সর্বশেষ আপডেট : ৩৭ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

ফের লকডাউন নয়, কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন জরুরি

করোনা মোকাবিলায় ফের লকডাউন নয়; বরং কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন জরুরি। এর আগে পরপর দুই দফা লকডাউনে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমেছে। আগের সেই ধাক্কা সামলে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক এখনো সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যাংকিং খাত থেকে দেওয়া প্রণোদনার ঋণের অর্থ পরিশোধের মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। এ অবস্থায় করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন মোকাবিলায় আর লকডাউন নয়, মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রেখে কঠোর বিধিনিষেধ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে সবার জন্য টিকা নিশ্চিতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক পরিধান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারসহ হাত ধোয়া, হাসপাতালের সক্ষমতা ও সেবার মান বাড়ানো এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে দেশের শীর্ষ স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেছেন। তাদের মতে, নতুন করে লকডাউন দেওয়া হলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। শত শত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। দেউলিয়া হবেন উদ্যোক্তারা। বেকারত্ব আরও বাড়বে। পঙ্গু হবে ব্যাংকিং খাত।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ২৪ মার্চ থেকে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কয়েক দফায় এই মেয়াদ বাড়িয়ে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানে লকডাউন শিথিল করা হয়। এরপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন নামে লকডাউনে ছিল পুরো দেশ। অর্থাৎ করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে ১১ মাস দেশ কার্যত অচল ছিল। এ অবস্থায় গত বছরের ডিসেম্বর থেকে দেশে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ে। নতুন এই ভ্যারিয়েন্টের ফলে ইউরোপে দু-একটি দেশে এবং ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশেও লকডাউনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি ও শিক্ষা খাত। দুই দফায় করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এসব প্রণোদনার বেশির ভাগই ঋণনির্ভর। এর মধ্যে কয়েকটি খাতে ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হলেও শিল্প খাতের সক্ষমতা বিবেচনায় সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম রোববার বলেন, লকডাউন কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ এর আগে এই পদ্ধতিতে খুব একটা লাভ হয়নি। মানুষ লকডাউন মানতে চায় না। কিন্তু অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিল্পের উৎপাদন কমে যায়। সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় এবং সরকারের রাজস্ব আদায় সবকিছুই কমে। তিনি বলেন, দুই দফা লকডাউনের কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের অবস্থা খারাপ হয়েছে। অর্থাৎ আগের লকডাউনের ধাক্কা এখনো সামলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে দু-একটি খাতে কিছুটা সম্ভাবনা দেখা গেছে। বিশেষ করে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। ফলে এই অবস্থায় লকডাউন দেওয়া হলে তা নেতিবাচক হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এর মূল্য দিতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় নতুন করে লকডাউন দেওয়া যৌক্তিক নয়। তার মতে, এবার করোনা বাড়লেও মৃত্যুর হার কম। এটি ইতিবাচক দিক। ফলে লকডাউন না দিয়ে সবাই যাতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে মাস্ক পরা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস মেনুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, করোনা বাড়ছে; কিন্তু লকডাউনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি অর্থনীতির সক্ষমতাও কমেছে। আর লকডাউন কোনোভাবেই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, জীবন-জীবিকার যে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে, লকডাউনের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়। বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধির দিকে জোর দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আরও কঠোর বিধি আরোপ এবং সেটি মানতে বাধ্য করতে হবে। তার মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সবাইকে টিকা দেওয়া হলে ক্ষতি কমে আসবে।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নতুন করে লকডাউন দেওয়াকে আমি সমর্থন করি না। কারণ অতীতে লকডাউনের ফল ভালো হয়নি। এটি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। স্বাস্থ্য খাতে তেমন উপকার হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে লকডাউন দিয়ে করোনা আটকানো যাবে না। এক্ষেত্রে মৃত্যুর হার কীভাবে কমিয়ে রাখা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। সেক্ষেত্রে সবাইকে টিকার আওতায় আনা, হাসপাতালের সক্ষমতা ও চিকিৎসার মান বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি পালন নিশ্চিত করতে হবে। আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে করোনা সর্দি-কাশির মতো। এর চিকিৎসাও এসেছে। বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে। ফলে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই আর লকডাউনে যেতে চাইবে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মতো দেশেও লকডাউন দিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করার কোনো মানে হয় না।

ইউজিসি অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, দেশে ওমিক্রনের প্রকোপ যে হারে বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে আগামী দিনে এটি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে, তা আরও কিছুদিন পর বোঝা যাবে। তবে করোনা রোধে লকডাউন, স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নাকি টিকাদান-এই তিনটি ব্যাপারে মানুষের মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। আমার মতে, এই মুহূর্তে জনগণ যেন নিজের ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি খেয়াল রাখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে। যেমন: বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলাফেরা করা। কেউ আক্রান্ত হলে ব্যক্তি ও পরিবারের উদ্যোগে আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে থাকা। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। যারা টিকা নেননি, তাদের দ্রুত টিকা দেওয়া। তবে দেশে লকডাউনের পরিস্থিতি এখনো হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে লকডাউন দেওয়া যেতে পারে।

অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে লকডাউনের দরকার হলেও ঢালাওভাবে না দিয়ে যেখানে সংক্রমণ বেশি হবে, সেখানে এলাকাভিত্তিক দিতে হবে। না হলে মানুষের জীবন-জীবিকা সমস্যা হবে। অর্থনৈতিক অবস্থা মন্থর হবে।

জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের কোভিড-১৯ পরামর্শ বিষয়ে গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা দলের (সিলেট বিভাগ) সদস্য ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এই মুহূর্তে লকডাউনের প্রয়োজন নেই। স্বাস্থ্যবিধির কাজগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলেই করোনা মোকাবিলা সম্ভব। তিনি বলেন, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের সঙ্গে ডেল্টার প্রকোপও রয়ে গেছে। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এটি প্রতিপালনে আনুষঙ্গিক যে কাজ রয়েছে সেগুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে না। ফলে সার্বিকভাবে করোনা মোকাবিলার আগে চিন্তা করতে হবে কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে ভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবে। সে হিসাবে সবচেয়ে জরুরি, সব জায়গায় শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা। সংক্রমণ ছড়ানো রোধে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা, যেমন: বাণিজ্য মেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন, বিয়ে-শাদি, ধর্মীয় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, পর্যটন এলাকায় জনসমাগম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, টিকাদানের গতি বাড়ানো। টিকা কর্মসূচিতে মানুষকে সম্পৃক্ত করা। এজন্য স্থানীয় নির্বাচিত সদস্য, জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব দপ্তরের সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে তা বাস্তবায়ন দরকার। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনা।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ। ফলে বিশ্বে করোনার যে কোনো ভ্যারিয়েন্ট যখন ধরা পড়ছে, বাংলাদেশে তার প্রকোপও বাড়ছে। তবে রোগটি প্রতিরোধে সবাইকে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এক্ষেত্রে সবাইকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি। তিনি বলেন, টিকা এবং স্বাস্থ্য একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পৃক্ত। ফলে সমন্বিতভাবে দুটিই বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে না ছড়ানো এবং প্রাণহানি না হলে তড়িঘড়ি করে লকডাউন যৌক্তিক নয়। এতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: