![]()


আবারও গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান সরকার। সেই বিক্ষোভ থেকে দাবি উঠেছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পদত্যাগের। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করলেও এড়ানো যায়নি প্রাণহানি।
পাশাপাশি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে তেহরানের। এমন প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকার সক্ষম হবে নাকি পতনই হবে শেষ পরিণতি, তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে চলছে তুমুল আলোচনা।
অনেকের দাবি, ইরানে খামেনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বহু বছর ধরেই জমতে জমতে ‘বিস্ফোরণের দিকে’ এগোচ্ছিল। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে চলমান বিক্ষোভের সূচনা হয়। তবে এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে আরও গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ।
এর মধ্যে রয়েছে—
১. বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরাসহ ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার কড়াকড়ি, যা নারীসমাজ ক্রমেই প্রকাশ্যে অমান্য করছে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা।
৩. লেবানন, গাজা, ইরাক ও ইয়েমেনে প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে বিপুল ব্যয়।
৪. পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের কেন্দ্রীয়করণ নীতি, যার ফলে দেশটি ক্রমেই খরার ঝুঁকিতে পড়ছে।
চলমান আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত বাজারভিত্তিক ব্যবসায়ী ও দোকানিদের মাধ্যমে। তবে গত এক সপ্তাহে এতে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের কর্মীরা। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেই সময় কঠোর দমন-পীড়ন চালালেও, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন রূপে এই প্রতিবাদ অব্যাহত আছে।
ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি
কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, ইরান সরকার এখন নতুন করে বহিঃশত্রু বা বিদেশি চাপের মুখেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যা না করতে’ তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এ ছাড়া ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই হুমকি দিয়েছেন যে ইরান যদি আবার পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত না করে, তবে নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হবে।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। গত বছরের জুনে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রও সেই যুদ্ধে যুক্ত হয়। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার দাবিও করেন ট্রাম্প।
তবে বহু বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল অবকাঠামো টিকে আছে।
‘আপনিও ক্ষমতাচ্যুত হবেন’—ট্রাম্পকে খামেনি
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অত্যাচারী ব্যক্তি’ উল্লেখ করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে ‘নাশকতাকারী’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুক্রবার দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষী আছে যে অত্যাচারীরা বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ফারাও, নমরুদ ও মোহম্মদ রেজা শাহরা (পাহলভি) তাদের আগ্রাসী মনোভাবের জন্য ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, ট্রাম্পও পারবেন না। তাকেও ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।’
ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে ‘নাশকতাকারী’ উল্লেখ করে খামেনি বলেন, বিক্ষোভ-আন্দোলনের মাধ্যমে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানে হামলার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন।
‘তারা এমন একজন ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, যিনি নিজের দেশ চালাতে জানেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত কীভাবে দেশ চালাতে হয়, তা শেখা এবং নিজের দেশে সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।’
জনগণের এই সরকারপতন আন্দোলন সফল হবে না দাবি করে খামেনি বলেন, সবারই জানা থাকা উচিত যে এই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র লাখ লাখ সম্মানিত মানুষের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাশকতকারীদের তৎপরতায় এই সরকারের পতন ঘটবে না।’
প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর ধরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েলের অবনতি, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকায় নাভিশ্বাস উঠছিল ইরানের সাধারণ জনগণের।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
সূত্র : ইরান ইন্টারন্যাশনাল, দ্য কনভারসেশন