ সাহসী হোক। তাহলেই খুন-চাঁদাবাজির এই অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব। তাহলেই আমরা বলতে পারব, এ দেশ আলোর দেশ, এখানে অন্ধকারের ঠাঁই নেই।

লেখক : মুহাদ্দিস, ছারছীনা দারুস্সুন্নাত জামেয়ায়ে নেছারিয়া দীনিয়া, নেছারাবাদ, পিরোজপুর

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: