সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
শনিবার, ২১ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

আমার স্মৃতিতে মুহিত স্যার

-: মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ :-

৮৮ বছরের বর্ণাঢ্য ও বর্ণিল জীবন অবিবাহিত করে পার্থিব জগতকে বিদায় জানালেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম কারিগর আবুল মাল আব্দুল মুহিত। নিজের মেধা, শ্রম, কর্ম, চিন্তা আর সৃষ্টিশীল সুকুমার বৃত্তির চর্চায় যিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন হাজারোজনের একজন হিসেবে। ভাষা সৈনিক, আমলা, কূটনৈতিক, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, পরিবেশবিদ, লেখক, গবেষক বহু অভিধায় তাঁকে অভিহিত করা যায়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার মতে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সাদা মনের বিশাল হৃদয়ের এক মহানুভব ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিশুসুলভ সরল হাসি যে কারো মন জয় করে নিতে পারতো।

প্রথম তাঁকে সামনাসামনি দেখি ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের হয়ে তিনি সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বীতা করেন। সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম নির্বাচন। আমি সে সময় সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। নগরীর উপশহরে অস্থায়ী নিবাস গড়েছি। সেখানেই এক নির্বাচনী সভায় তাঁকে প্রথম দেখি। গতাানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তিনি সাবলীলভাবে বর্ণনা করেন তাঁর নির্বাচনী দর্শন ‘আলোকিত সিলেট‘। প্রতিপক্ষকে দোষারোপ আর নিজ দলের গুণকীর্তনে ভরপুর জ্বালাময়ী বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত অনেকের কাছে স্যারের সে দিনকার বক্তব্য আকর্ষণীয় না হলেও তিনি যে নতুন কিছু করার চিন্তা নিয়ে রাজনীতির মাঠে নেমেছেন তা বুঝতে ভুল করিনি।

২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১০ সালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদান করলে তাঁর অধীনে কাজ করার সুযোগ হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল কাজ হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির দায়িত্ব পালন। মধ্যপ্রাচ্য শাখা -১ এর দায়িত্ব বর্তায় আমার উপর। উন্নয়নসহযোগী দেশ সৌদি আরর এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক কর্পোরেশন ফর দ্যা ডেভেলপমেন্ট অব দ্যা প্রাইভেট সেক্টর (আইসিডি)’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফাইন্যান্সকর্পোরেশন (আইটিএফসি)’ সম্পর্কিত সকল কার্যাদি মধ্যপ্রাচ্য শাখা -১ এর অন্তর্ভুক্ত। প্রায়ই এ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে মন্ত্রী বরাবর নথি উপস্থাপন করতে হতো। এরই ধারাবাহিকতায় একবার আইসিডি এর নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়। সংস্থার বোর্ড সভায় নীতিগত অনুমোদনপ্রাপ্ত তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামত চাওয়া হয়। তিনটি প্রস্তাবনা নিয়েই বিস্তারিত বর্ণনা করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা সমর্থন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রী বরাবর সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। দুই দিন পর অনুমোদিত সার-সংক্ষেপ শাখায় ফেরত আসে। স্যার শুধু প্রস্তাব অনুমোদন করেননি, চমৎকারভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করায় সার-সংক্ষেপের শেষাংশে স্বহস্তে ধন্যবাদজ্ঞাপক মন্তব্য লিখে দেন। সরকারি চাকুরির তিন মাসের মাথায় মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য প্রাপ্তি ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। বলতে দ্বিধা নেই স্যারের কাছ থেকে এমন অনুপ্রেরণামূলক মন্তব্য কেবল আনন্দদিতই করেনি আমার কর্মস্পৃহাকেই অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। অতঃপর, আরও কয়েকবার তাঁর এমন লিখিত অভিবাদন পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। বারো বছরের চাকুরিতে দুইজন মন্ত্রী ও আটজন সচিবের অধীনে কাজ করেছি, মুহিত স্যার ব্যতীত কেবল মোশাররাফ স্যারকে (সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মাদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা) নথিতে অনুপ্রেরণামূলক মন্তব্য লিখতে দেখেছি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সাড়ে তিন বছর চাকুরি শেষে নতুন কর্মস্থল অর্থ বিভাগে যোগদান করে স্যারের আরও কাছাকাছি কাজ করার এবং কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই। বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তা অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভবে প্রস্তত করে। রাজস্ব আহরণ, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং আমদানি ও রপ্তানি শুল্কসংক্রান্ত বিষয়াদি জাতীয়রাজস্ব বোর্ড এবং অন্যান্য বিষয়গুলো অর্থ বিভাগ প্রণয়ন করে। রাজস্ব বোর্ড সংক্রান্ত বক্তব্য একেবারে শেষ মুহুর্তে সন্নিবেশ করা হয় বলে বাজেট বক্তব্য বাজেট পেশের আগের রাতেই মুদ্রণ করা হয়ে থাকে। দেখা গেছে মধ্যরাতে বাজেট বক্তব্যেও খসড়া মুদ্রণের পর স্যার এর পুরোটা পড়ে তারপর চূড়ান্ত অনুমোদন দিতেন। এতে অনেক সময় গভীর রাত হয়ে গেলেও তাঁর মধ্যে কোন ক্লান্তি বোধ দেখিনি। পরদিন সকালে ঠিকই মন্ত্রিসভায় উপস্থিত হয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিগত অনুমোদন নিয়ে দুপুরে দীর্ঘ বাজেট বক্তব্য সংসদে পেশ করতেন। এত বয়সেও তাঁর এমন কর্ম তৎপরতা সত্যিই ঈর্ষণীয়।

আমাদের অনুবিভাগের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ’ প্রণয়ন করা। প্রতিটি প্রকাশনাই প্রায় সাড়ে তিনশত পৃষ্ঠার। বাজেট উপলক্ষ্যে অনেক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সাধারণত পুরো বই পড়ে মুদ্রণের অনুমোদন দিতেন। এমনও হয়েছে, ব্যস্ততার কারণে পুরো পান্ডুলিপি পড়তে না পাড়ায় বিদেশ যাবার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে বসে পুরোটা পড়ে অনুমোদন দিয়েছেন। এছাড়া, প্রতিটি নথিতেই তিনি কিছু না কিছু লিখতেন। কখনো সংশ্লিষ্টদের অভিবাদন জ্ঞাপন, কখনোবা কোন উপদেশ আবার কখনো কোন তথ্য সংযোজন বা বিয়োজনের নির্দেশনাসম্বলিত মন্তব্য লিখতেন।

‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ’তে অর্থমন্ত্রীর একটি মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রতিবারই আমাকে মুখবন্ধটি লিখতে হয়েছে। খসড়াতে শব্দগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া স্যার কখনো তেমন কোন পরিবর্তন করেননি। ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ’ -২০১৮ তে স্যারের সর্বশেষ মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। যথারীতি খসড়া উপস্থাপন করা হলে তিনি কয়েকটি শব্দ অদল-বদল করে দেন। সংশোধিত খসড়ায় তাঁর স্বাক্ষর নিতে গেলে পুরোটা পড়ে হঠাৎ তাঁর স্বভাব সুলভ সরল হাসি দিয়ে বলেন সবকিছুই ঠিক লিখেছ, কেবল নামের বানান ভুল। উল্লেখ্য, তিনি ‘Muhith’ লিখতেন যা ভুলবশত ‘Muhit’ লেখা হয়েছিল। এ ঘটনায় যত না লজ্জিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি বিমোহিত হয়েছি স্যারের আচরণে। এমন ভুলের কারণে রাগান্বিত হয়ে রূঢ় আচরণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক। অথচ স্যার এত সহজভাবে ভুলটা ধরিয়ে দিলেন যেন তা হতেই পারে।

কাজ করতে গিয়ে স্যারের প্রখর স্মৃতি শক্তির প্রমাণ পেয়েছি বহুবার। কয়েক দশক আগের ঘটনাাবলী দিন, তারিখ সময়সহ তিনি এত স্পষ্টভাবে বলতে পারতেন মনে হতো যেন কয়েক দিন আগের কোন ঘটনা।
স্যারের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ২০২০ সালে তাঁর জন্মদিনে। জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁকে নিয়ে প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলাম। লেখাটি পড়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। এরপর, মাঠ প্রশাসনে চলে আসায় তাঁর সাথে আর দেখা সাক্ষাত হয়নি।

শুরুতে বলেছি তাঁর প্রথম বক্তব্য শুনেই মনে হয়েছিল নতুন কিছু করার প্রত্যয় নিয়েই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। স্বেচ্ছায় নির্বাচন ও মন্ত্রীত্ব থেকে সরে গিয়ে প্রমাণ করেছিলেন তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। মন্ত্রী হিসেবে শেষ কার্য দিবসে অর্থ বিভাগের দেয়া সংবর্ধনায় তিনি বলেন, লেখালেখি আর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বই পড়ার মাধ্যমেই কাটাতে চান তাঁর অবসর জীবন। কিন্ত নানাবিধ রোগব্যাধি তাঁর অবসর জীবনকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে দেয়নি। পার্থিব জীবনের এই অপূর্ণতা যেন পরপারে পূর্ণ করে দিয়ে মহান আল্লাহ যেন তাঁকে চির শান্তিতে রাখেন এটিই একমাত্র কামনা।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রাম।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: