সর্বশেষ আপডেট : ১৪ ঘন্টা আগে
রবিবার, ২৬ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম এত বেশি কেন?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম সবচেয়ে বেশি। বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণের কারণে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম সবচেয়ে বেশি।

ভা’রতের গরুর মাংস রপ্তানি নিষিদ্ধ করা, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া এবং গবাদি পশুর খাদ্যের উচ্চ’মূল্য দেশের গরুর মাংসের দাম বাড়ার অন্যতম কয়েকটি কারণ।

ঈদ-উল-ফিতরের ঠিক আগে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৬৫০-৭০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। যা এক মাস আগে মা’র্চ মাসেও ৬০০ টাকা ছিল।

কিন্তু এখন, রাজধানী ঢাকায় প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭০০-৭৫০ টাকায় এবং খাসির মাংস প্রতি কেজি ৮৫০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি করছে। এক্ষেত্রে তুলনা হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার অ’ত্যন্ত মূল্যবান অ্যাঙ্গাস গরুর মাংসের উদাহ’রণ দেওয়া যায়। এই মাংসের প্রতি কেজির দাম ৪.৯০ ডলার বা টাকা ৪০০ টাকা। যা বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

অন্যদিকে, ভা’রতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে মহিষের মাংসের দাম প্রতি কেজি ২০০-৩০০ রুপি যা টাকায় হিসাব করলে ২৩৫-২৭০ টাকা বলে কলকাতায় একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক জানান।

সেখানে খাসির মাংসের দাম প্রতি কেজি ৭০০ রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮২০ টাকার মতো।

বাংলাদেশের ওই কূটনীতিক বলেন, “কলকাতার মু’সলমানরা সাধারণত গরুর মাংস বেশি খায়, তাই সেখানে খাসির মাংসের তুলনায় গরুর মাংসের দাম কম।”

ইস’লামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি মোস্তফা জামিল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “পা’কিস্তানে, এক কেজি গরুর মাংসের দাম প্রায় ৮২৫ রুপি টাকা, যা বাংলাদেশে ৪০০ টাকার সমান এবং প্রতি কেজি খাসির মাংসের দাম ১ হাজার ৩৪০ রুপি যা ৬৫০ টাকার সমান।”

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মা’র্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্ম’দ শাহ এম’রান বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের গড় দাম ৫-৫.৫০ ডলার যেখানে বাংলাদেশে ৭-৭.৫০ ডলার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ভা’রত বাংলাদেশে গবাদি পশু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগে ঢাকার বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২৩০-২৫০ টাকা।

নিষেধাজ্ঞার আগে চো’রাচালান করা ভা’রতীয় গরু বাংলাদেশের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করত। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চো’রাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা প্রায় ২০ লাখ গরু বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল।

২০১৫-১৫ অর্থবছরে গরুর মাংসের বিশ্বব্যাপী গড় মূল্য ছিল ৪.৬৩ ডলার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করে হিসেব করলে প্রতি কেজি প্রায় ৩৬০ টাকা।

দাম বাড়ার কারণ কী’
ভা’রতের গবাদি পশু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে প্রা’ণিসম্পদ খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য সত্ত্বেও গত ৭-৮ বছরে বাংলাদেশে গরু ও খাসির মাংসের দাম বেড়েছে।

২০১৪ সালে ভা’রতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর, মোদি সরকার বাংলাদেশে গবাদি পশু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। যা বাংলাদেশের পশুসম্পদ খাতের ব্যাপক উন্নয়নে সহায়তা করেছিল বলে এক দুগ্ধ খামা’র মালিক বলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের কর্মচারী আবদুর রহমান বলেন, “গরু ও খাসির মাংসের দাম নিম্ন ও মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণত রমজান মাসের আগে ঢাকা সিটি করপোরেশন গরুর মাংস ও মাটনের দাম নির্ধারণ করে দিলেও এ বছর তা করেনি।”

বিডিএফএ-এর সাধারণ সম্পাদক শাহ এম’রানের মতে, কিছু সরকারি পদক্ষেপ এবং প্রণোদনা বাংলাদেশে মাংসের দাম ২০-২৫% কমাতে সাহায্য করতে পারে।

পা’কিস্তান ও ভা’রতের তুলনায় বাংলাদেশে গবাদি পশু পালনে খরচ বেশি। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ যেখানে গবাদি পশুর চারণভূমি দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। ভৌগোলিকভাবে, ভা’রত এবং পা’কিস্তান উভয়ই বাংলাদেশের চেয়ে যথাক্রমে ২৫ এবং সাত গুণ বড়। তাই এই দুই দেশেই তৃণভূমি ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়, তিনি বলেন।

কী’ করা প্রয়োজন
বাংলাদেশে পশুখাদ্যের দামও বেশি। তবে টিসিবি পণ্যটি আম’দানি করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করলে এই পণ্যের দাম কমবে বলে এম’রান জানান।

তিনি দুগ্ধ খামা’রগুলোতে পণ্যের স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে সয়াবিন রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রস্তাব করেন।

দুগ্ধ খামা’রের বিদ্যুতের দাম, বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালির মতো একটি বিশেষ হার অনুসারে থাকা উচিত। বিডিএফএ-এর সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নীতি গরু পালনকে উৎসাহিত করে, তাই বিদ্যুতের দাম বাণিজ্যিক নয়, স্বাভাবিক হওয়া উচিত।

প্রা’ণিসম্পদ খাতের জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত দুগ্ধ খামা’রিদের ৩-৪% সুদে ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা তৈরি করা এবং মাংসের উৎপাদন বাড়াতে দেশে ব্রাহ্মণ, সিমেন্টাল ও অ্যাঙ্গাসের মতো জাতের গরু আম’দানিতে উৎসাহিত করা।

একই কথা ছাগলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে, এম’রান বলেন।

উদাহ’রণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, আসাম, উত্তর ওড়িশা এবং বাংলাদেশে পাওয়া একটি পুরুষ প্রাপ্তবয়স্ক ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ওজন প্রায় ১৮-২০ কেজি এবং মাদি প্রাপ্তবয়স্ক ছাগলের ওজন ১৫-১৮ কেজি।

“সরকারের উচিত আফ্রিকান জাতের যেমন বোয়ার বা কালাহারি এবং ভা’রতীয় জাতের তোতাপুরি ও যমুনাপারির মতো ছাগল মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আম’দানির অনুমতি দেওয়া,” ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা বলেন।

ছোট ঐতিহ্যবাহী ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের তুলনায় একটি হাইব্রিড ছাগলের ওজন ৫০-৬০ কেজি হতে পারে, তিনি যোগ করেন।

ডিপার্টমেন্ট অব লাইভস্ট’ক সার্ভিসেস (ডিএলএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১.৩ মিলিয়ন টন মাংস উৎপাদন করেছিল, যা ২০২০ অর্থবছরে বেড়ে ৭.৫ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে।

গত ৭-৮ বছরে বেশ কিছু সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ গবাদি পশু পালনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে বাংলাদেশ গবাদি পশু পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে, ডিএলএসের একজন কর্মক’র্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন।

“আগে, কোরবানির মৌসুমে আমাদের ভা’রতীয় গরুর ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু স্থানীয়ভাবে পালন করা ষাঁড়ই ঈদ উদযাপনে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে পারে,” তিনি যোগ করেন।

এই ক্ষেত্রের সম্ভাবনা অনুধাবন করে এখন বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ এই ব্যবসায় প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, “সম্প্রতি ৫০ হাজার মানুষ এই ব্যবসায় যোগ দিয়েছে যারা সবাই শিক্ষিত এবং যাদের মধ্যে অনেকেই স্নাতক পাশ।”

“বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বেশি কারণ আমাদের বেশি দামে ফিড কিনতে হয়। সুতরাং, গরুর মাংসের দাম এখনও বেশি এবং ভোক্তাদেরই এই মূল্য দিতে হবে,” তিনি বলেন।

ভা’রতের বর্ধিত সতর্কতার আগে, গ্রামের কৃষকরা সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করে গবাদি পশু পালন করত। কিন্তু এখন অনেক শিক্ষিত যুবক ও গ্রামীণ কৃষকরাও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের গরু লালন-পালন শুরু করেছে।

কয়েক বছর আগে মোটাতা’জা ষাঁড়ের পরিসংখ্যান সংগ্রহ শুরু করা এক গবেষণায় প্রা’ণিসম্পদ অধিদপ্তর দেখেছিল, ২০১৭ সালে দেশে ৩.৩৪ মিলিয়ন ভালো জাতের ও স্বাস্থ্যের ষাঁড় ছিল। যা ২০২১ সালে ১৬% বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৮৬ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভা’রত থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তে আনা গবাদি পশুর সংখ্যা ২০১৪ অর্থবছরে ২.১ মিলিয়ন ছিল।

২০২০ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ যা আগের বছরের ৫ লাখ ৪২ হাজারের থেকে অর্ধেকেরও কম। মাত্র ৬ বছরের মধ্যে ৯০% কমে গেছে।

ডিএলএস-এর মতে, বাংলাদেশে ৬ লাখ ৯৮ হাজার গবাদি পশুর খামা’রি রয়েছে, যা ২০১৫ সালে ৩ লাখ ছিল।

শিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের মতে, মাংসের দেশীয় চাহিদার সিংহভাগই পোল্ট্রি মুরগি দিয়ে পূরণ করা হয়।

যদিও গবাদি পশু পালন বাড়ছে, তবুও দামে প্রভাব ফেলার জন্য এটি পর্যাপ্ত নয়।

ডিএলএস-এর এক কর্মক’র্তা বলেন, গরুর মাংস উৎপাদনের উন্নতির জন্য জাতগুলোর বিকাশ প্রয়োজন।

প্রা’ণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মক’র্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ১১.৮ মিলিয়নের তুলনায় এবারের ঈদের জন্য ৪.৫৪ মিলিয়ন গরু ও মহিষসহ ১২ মিলিয়ন কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি আরও জানান, গবাদিপশুর জন্য চড়া দাম গবাদি পশুর উচ্চ’মূল্যের আরেকটি কারণ। কেননা, কৃষকরা গত চার মাস ধরে ৩৭ কেজি খাদ্যের বস্তা প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা দিয়ে কিনছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: