সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন আজ

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি, জাগরণের কবি, চেতনার কবি, মূল্যবোধের কবি, সাম্যের কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মদিন। সরকারি-বেসরকারি নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপিত হবে।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ। এবং মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। তিনি ছিলেন পিতামাতার ৬ষ্ঠ সন্তান। তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া।

১৯০৮ সালে কাজী নজরুল ইসলামের পিতা ফকির আহমদ মৃত্যুবরণ করলে তাদের পরিবার আর্থিক অনটন ও কষ্টের মধ্যে পড়ে যায়। গ্রামের স্থানীয় মক্তবে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের প্রয়োজনে নজরুল নিজের মক্তবেই শিক্ষকতা ও মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। আল কোরআন, ধর্ম ও দর্শন, ইসলামি জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশের সুযোগ পান তিনি বালককালেই। পরবর্তীকালে এই অর্জন তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। আরবি, উর্দু, ফারসি ভাষার জ্ঞান তাঁকে এক আসামান্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর অবিনাশী চেতনা মানুষের মনে সাহসের সৃষ্টি করে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় আচরণ ও শোষণের মনোভাব তাঁর স্বাধীন চেতনাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

নজরুল ছিলেন সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। দুঃখ কষ্টে দিনযাপনকারী নজরুল সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কূপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে অসাম্যের বিরুদ্ধে আজীবন লড়ে গেছেন। একদিকে শাসকের রক্তচক্ষু অন্যদিকে শোষকের প্ররোচনার বিরুদ্ধে সারাজীবন তিনি কলম চালিয়ে গেছেন। কূপমন্ডুক ভণ্ড প্রতারকরাও নজরুলকে একদণ্ড স্থির থাকতে দেয়নি। অনটন তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু তাকে দমাতে পারেনি। নজরুল তাই শুধু একজন কবি নন। হয়ে উঠেছেন এক চেতনার নাম।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল বর্ণিল। তিনি মক্তবে শিক্ষকতা যেমন করেছেন ঠিক তেমনি হোটেল কর্মচারী, রুটির দোকানের ম্যানেজার এবং ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে হাবিলদার পদে পর্যন্ত উন্নীত হন। এসব জায়গায়ই তাঁর কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। তিনি সর্বত্রই লেখালেখি গান বাজনা রচনা ও কাব্য চর্চা অব্যাহত রাখেন। তিনি বালককালে লেটোর দলে যুক্ত হন। যেসব কাজ তাকে বহুমাত্রিক গুণের বিকাশে সহায়তা করে। করাচি সেনানিবাসে চাকরিকালীন তিনি পাঞ্জাবি মৌলভির কাছে ফার্সি ভাষা শিক্ষার সুযোগ পান। সেখানে তিনি সৈনিক জীবনের পাশাপাশি গল্প কবিতা চর্চা করতে থাকেন।

১৯২০ সালে সৈনিক জীবন সমাপ্ত করে নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন এবং কাব্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। কলকাতায় সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি নজরুল সাংবাদিকতা শুরু করেন। সেখানে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক,কাজী আবদুল ওদুদ, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। অন্যদিকে অতুলপ্রসাদ সেন,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, হেমন্তকুমার রায় প্রমুখের সাথেও তাঁর পরিচয় ঘটে এসময়ে। তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা মুজাফফর আহমদের সাথে নজরুলের ছিল অসম্ভব রকম বন্ধুত্ব। নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার অনেকটাই মুজাফফর আহমদের প্রভাবে হলেও তিনি কখনোই কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হননি। তিনি নবযুগ,লাঙ্গল এবং সওগাতে সাংবাদিকতা করেছেন।

১৯২১ সালে নজরুল কুমিল্লায় আসেন এবং সেখানকার আলী আকবর খানের ভগ্নি নার্গিস আসার খানমের সাথে তাঁর আকদ হয়। কিন্তু রাতেই নজরুল সেখান থেকে চলে যান। নজরুল জীবনের এই অংশ নিয়ে নানান রকম বক্তব্য প্রচলিত আছে। অনেকের মতে তাঁকে ঘরজামাই থাকার শর্ত দিলে স্বাধীনচেতা নজরুল কাউকে না বলে চলে যান। নার্গিসের সাথে তাঁর বিয়ে ভেঙে যাবার বিষয়টি আজও এক রহস্য। পরে তিনি প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন।

নজরুল ছিলেন বিদ্রোহের কবি। তাঁর প্রতিটি কাব্য ছিল বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গে ভরপুর। তিনি লিখেছেন, ‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে তোদের কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ তাঁর অবিনাশী চেতনা ফুটে ওঠে- ‘বল বীর, বল উন্নত মমশির। শির নেহারি, আমারই নত শির, ওই শিখর হিমাদ্রির’ এই কবিতার মাঝে। তিনি লিখেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’ ‘আমি সেইদিন হবো শান্ত। যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবেনা। অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’

নজরুলের কাব্যচর্চার সময়কাল দীর্ঘ নয়। ১৯৪২ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর বাকশক্তি রহিত হয়ে যায়। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসায় তাঁর আরোগ্যলাভ অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কবি পরিবার কলকাতায় নিভৃতে জীবনযাপন করেন। ১৯৫৩ সালে নজরুল ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা নজরুলের চিকিৎসায় একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং দুজনকেই লন্ডন পাঠানো হয়। লন্ডনের খ্যাতনামা চিকিৎসকরা অভিমত দেন যে তিনি স্নায়ুবিক যে রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তা দূরারোগ্য। শুরুতেই এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব ছিল বলেও তারা মত দেন। ফলে তাকে আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

নজরুলের গান কবিতা গজল গল্প উপন্যাস অনুবাদ প্রতিটি কর্মই অনবদ্য। তাঁর সৃষ্টিশীল লেখনি যুগ যুগ ধরে বাংলাভাষী সাহিত্য অনুরাগী সঙ্গীতপিপাসুদের প্রেরণা জোগাবে। নজরুল সবচেয়ে বেশি লিখেছেন গান। সঙ্গীতেই তাঁর সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হয়েছে। তিনি সাড়ে চার হাজারের বেশি সঙ্গীত রচনা করেছেন। এরমধ্যে প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক, শ্যামাসঙ্গীত যেমন আছে ঠিক তেমনি আছে ইসলামি সঙ্গীত। তাঁর প্রতিটি ভক্তিমূলক ইসলামি গানই কালোত্তীর্ণ। মুসলমান সমাজের দীনতা নিয়ে তিনি যেমন লিখেছেন তেমনি লিখেছেন হামদ ও নাতে রাসুল সা.। তাঁর ইসলামি সঙ্গীতের মধ্যে নাতে রাসূলের সা. সংখ্যাই বেশি। তাঁর রচিত সবগুলো ইসলামি সঙ্গীতই এতটা ভাবাবেগপূর্ণ যে, তা বিশ্বাসীদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। হৃদয়ের তন্ত্রিতে শিহরণ জাগায়। নজরুল লিখেছেন, ‘খোদারই প্রেমের শরাব পিয়ে, বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে।’ আবার লিখেছেন, ‘খোদা এই গরিবের শোন শোন মোনাজাত, দিও তৃষ্ণা পেলে ঠান্ডা পানি ক্ষুধা পেলে লবন ভাত’ তাঁর লেখায় নবী প্রশস্তি ফুটে উঠেছে, ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে- তাই কিরে তোর কন্ঠেরই গান এতই মধুর লাগে’। চিরন্তন প্রেমের কাহিনি লিখেছেন এভাবে, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী- দেবো খোঁপায় তারার ফুল।’ আবার বলেছেন, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়া, সে কি মোর অপরাধ।’ ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া- মজনুগো আঁখি খোলো।’ দেশবাসীকে কখনও কবি সতর্ক করেছেন এই বলে, ‘দুর্গম গিরি কান্তর মরু দুস্তর পারাবার হে, লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’ মুসলমান সমাজকে উদ্দেশ্য করে নজরুল লিখেছেন, ‘জাগে না সে জোশ লয়ে আর মুসলমান।’

নজরুল ছিলেন সাম্প্রদায়িক ভেদমুক্ত একজন স্বাধীনচেতা কবি। পাশাপাশি নিজ ধর্মের প্রতি ভীষণ অনুরাগী একজন বিশ্বাসী মানুষ। তিনি সমাজের সব অসঙ্গতি প্রথা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন। তিনি প্রতিবাদী কবি হওয়ায় কারাগারে গেছেন। উপমহাদেশের বংলাভাষী মানুষের কাছে তাই তিনি সম্মান মর্যাদা ও গৌরবের আলাদা আসন লাভ করেছেন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় আনা হয়। বঙ্গবন্ধু তাকে সুচিকিৎসা ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁকে রাখা হয় ধানমন্ডির কবিভবনে। তৎকালীন পিজি হাসপাতালে কবির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অন্যান্য চিকিৎসা চলতে থাকে। ১৯৭৬ সালে কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এ বছরেরই ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অমর গানের কথা অনুযায়ী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সেখানেই আজও ঘুমিয়ে আছেন বাংলার গানের এই বুলবুলি।

নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির জাতীয় জাগরণের তূর্যবাদক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের রূপকার। ১২৩তম জন্মবার্ষিকী এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ক্ষণজন্মা এই কবিকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। বরেণ্য কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান স্বাতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জ্বল। মানবতা, সাম্য ও দ্রোহের কবি নজরুল। স্বল্পকালীন সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রেম, প্রকৃতি, বিদ্রোহ ও মানবতার অনবদ্য সব কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ও নাটক।

শেখ হাসিনা বলেন, কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী কবি নজরুল তাঁর লেখনির মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে উচ্চারিত হয়েছে পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের বাণী। অসামান্য ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কবি নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবোধের মূর্ত প্রতীক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: