সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

১০ শতাংশই যাচ্ছে পরামর্শকদের পেটে

দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান অসামান্য, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা স্বাধীনতার পর থেকেই বিপদে-আপদে দেশের পাশে থেকেছেন। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তারা ঋণ এবং অনুদান দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

উন্নয়ন সহযোগীরা খুবই স্বল্পসুদে ১ থেকে ২ শতাংশে ঋণ দিচ্ছেন, যা বাংলাদেশকে খুবই উপকৃত করছে। তবে ঋণের শর্ত হিসাবে পরাম’র্শকের মাধ্যমেই চলে যাচ্ছে বড় একটি অংশ। আর উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজন না থাকলেও বিপুল অর্থ পরাম’র্শকের পেছনে বরাদ্দ দিতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। যে অঙ্ক মোট ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ঋণের ১০ ভাগের ১ ভাগ চলে যাচ্ছে তাদের পেটে। ঋণের শর্ত হিসাবে অ’প্রয়োজনীয় পরাম’র্শক ব্যয় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মক’র্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঋণের শর্ত হিসাবে না চাইলেও প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ পরাম’র্শক খাতে বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, যে প্রকল্প তাতে পরাম’র্শকের প্রয়োজনই নেই; কিন্তু শর্তের কারণে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। পরাম’র্শক না নিলে ঋণ পাওয়া যায় না, তাই বাধ্য হয়েই রাখতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঋণ হিসেবে ২ হাজার ২১৫ কোটি টাকা জাইকা আর সরকার দিচ্ছে ১ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে শুধু পরাম’র্শক বাবদ ব্যয় করা হচ্ছে ৩৭২ কোটি টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ শতাংশ। প্রকল্পটির আওতায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা’র অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নগর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নগর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা হবে। এ কাজে পরাম’র্শকের কী’ প্রয়োজন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মক’র্তা বলছেন, দেশীয় অর্থায়নের এ ধরনের প্রকল্পে তেমন একটা পরাম’র্শকের প্রয়োজন হয় না। তবে জাইকা ঋণের কারণে বাধ্য হয়েই পরাম’র্শক নিতে হচ্ছে। তারা বড় বড় প্রকল্পে আমাদের সহযোগিতা করে থাকে, সে বিবেচনায় এটা রাখা হয়েছে।

পরাম’র্শক খাতে এত ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের (সদস্য) সচিব মামুন আল রশীদ সময়ের আলোকে বলেন, বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পর্যন্ত এরকম হয়ে থাকে। জাইকা ঋণের প্রকল্পে তারা ডিজাইন থেকে শুরু করে সব বিষয়ে বরাবরই এটা রাখে। জাইকা আমাদের বরাবরই বড় বড় কাজে সহযোগিতা করে, তাই এটা নিয়ে বেশি চাপাচাপি করিনি।

এদিকে সম্প্রতি ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কে দুর্ঘ’টনা কমাতে ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্পটিতে ৩ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক আর বাকি ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা দেবে সরকার। প্রকল্পটিতে পরাম’র্শক খাতেই ৪৪০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি। তবে কমিশনের কর্মক’র্তারা বলছেন, সড়ক দুর্ঘ’টনা কমাতে প্রকল্পটির আওতায় যেসব কাজের কথা বলা হয়েছে, তাতে পরাম’র্শক খাতে এত টাকার প্রয়োজন নেই। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘ’টনা কমাতে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেজন্য পরাম’র্শকের প্রয়োজন হয় না। এই প্রকল্পটির বিষয়ে মামুন আল রশীদ বলেন, এই প্রকল্পে এত পরাম’র্শকের কোনো কারণ আম’রা দেখছি না। আম’রা প্রকল্পের পরাম’র্শক খাতের ব্যয় তিন ভাগের একভাগে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য বলেছি। তবে তিনি সার্বিকভাবে পরাম’র্শক ব্যয়ের বিষয়ে বলেন, তবে এসব প্রকল্পে দেশি পরাম’র্শকই বেশি। উন্নয়ন সহযোগীরা তাদের সহায়তার প্রকল্প মানসম্মত করার জন্যই পরাম’র্শক নিয়োগ করে, যাতে কাজ ভালো হয়। আম’রা অ’প্রয়োজনীয় পরাম’র্শকের ব্যাপারে কখনই সায় দেই না।

বৈদেশিক ঋণের অস্বাভাবিক পরাম’র্শক ব্যয়ের কিছু প্রকল্প হলো- এডিবির ঋণের মহাসড়কের একই ধরনের ‘সা’সেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২ এলেঙ্গা-হাটিকা’ম’রুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পে পরাম’র্শকের জন্য খরচ করা হচ্ছে ৫৩৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩ হাজার টাকা! বিশ্বব্যাংকের ঋণে ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্প-১’ (চট্টগ্রাম-ঢাকা-আশুগঞ্জ ও সংযু’ক্ত নৌপথ খনন এবং টার্মিনালসহ আনুষঙ্গিক স্থাপনাদি নির্মাণ) (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প পরাম’র্শক খাতে খরচ করা হচ্ছে ২৭৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের ঋণে ‘ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (উইকেয়ার) ফেজ-১ : রুরাল কানেক্টিভিটি, মা’র্কেট অ্যান্ড লজিস্টিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টে’ (আরসিএমএলআইআইপি) পরাম’র্শক খাতে খরচ হচ্ছে ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। আইডিএ ঋণে এক্সিলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিল ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন প্রকল্পটিতে পরাম’র্শকের জন্য ব্যয় হচ্ছে ১৪৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এআইআইবি ঋণে ময়মনসিংয়ের কেওয়াটখালী সেতু নির্মাণে পরাম’র্শকের জন্য ব্যয় হচ্ছে ৫৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সা’সটেইনেবল ওয়াটার সা’প্লাই প্রকল্পে পরাম’র্শকের জন্য ব্যয় হবে ২২৯ কোটি টাকা। ‘খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন’ প্রকল্পে পরাম’র্শক খাতে খরচ হচ্ছে ৯৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

এ ছাড়া ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’ (ইউআরপি) : (রাজউক অংশ) (প্রথম সংশোধন) প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্পের পরাম’র্শক খরচ ৩০৮ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইম্প্রুভমেন্ট’ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে এআইআইবি ও বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটিতে ১৭টি পরাম’র্শক খাতে ১৩৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা খরচ করা হচ্ছে। ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। প্রকল্পটিতে পরাম’র্শক খাতে খরচ ধ’রা হয়েছে ১১৯ কোটি ১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ‘মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে জাইকা। এই প্রকল্পে পরাম’র্শক খরচ ৭৯৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ভা’রতীয় ঋণে হচ্ছে ‘মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্প। এতে পরাম’র্শক খরচ ৮২ কোটি ৫৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। ‘প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন’ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে জাইকা। প্রকল্পটির পরাম’র্শক খরচ ৩৫ কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা।

বৈদেশিক ঋণে পরাম’র্শকে বেশি ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সময়ের আলোকে বলেন, আম’রা সবসময় বাড়তি পরাম’র্শকের বিপক্ষে। তারপরও বিদেশি ঋণের প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীদের কিছু শর্ত থাকে। এসব শর্তের কারণেই মূলত পরাম’র্শক ব্যয় বেশি হয়। অনেক সময় আমাদেরও কিছু করার থাকে না, তাদের শর্ত মেনে নিতে হয়।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ঢালাওভাবে পরাম’র্শক নিয়োগ না দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। গত বছরের ১৮ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, চোখবন্ধ করে পরাম’র্শক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

বিদেশি ঋণের প্রকল্পে পরাম’র্শকের অ’তিরিক্ত ব্যয় নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মূলত বড় প্রকল্পগুলোতেই বিদেশি সংস্থাগুলো বিনিয়োগ করে। অনেক টেকনিক্যাল বিষয় থাকে, যেখানে পরাম’র্শক লাগে। তবে পরাম’র্শক লাগবে কি না সেটা নির্ভর করে প্রকল্পের প্রয়োজনের ওপর। যেসব প্রকল্প আম’রা অহরহ করছি সেগুলোতেও কেন পরাম’র্শক লাগে সেটাই প্রশ্ন। প্রয়োজন না থাকলেও অনেক সময় পরাম’র্শক রাখা হয়। এটা কেন বা কার স্বার্থে রাখা হয় সেটাই প্রশ্ন। একজন বিদেশি পরাম’র্শক এসে কিছু মিটিং করে একটা প্রতিবেদন লিখে দিয়ে চলে যান। দেখা যাচ্ছে, এটা কেউ পড়েও দেখে না। আবার দেখা যাচ্ছে কিছু প্রকল্পে এমন কাউকে পরাম’র্শক রাখা হচ্ছে, যাদের সে স’ম্পর্কে বিন্দুমাত্র যোগ্যতাও নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: