সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

পাঁচ প্রকল্পে গচ্চা ২৫ হাজার কোটি টাকা

চট্টগ্রামে জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে আলোর মুখ দেখছে না। মেয়াদ বাড়ছে প্রতিটি প্রকল্পে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়ও। সময়ক্ষেপণের মাশুল হিসেবে চট্টগ্রামে শুধু পাঁচটি প্রকল্পেই বাড়তি খরচ হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে যথাযথভাবে সমীক্ষা না করা, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া, চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া, তদারকির দুর্বলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে।

মূলত যে পাঁচ প্রকল্পে গতিহীনতার ভূত সওয়ার হয়েছে, তার মধ্যে একটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প। এই প্রকল্পের সময় বেড়েছে পাঁচ দফা, ব্যয় বেড়েছে ৯ গুণ। এ ছাড়া ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পে পাঁচবার সময় বাড়ার কারণে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। চসিকের খাল খনন প্রকল্পে এ পর্যন্ত সময় বেড়েছে তিনবার, ব্যয় বেড়েছে চার গুণ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে একবার সময় বাড়ানোর কারণেই ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর মূল প্রকল্পের সময় বেড়েছে দু’বার, যার ফলে ব্যয় বাড়বে দ্বিগুণ।

খাল খননের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বারবার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পে দেরি হচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হতো। এদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে। সময়ক্ষেপণের কারণে চার গুণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া চসিকের খাল খনন প্রকল্প গত শনিবার ফের উদ্বোধন করতে চট্টগ্রাম আসেন তিনি।

এদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বারবার সময় ও বরাদ্দ বাড়ানোর নেপথ্যে ‘দুর্নীতির দুষ্টচক্র’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফরকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রধান বাধা ঠিকাদাররা। দাতা সংস্থাগুলো তাদের পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাতে চায়। আবার সময়মতো বরাদ্দ দেয় না। এতে কাজের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। সময়ও বাড়াতে হয়। আর সময় বাড়ানোর মানে ব্যয়ও বেড়ে যাওয়া।

চট্টগ্রামের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ওয়াসা, পিডিবি, সড়ক বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ কেউ কাউকে পাত্তা দেয় না। সিটি করপোরেশনও এ ক্ষেত্রে অসহায়। আইনি কাঠামোয় এটির সমাধান না হলে প্রকল্পের সুফল প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওয়া যাবে না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন চট্টগ্রামের গণদাবির একটি। কিন্তু সেই প্রকল্পেও সময়ক্ষেপণ হচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে। সংশ্নিষ্টদের অদক্ষতা, অসততা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখছে না। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে গচ্চার পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।’

চসিকের নতুন খাল : চট্টগ্রাম নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে নতুন একটি খাল খননের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও চাহিদামতো বরাদ্দ না পাওয়ায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি খাল সাত বছরেও তারা খনন করতে পারেনি। নগরের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৪ সালের ২৪ জুন। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এরপর তিন দফা সংশোধন করতে হয় এ প্রকল্প। সময়ও বাড়াতে হয় তিন দফা। প্রকল্পের ব্যয় এখন দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

বাস্তবায়নের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী বছরের জুন মাস। এই প্রকল্পের কাজই গত শনিবার নতুন করে উদ্বোধন করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। কিন্তু নতুন করে নির্ধারিত সময়েও প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান সংশ্নিষ্টরা। কারণ চাহিদামতো বরাদ্দ মিলছে না। কাটেনি ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতাও। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদামতো বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা কেটে যাবে। তখন প্রকল্পেও গতি আসবে।’

ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প :দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় পানি সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা ‘ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প’ হাতে নেয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছর সেপ্টেম্বরে। পরে এটির মেয়াদ দুই বছর ৯ মাস বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে ৯২ দশমিক ৫২ শতাংশ। শুরুতে এক হাজার ৩৬ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও এখন এটিতে বাড়তি খরচ হবে আরও ৯৫৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের

জানুয়ারিতে একনেকে এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরু করতেই কেটে যায় সাড়ে তিন বছর। ২০১৯ সালের শেষদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পায় কোরিয়ার তাইইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। তারা সরাসরি কাজ না করে প্রকল্প এলাকায় নিয়োগ দেয় একাধিক উপ-ঠিকাদার। এসব উপ-ঠিকাদারের দক্ষতা না থাকায় বারবার বাধাগ্রস্ত হয় প্রকল্পটি। এএনএফএল কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠানকে উপ-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয়রা বিক্ষোভও করেন। এসব কারণে এ পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় ঠিকাদারদের সহায়তা নিয়ে প্রকল্প কাজ শেষ করছে কোরীয় প্রতিষ্ঠান। আগে কিছু ঝামেলা হলেও এখন কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।’ তিনি জানান, এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ ক্ষমতা দিনে ছয় কোটি লিটার বাড়বে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প : সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ কার্যক্রম। এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতেই সময় বাড়াতে হয়েছে পাঁচ দফা। তাই ৯ গুণ বাড়িয়ে বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় ঠেকেছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদিত হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন হবে। পরে আরও দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প এলাকায় মোট ১৫ কিলোমিটার বন থাকায় সেখানে কাজের অগ্রগতি কম। বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু স্থাপনা ও খুঁটি রেলপথের আওতায় পড়ায় সেখানেও কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনা মহামারির কারণেও কাজের গতি কমেছে। তারপরও ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজারে যাতে ট্রেন যেতে পারে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, কক্সবাজার সদরের পানিরছড়া এলাকায় সাত কিলোমিটার রেলপথ এখন দৃশ্যমান। ওই এলাকায় রেল ট্র্যাক নির্মাণের পাশাপাশি সিগন্যালিং কেবল (তার) টানার কাজ শেষ পর্যায়ে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনে মোট ৯টি দৃষ্টিনন্দন স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ডুলাহাজারা রেলস্টেশনের কাজ শেষ পর্যায়ে। দোহাজারী, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ঈদগাঁও এবং কক্সবাজারে রেলস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে :চট্টগ্রাম নগরী যানজটমুক্ত করতে ২০১৭ সালের ১১ জুলাই একনেক সভায় তিন হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার এই প্রকল্প অনুমোদন পায়। সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু প্রকল্পের পরিচালক এবং সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রকল্পের কাজ প্রায় ৬০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ৩৭৯টি পিলারের মধ্যে ২৫০টির নির্মাণকাজ শেষ। আশা করছি ২০২৩ সালের জুন নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির কারণে ড্রইং ও ডিজাইনে বারবার পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও অনেক বাড়বে বলে জানান। ত

বে কত টাকা ব্যয় বাড়বে তা তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৪ ফুট প্রশস্ত এই এক্সপ্রেসওয়ের পিলার পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। সিডিএর এই প্রকল্প যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-র?্যাঙ্কিন।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প : ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্র্র্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’- শিরোনামে মূল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তারা। ২০১৭ সালে নেওয়া প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু দুই দফা বাড়িয়ে এ প্রকল্প শেষের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। যদিও এখনও প্রকল্পের অর্ধেক কাজ বাকি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, চাহিদামতো বরাদ্দ না মেলায় উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না খাল-নালা পরিস্কারের কাজও। পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রকল্প এখন ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকায় উন্নীত হচ্ছে। শুধু ভূমি অধিগ্রহণেই খরচ বেড়ে যাচ্ছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যথাযথভাবে সমীক্ষা না করায় অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। এগুলো উচ্ছেদে বাড়তি টাকার প্রয়োজন হবে। সেটা পরিমাণে দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। সৌজন্যে: সমকাল

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: