![]()


দেশ-বিদেশে সিলেটের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি ‘কিনব্রিজ’। ব্রিটিশ আমলে সুরমা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু দিয়ে আট দশক ধরে যানবাহন চলেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁ’কিপূর্ণ হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন সেতুটি। ঐতিহ্যবাহী সেতুটি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পদচারী-সেতুতে রূপান্তরের প্রস্তাব করেছিল সিলেট সিটি করপোরেশন। এরপর দুই বছর কে’টে গেলেও প্রস্তাবটির বাস্তবায়ন হয়নি।
সম্প্রতি সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচলে ফের ঝুঁ’কির শ’ঙ্কা করছে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ। এ জন্য কিনব্রিজের প্রবেশমুখে ভা’রী যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে। সেতুর মূল কর্তৃপক্ষ সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) বলেছে, লোহার কাঠামোর সেতুর সংস্কারকাজ রেলওয়ে বিভাগের মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও মেরামতকাজ হবে। এ কাজ শেষে প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সুরমা নদী বিভক্ত সিলেট নগরের উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ের বাসিন্দাদের যোগসূত্র তৈরি করতে ব্রিটিশ আমলে লোহার কাঠামোয় সেতুটি নির্মাণ করা হয়। একটানা দুই বছর নির্মাণকাজ শেষে ১৯৩৬ সালে সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামে এই সেতুর নামকরণ হয় ‘কিনব্রিজ’। আট দশকের বেশি সময় ধরে সচল এই সেতু মুক্তিযু’দ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর সংস্কার করে শুরু হয় যান চলাচল। সেতুর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৫০ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। তৃতীয় দফা সংস্কারের জন্য ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেতুর দুই দিকে লোহার বেষ্টনী দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ৫২ দিন।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, সেতুটির মূল কর্তৃপক্ষ সওজ। সিটি করপোরেশন থেকে শুধু তদারক করা হয়। সর্বশেষ তদারক করতে গিয়ে কিছু সংস্কারকাজ শেষে কিনব্রিজকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পদচারী-সেতুতে রূপান্তর করার জন্য একটি প্রস্তাব ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সওজকে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি কিনব্রিজটি আবার যান চলাচলের ঝুঁ’কির মুখে পড়ে। গত ২৯ জুলাই ভা’রী যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কিনব্রিজের মুখে সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে।
ভা’রী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পদচারী-সেতুর বিষয়টি আবার বিবেচনায় এল কি না, জানতে চাইলে প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মক’র্তা বলেন, ওই সময় সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মতামতসহ সওজের প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। এই প্রস্তাব অনুমোদন হলে কিনব্রিজ বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ পদচারী-সেতু হিসেবে নতুন পরিচয় পাওয়ার বিষয়টি তখন ইতিবাচকভাবে আ’লোচিত হচ্ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, প্রস্তাবটিও ঝুলে আছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, তৃতীয় দফা সংস্কারের দুই বছরের মা’থায় ভা’রী যানবাহন চলাচলে ফের ঝুঁ’কি দেখা দেওয়ায় রিকশা-ভ্যান-মোটরসাইকেল ছাড়া বাকি সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে। পদচারী–সেতুতে রূপান্তর প্রস্তাব স’ম্পর্কে তিনি বলেন, সেতুর দক্ষিণ পারের মানুষের কিছু আ’পত্তি ছিল। এরপরও সিটি করপোরেশন থেকে সেতুর মূল কর্তৃপক্ষ হিসেবে সওজকে পদচারী–সেতুতে রূপান্তরে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সওজ থেকে এই প্রস্তাবে তাঁরা কোনো সাড়া পাননি।
সওজের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদচারী-সেতু রূপান্তর নয়, আপাতত সংস্কার ও মেরামতের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিনব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল রেলওয়ের মাধ্যমে। লোহার কাঠামোর কাজ রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ যথাযথভাবে করে। বর্তমানে কিনব্রিজটি সংস্কার ও কিছু মেরামতকাজের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত জুন মাসে এ কাজের জন্য সওজ থেকে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে কিনব্রিজটি সংস্কার ও কিছু মেরামতকাজের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কাজটি লকডাউন শেষে শুরু হওয়ার কথা। পদচারী-সেতুতে রূপান্তর প্রস্তাব স’ম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি সিলেটে নতুন এসেছি। আমা’র আসার পূর্বে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, এ বিষয়টি আমা’র জানা নেই। সংস্কারকাজটি শেষ হলে কিনব্রিজ দিয়ে চলাচলের ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব থাকলে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’
কিনব্রিজকে স্থায়ীভাবে পদচারী-সেতুতে রূপান্তর করার দাবিতে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘নাগরিক বন্ধন’ নামে এক কর্মসূচি পালন করেছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আ’ন্দোলন (বাপা)। সিলেটে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, রেলওয়ের মাধ্যমে এই দফা সংস্কারের পর রেল-প্রকৌশলীদের মতামত নিয়েই পদচারী-সেতু রূপান্তর করার সুযোগ রয়েছে। সৌজন্যে:প্রথম আলো