![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীন সরকারের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
ঢাকা সফরে আসা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংকে বৃহস্পতিবার দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায় দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ কথা বলেন তিনি।
আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের স্থিতিশীলতার স্বার্থেও এই করিডোরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী।
ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে এক প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেন, চীন – বাংলাদেশ – মিয়ানমার করিডোর হলে এখানে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন একটি সংযোগ চালু হবে।
“তো স্বাভাবিকভাবে আরও বেশি অর্থনৈতিক যোগাযোগ, আরও বেশি অর্থনৈতিক যাতায়াত, মানে পণ্য ও মানুষের বেশি পরিমাণের যাতায়াত। ওটা তো ভালো দিকে। আর সরকার তো ইতিবাচক। এটা ভালো দিকে যাবে।”
যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সময় নতুন করে সামনে আনে বেইজিং।
চীন – মিয়ানমার – বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন কিছু নয়। এটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর অধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হল চীনের দক্ষিণ – পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ – চীন – ভারত – মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা বিসিআইএম নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের দিকে সেই উদ্যোগ আন্তঃসরকার স্বীকৃতিও পায়।
কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই নিয়ে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে।
এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। মূলত এটিই এখন সম্ভাব্য ‘চীন – মিয়ানমার – বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে চীনের।
বলা হচ্ছে, এ করিডোর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।
পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে। সেইসঙ্গে যোগাযোগ ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। চীনের ভাষ্য, রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে সেখানকার জাতিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও কমে আসবে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই করিডোর প্রতিষ্ঠাকে মিলিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “এটা করার আগে, রোহিঙ্গা ইস্যু ইজ অ্যান ইম্পর্টেন্ট ইস্যু। তো ওই জায়গায় তো একটা স্থিতিশীলতার দরকার আছে। তো, আমরা আলাপ আলোচনা করব এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই ইনশাল্লাহ আমরা এটা সমাধান করতে যাব।”
অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে ভূরাজনৈতিক কোনো শঙ্কা আছে কি-না, এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী উল্টো প্রশ্ন করেন, “কার শঙ্কা? কী শঙ্কা? উন্নয়নে কোনো শঙ্কা থাকবে কেন?
“এটা তো উন্নয়নের করিডোর হবে, সেখানে শঙ্কা থাকবে কেন? মানে সবাই তো বেনিফিশিয়ারি হবে।”
ঢাকায় লিউ হাইশিংয়ের কর্মব্যস্ত দুই দিন
মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় এসে কর্মব্যস্ত দুটি দিন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা ছেড়েছেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা লিউ হাইশিং।
বুধবার সকালে তার বাবার সাবেক কর্মস্থল ঢাকায় চীন দূতাবাস পরিদর্শনে যান তিনি। এরপর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান তিনি।
পরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এরপর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন তিনি। একইদিন বিকেলে শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করেন।
বুধবার দুপুরের বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতির ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন লিউ হাইশিং। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে উদ্বোধন করেন ‘বাংলাদেশ-চায়না সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্নেন্স স্টাডিজ’।
বৃহস্পতিবার সকালে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার শামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শন ও স্মার্ট ক্লাসরুম উদ্বোধন করেন করেন লিউ হাইশিং।
এদিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের এই প্রধানের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বৈঠক হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উভয়পক্ষ স্মরণ করেছে। জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেছে উভয়পক্ষ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশে চীনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবে লিউ শুচুইংয়ের ঢাকায় দায়িত্ব পালনের কথাও স্মরণ করেন তার ছেলে লিউ হাইশিং। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক জোরদারে বাবার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চীনের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের ভূমিকার কথা তুলে ধরে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে অব্যাহতভাবে কাজ করার আশ্বাস দেন লিউ হাইশিং।
“নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ প্রতিপাদ্যের অধীনে সম্পর্ককে আরও নতুন উচ্চতায় নেওয়ার অঙ্গীকার বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত করে উভয়পক্ষ।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে চীনকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।