![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একের পর এক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় এত মানুষ হতাহত হয়েছেন যে, অনেক হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালগুলোর কর্মীদের। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০৯ জনই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। বাকিরা বিক্ষোভকারী।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পালটা জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলার হুমকি দিয়েছে। সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ বলেও উল্লেখ করেছে।
হাসপাতালে লাশের স্তূপ
ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা বাড়ে। তেহরানের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে কমপক্ষে ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা সরকারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বিক্ষোভে অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে।
ইরানের তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বিবিসিকে বলেছেন, তাদের হাসপাতালগুলো সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও নিহতদের ভিড় সামলাতে সমস্যায় পড়ছে। হতাহতদের বেশির ভাগের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা। তেহরানের একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, অনেক তরুণের মাথায় এবং বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে। তেহরানের আরেকটি হাসপাতালের কর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শরীরে গুলি এবং রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়ে আসা বহু মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা।
ইরানে হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল!
ইরানে সহিংস পদ্ধতিতে বিক্ষোভ দমনের জবাব সামরিক হামলার মাধ্যমে দেওয়া হবে বলে শুক্রবার পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান অভিযোগ করেছে, দেশটির শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর’-এর রূপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের অভিযোগের জবাবে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইরানিরা এখন স্বাধীনতা চায়, হয়তো অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির প্রতিক্রিয়ায় কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছেন ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা। বিবেচনাধীন একটি বিকল্প হলো ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একটি বড় আকারের বিমান হামলা অভিযান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। কোনো মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম বা সেনাসদস্যকে সরানো হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সতর্কতা জারি করেছে ইসরাইল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানে হামলা চালানোর জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে ফোনে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে বলে এক খবরে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যে কোনো হস্তক্ষেপের বিষয়ে ইসরাইল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলেও রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
পালটা হুমকি ইরানের
যে কোনো মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরাইলকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে গতকাল রবিবার ইরানের পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, কয়েক লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে এবং বিক্ষোভের মুখে তারা পিছু হটবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি। ইরানে শতাধিক শহরে যে বিক্ষোভ চলছে, তাতে যারা অংশ নেবেন, তাদের ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ। এ ধরনের ‘অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ বলে শনিবার জানিয়েছেন তিনি। এমন সতর্কতা ও সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে গতকালও রাস্তায় নামের ইরানে বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভের শুরু যেভাবে
দুই সপ্তাহ আগে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি দিয়ে দেশটিতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভশুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশটিতে হওয়া বিক্ষোভের পর চলমান আন্দোলনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।