সর্বশেষ আপডেট : ১৭ ঘন্টা আগে
রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেন ট্রাম্প, কী করবে ভারত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রোখার সাধ্য যেন কারও নেই। একের পর অঘটন ঘটিয়ে চলেছেন তিনি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তাঁর প্রাসাদ থেকে তুলের আনার রেশ কাটতে না কাটতেই হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের পণ্যে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

এ বিলের নাম ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’ বা রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিল পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর আমেরিকা চাপ তৈরি করার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দেওয়া। বিলটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত ভোটাভুটি হয়নি।

এর আগে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের পণ্যে ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। তার সঙ্গে ছিল পাল্টা শুল্কের ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক। তাতেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্যে রপ্তানি কমে গিয়েছিল। এবার ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

এর মধ্যেও মার্কিন-ভারত বাণিজ্য আলোচনা চলছে। সেই আলোচনার যেন শেষ নেই। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় বিষয়টির ফয়সালা হচ্ছে না।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়, বিশ্বব্যাপী এই যে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন তিনি, তার শেষ কোথায়। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, একটি জিনিস আছে—আমার নিজের নৈতিকতা—আমার মন। সেটাই একমাত্র জিনিস—এটিই কেবল আমাকে থামাতে পারে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই। আমি মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করছি না।’

ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কি আন্তর্জাতিক আইন মানা উচিত? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মানি; কিন্তু সিদ্ধান্ত আমিই নেব। এটা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক আপনার সংজ্ঞা কী, তার ওপর।’

ভারতের উত্তর
গত বছরের আগস্ট মাসে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছিলেন, তখন দিল্লির পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেওয়া হয়। ভারতের অভিযোগ ছিল, পশ্চিম দ্বিচারিতা করছে। কেননা তারা নিজেরাই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে তেল আমদানি করছে। তবে আমেরিকার শুল্ক আরোপের পর বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ভারতকে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, অথবা ৫০০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে।

ভারতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এমন হলে আমেরিকায় ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ভারত যে ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ৭৪০ কোটি ডলার রপ্তানি করে, তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অজয় শ্রীবাস্তব বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত ট্রাম্প নিজের ক্ষমতায় ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। কিন্তু এই বিল কংগ্রেসে পাস হতে হবে। আমার মনে হয় না, এই বিল পাস হবে। তবে ভারতের উচিত হবে, নিজের নীতি পরিষ্কার করা।’

ভারতের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বলেছিল, তারা প্রত্যাশা করছে না যে জানুয়ারি মাসে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আসবে।

ফলে জানুয়ারি মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসতে পারে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

ব্লুমবার্গের সূত্রে বিবিসি জানিয়েছে, গত জুন মাসের তুলনায় ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালে ভারত আমেরিকায় ৮৭ দশশিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল—দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ফলে ভারতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে দেওয়া কঠিন।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সমুদ্রপথে রাশিয়ার তেলের বৃহত্তম ক্রেতা এখন ভারত। কম দামে তেল কিনে ভারত লাভবান হয়েছে। এমনকি ভারতের পরিশোধনাগারগুলো সেই তেল রপ্তানি করে লাভবান হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি এখন সাধারণ গণিতের। সেটা হলো, রাশিয়ার তেল কিনে ভারত কি বেশি লাভবান হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে পারলেই কেবল বেশি লাভবান হবে? উত্তরটা এর মাঝামাঝি কোথাও নিহিত থাকতে পারে।

চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে
এদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কমলেও চীনের মতো দেশে ভারতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে চীনে ভারতের রপ্তানি ৯০ শতাংশ বেড়ে ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এপ্রিল থেকে নভেম্বর সময়ে মোট রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২২ কোটি ডলার। প্রাথমিকভাবে এই পরিসংখ্যান দেখে মনে হতে পারে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবিত হয়। যদিও গত কয়েক বছরে এই সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল।

জিটিআরআই বলছে, চীনে ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনো সীমিত পরিসরে আটকে আছে। এর মধ্যে একধরনের কাঠামোগত অস্থিরতা আছে। ভারতের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য থাকলেও এই প্রবৃদ্ধি মূলত হাতে গোনা কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানির উল্লম্ফনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে লৌহ আকরিক ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি ছিল অনিয়মিত।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক
সামগ্রিকভাবে ভারত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে তার বাণিজ্য এত বেশি নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারালে তাকে সমস্যার মুখে পড়তে হবে না।

বরং বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক বিরোধ যখন তুঙ্গে, সেই সময় ভারতের পরীক্ষিত মিত্র রাশিয়া তার পাশে কতটা দাঁড়াতে পারে, বিশ্লেষকেরা তা দেখার অপেক্ষায় আছেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পার্থক্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি যেখানে বছরে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, সেখানে রাশিয়ায় তার রপ্তানি মাত্র ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন বা ৪৮৮ কোটি ডলার। গত পাঁচ বছরে ভারত-রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়লেও সেই বাণিজ্যের ভারসাম্য মূলত রাশিয়ার দিকেই হেলে আছে। সেই সঙ্গে ভারত সম্প্রতি রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর মাসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফর করে গেলেন। খবর ইকোনমিক টাইমস।

বৃহত্তর জোট
দ্য হিন্দু পত্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পাদক স্ট্যানলি জনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, শুধু শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্যই জোট গড়ে ওঠে না, বরং দেশগুলোর সামনে যে হুমকি তৈরি হয়, তার ভিত্তিতেও জোট গড়ে ওঠে। আমেরিকা যদি লাগামহীন মহাশক্তির মতো আচরণ করতে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরির জোট গড়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই মোড়লগিরির বিপরীতে রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো নিজেদের মতো করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাদের নেতৃত্বে গঠিত ব্রিকস জোট এখন বৈশ্বিক জিডিপির ৩২ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়া-চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে। এখন রাশিয়া-ভারত নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে মধ্য এশিয়ায়ও বাজার খুঁজছে ভারত। এ রকম নানা প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরির প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা করছে ভারত।

৫০০ শতাংশ শুল্ক একধরনের কৌশল
ভারতের বৈদেশিক নীতিবিষয়ক একটি থিঙ্কট্যাংক অনন্ত সেন্টারের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচী এই বিল এবং আমেরিকার কৌশল সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দীর্ঘ পোস্ট লিখেছেন। খবর বিবিসির।

ওই পোস্টে ইন্দ্রাণী উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্পের এই বিল সামনে নিয়ে আসার পেছনে ইউক্রেন নিয়ে তাদের হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ রাশিয়ার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, ভারতের পণ্যে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগের একধরনের কৌশল। ইন্দ্রাণী বলেন, মূলত মস্কোকে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করতে তার মিত্রদের ওপর এই চাপ।

ইন্দ্রাণী আরও বলেন, শুল্ক বিল পাস হলেও এতে প্রেসিডেন্টের ছাড় দেওয়ার সুযোগ আছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বিশেষ ছাড় পেতে পারে। তারা হয়তো নির্বিঘ্নে রুশ জ্বালানি কিনতে পারবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ইউরেনিয়াম কেনে। এটাও স্পষ্ট নয়, বর্তমান আইন অনুযায়ী আমেরিকা ২০২৮ সাল পর্যন্ত নিজেকে ছাড় দিয়ে যাবে কি না।

বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকায় এই ৫০০ শতাংশ শুল্ক বা তেল কেনাবেচা বন্ধ হলেও ভারত বা রাশিয়ার তেমন ক্ষতি হবে না বলে মনে করেন ইন্দ্রাণী।

যা-ই হোক না কেন, গত এক বছরে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, আগামী কিছুদিন এই সম্পর্ক আইসিইউতে থাকবে বলে মনে করছেন ইন্দ্রাণী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: