সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের হিসাব নেই

ঢাকার অদূরে গাজীপুরের নামকরা একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন দেবব্রত শর্মা (ছদ্মনাম) নামে এক ভা’রতীয় নাগরিক। পোশাক কারখানার মানবসম্পদ মহাব্যবস্থাপক (এইচআর) হিসেবে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। করো’নার কারণে অনেক কর্মক’র্তার চাকরি চলে গেলেও তার চাকরি যায়নি। তার প্রাপ্ত বেতন-ভাতাও খুবই উচ্চ’মানের। অফিসিয়াল হিসাবে তার বেতন সাড়ে ৩ লাখ টাকারও বেশি। কাগজ-কলমের বাইরে আরও ভাতা পেয়ে থাকেন বলে জানান একই প্রতিষ্ঠানে কর্ম’রত একজন কর্মক’র্তা।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আরও চারজন ভা’রতীয় কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এরা সবাই খুবই উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন, পাশাপাশি পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের আরও নানা সুযোগ-সুবিধা। একই পর্যায়ে কাজ করে বাংলাদেশি কর্মক’র্তারা বিদেশিদের চেয়ে বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা অনেক কম পেয়ে থাকেন বলেও অ’ভিযোগ আছে।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার সাভা’র, আশুলিয়া জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন অসংখ্য কোম্পানিতে কাজ করছেন ভা’রতীয়, শ্রীলঙ্কান, পা’কিস্তানিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। এরা সবাই বাংলাদেশিদের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি বেতনে কাজ করছেন। এসব বেতন-ভাতার প্রায় সবটাই বিদেশে চলে যাচ্ছে বলে জানা যায়। বিদেশি কর্মীদের থাকা-খাওয়া খরচও কোম্পানি বহন করে। ছুটিতে নিজের দেশে গেলে সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে তারা। এতে করে, দেশের আয় চলে যাচ্ছে বিদেশে এবং পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে দেশি কর্মক’র্তাদের মধ্যে।

এদিকে আমাদের দেশে দক্ষ লোক না থাকার কারণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছে বিদেশিরা। যাদের মাধ্যমেও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে কর্ম’রত বিদেশিদের সঠিক সংখ্যা নেই সরকারের কাছেও। টিআইবির তথ্যমতে, আড়াই থেকে ৩ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে কর্ম’রত। এদের মধ্যে মাত্র ৯০ হাজার বৈধ। বাকিরা অ’বৈধ উপায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে এ সংখ্যা ৮৬ হাজার, যাদের বেশিরভাগ ভা’রতীয়। অ’পরদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসেবে এ সংখ্যা মাত্র ১০ হাজারের কিছু বেশি। তথ্যে এ বিশাল ফারাকের সঠিক কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও এ সংখ্যা ২ লাখের কম হবে না বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব আমলে নিলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যানের সঙ্গে তথ্য মিলে না। এনবিআরের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ১৪ হাজার বিদেশি কর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) হিসাবে প্রতিবছর প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে কর্ম’রত বিদেশিরা। ২০১৫ সালের সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) তথ্যমতে, বাংলাদেশ ছিল ভা’রতের প্রবাসী আয়ের তৃতীয় উৎস। টিআইবির তথ্যমতে, প্রতিবছর ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অ’বৈধভাবে দেশের বাইরে পাঠাচ্ছেন বিদেশিরা। বাংলাদেশে এনজিও, আইটি এবং গার্মেন্টসহ প্রায় ৩২টি ক্ষেত্রে চাকরি করছেন বিদেশিরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমা’র্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) তথ্যমতে, প্রতিবছর ২২ লাখের মতো জনশক্তি চাকুরির বাজারে ঢুকছে যাদের বেশিরভাগই বেকার রয়ে যাচ্ছে। বিআইডিএসের তথ্যমতে, দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ৩৩ শতাংশ বেকার থাকছে প্রতিবছর। করো’নার কারণে এ অবস্থা আরও ভ’য়াবহ বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার সমপরিমাণ টাকা ভা’রতে পাঠাচ্ছে এ দেশে কর্ম’রত ভা’রতীয়রা। সে হিসাবে ভা’রতের ২৫তম প্রবাসী আয়ের বৃহৎ উৎস বাংলাদেশ।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর এক কর্মক’র্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ইন্ডিয়ান এবং শ্রীলঙ্কানদের চাহিদা প্রচুর। বিভিন্ন কারণে এ চাহিদা তৈরি হয়েছে। সেটা হতে পারে পেশাগত দক্ষতা, কর্মক্ষমতা এবং অ’ভিজ্ঞতার কারণে। তারা আমাদের দেশীয় কর্মক’র্তাদের তুলনায় বেশি বেতন-ভাতা পায় এটা সত্যি। তারা কাজ ভালো করে বলেই তাদের বেতন বেশি দিয়ে আম’রা নিয়োগ করি।’

কতজন বিদেশি কাজ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক্সাক্টলি বলা মুশকিল তবে এ সংখ্যা গার্মেন্ট সেক্টরে কমবেশি ১৫-২০ হাজার হবে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শ্রীলঙ্কান এবং ইন্ডিয়ান। কিছু পা’কিস্তানি রয়েছে। এর পাশাপাশি চাইনিজ, তার্কিশ, জা’পানিজ রয়েছেন।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য মতে, বিভিন্ন এনজিওতে কর্ম’রত বিদেশি নাগরিকরা প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।

অন্য আরেকটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫ লাখ বিদেশি কর্ম’রত রয়েছেন। এ পরিমাণ জনশক্তি প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন দেশে। যার থেকে খুব অল্প পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে সরকার। অথচ এসব বিদেশির আয়ের ৩০ শতাংশ কর নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

গেল বছর টিআইবি তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি নাগরিকরা তাদের প্রকৃত বেতন-ভাতা গো’পন করছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করছে নিয়োগকারী সংস্থা। এ কারণে এনজিওতে কর্ম’রত বিদেশি নাগরিকদের সত্যিকারের বেতনের চিত্র উঠে আসে না। ফলে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

দেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের নজরদারিতে রাখার কাজ করে পু’লিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে অ’বৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৭৯০। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি হচ্ছে ভা’রতের নাগরিক। এরপরই রয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যু’ক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। এদের কেউ ভ্রমণ ভিসায়, কেউ ব্যবসায়িক ভিসায়, কেউবা ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসায় এ দেশে এসে অ’বৈধভাবে রয়ে গেছেন। ১০৮টি দেশের নাগরিক অ’বৈধভাবে অবস্থান করছেন। অনেকে চাকরি করছেন, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাবে এখন বৈধভাবে ১৪০টি দেশের ২০ হাজার ১৯৭ জন নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ৯৭৪ জন হলেন ভা’রতের নাগরিক। এরপরই চীনের ২ হাজার ৯৩ জন।

বিভিন্ন এনজিওর আবাসিক পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে এনজিও ব্যুরো বলেছে, ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন-ভাতা গ্রহণ, বেতন বিবরণী নিয়মিত এনজিও ব্যুরোতে জমা দেওয়া ও আয়কর পরিশোধ ছাড়া কোনো বিদেশি এনজিওকর্মীর নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইস’লাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কী’ পরিমাণ বিদেশি কাজ করছে, প্রপার ব্যাংকিং চ্যানেলে কত টাকা কে পাঠাচ্ছে তার হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আছে। সে সংখ্যা জানাতে সময় লাগবে। কেউ যদি প্রপারলি টাকা না পাঠায় তবে সে হিসাব তো আমাদের জানার বাইরে।’

অ’ভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রাম’রুর নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরারের মতে, এ দেশে বৈধভাবে যারা কাজ করছেন, তারাও সঠিক ভিসায় অবস্থান করছেন কিনা, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকবে। উদাহ’রণ হিসেবে তিনি বলেন, ভা’রতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠানো দেশগুলোর প্রথম পাঁচটির মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। সে অনুযায়ী বৈধ ও অ’বৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভা’রতীয়দের সংখ্যার সামঞ্জস্য আছে কি না এবং তারা যে কর দিচ্ছেন, সেটা ঠিক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম  বলেন, যারা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আসেন তারা কী’ পরিমাণ পারিশ্রমিক পান তা এনবিআরের জানা নেই। যারা দেশে কাজ করতে আসেন তাদের রিপোর্ট বিডা ভালো বলতে পারবে। বিডার রেজিস্ট্রেশনে যারা এ দেশে কাজ করতে আসেন তাদের আয়ের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বিভাগে থাকার কথা।

এদিকে দেশে কত বিদেশি কাজ করছেন তার হিসাব নেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাছেও। এ নিয়ে গতকাল জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্ট্রার (এনপিআর) বিষয়ক কর্মশালায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, অনেকে বলেন বাংলাদেশে কাজ করে বিদেশিরা বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন মা’র্কিন ডলার আয় করছেন। তবে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিদেশ থেকে কত লোক কাজ করতে এ দেশে আসছেন তারও কোনো হিসাব নেই। এটি বের করা উচিত।

তিনি বলেন, জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্ট্রার (এনপিআর) প্রণীত হচ্ছে। এটা করতে পারলে সব হিসাব সরকারের কাছে থাকবে। বাংলাদেশে কী’ পরিমাণ বিদেশি শ্রমিক কাজ করছেন, কত টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে সব হিসাব রাখা যাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: