সর্বশেষ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

ইউরোপ যাত্রায় মরণফাঁদ

ইতালির দক্ষিণ উপকূলীয় শহর ল্যামপেদুসার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত শনিবার বাংলাদেশিসহ ৫৩৯ জন অ’ভিবাসন প্রত্যাশীকে জে’লে নৌকা থেকে উ’দ্ধার করেছে। দলটি অ’বৈধপথে লিবিয়া থেকে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করছিল।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ওই দলের মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছে, তবে সংখ্যায় কম। সবার পরিচয় নিশ্চিত করতে আরও সময় লাগবে। মিলানের একটি কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, একই সময় সড়কপথে উত্তর-পূর্ব ইতালির ট্রিয়েস্ট সীমান্তে মেরিটাইম বর্ডার পু’লিশ ৩৫ জনকে খুঁজে পেয়েছে। এই ৩৫ জনের মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশ, আ’ফগা’নিস্তান এবং পা’কিস্তানের নাগরিক। জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে এভাবে ইউরোপ যাত্রাকে ম’রণফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ল্যামপেদুসায় ৫৩৯ জন উ’দ্ধার : আন্তর্জাতিক মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স সংস্থার পক্ষে ইতালির ল্যামপেদুসা দ্বীপে কর্ম’রত সেবিকা আলিদা সেরাচিয়ারি জানান, ৫৩৯ জন অ’ভিবাসীর মধ্যে তিনজন নারীসহ ২৯ জন অ’ভিভাবকহীন অ’প্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। লিবিয়া থেকে দলটি যাত্রা শুরুর পর কতদিন সাগরে ভেসেছিল তা জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দলটি একাধিক মাস লিবিয়ার উপকূলে কাটিয়েছে। ৫৩৯ জনের দলে বেশিরভাগই উত্তর আফ্রিকার দেশের নাগরিক। এর বাইরে সিরিয়া, আ’ফগা’নিস্তান, পা’কিস্তানের নাগরিক রয়েছে। কিছুসংখ্যক বাংলাদেশিও রয়েছে। ল্যামপেদুসার আশ্রয়কেন্দ্রটি ২৫০ জন থাকার উপযোগী। কিন্তু ধারণক্ষমতার চেয়ে অ’ভিবাসন প্রত্যাশী দ্বিগুণ হওয়ায় সেখানকার লোকজন বেকায়দায় পড়েছে।

প্রবাসী একজন বাংলাদেশি, যিনি ইতালি সরকারকে বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করতে সহায়তা করে থাকেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, এই দলটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার আগে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। যেহেতু ল্যামপেসুদার আশ্রয়কেন্দ্রে কমপক্ষে পাঁচগুণ এখন অ’ভিবাসন প্রত্যাশী, তাই এদের পরিচয় শনাক্তে সময় লাগবে। এর আগে, এ পথে গত মে মাসে এক দিনে হাজারখানেক অ’ভিবাসী প্রত্যাশী এসেছিল।

ইতালির ট্রিয়েস্ট সীমান্তে ৩৫ জন : মিলানের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, একই সময় সড়কপথে উত্তর-পূর্ব ইতালির ট্রিয়েস্ট (ইতালি-স্লো’ভেনিয়া সীমান্ত) সীমান্তে মেরিটাইম বর্ডার পু’লিশ ৩৫ জনকে খুঁজে পেয়েছে। এই ৩৫ জনের মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি, আ’ফগা’নিস্তান এবং পা’কিস্তানের নাগরিক বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তাদের সবার পরিচয় নিশ্চিতে ট্রিয়েস্ট শহরের মেয়র ওই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মিলানে নিযু’ক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ইকবাল আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, অ’বৈধ উপায়ে সাগর এবং সগকপথে বাংলাদেশিরা যে ইতালিতে আসছে সে বিষয়ে আম’রা অবগত। ইতালির পু’লিশ এ বিষয়ে আমাদের জানিয়েছে। তিনি জানান, ইতালির পু’লিশ জানিয়েছে, সড়কপথে উত্তর-পূর্ব ইতালির ট্রিয়েস্টে গত জুন মাসে ২৩০ জন বাংলাদেশি প্রবেশ করেছে।

কী’ আছে তাদের ভাগ্যে : রোম এবং মিলানের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, অ’ভিবাসন প্রত্যাশীদের এমন ঘটনা ইতালিতে নিয়মিত। সেখানকার সীমান্ত সবসময়ই খোলা থাকে। সেখানকার আইনে অ’প’রাধ না করলে কাউকেই শা’স্তি দেওয়া হয় না। সীমান্তে স’ন্দেহ না হলে পু’লিশ কাউকে আ’ট’কায় না। আর মানবপাচারকারীরা এ সুযোগটিই নিয়ে থাকে। ইতালির ল্যামপেদুসা এবং ট্রিয়েস্টে যারা উ’দ্ধার হয়েছে তাদের প্রথমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এর মধ্যে কোনো অ’প’রাধী থাকলে তাদের কারাগারে পাঠানো হবে। বাকিদের একটি কাগজ দিয়ে দুসপ্তাহের মধ্যে ইতালি ছেড়ে যাওয়ার জন্য বলা হবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এরপর সবাই যে যার মতো করে লুকিয়ে থাকবে, কাজের সন্ধান করবে এবং নিয়মিত হওয়ার সুযোগ খুঁজবে। কেউ অ’প’রাধ না করণে পু’লিশি হয়’রানির তেমন সুযোগ নেই। এ কারণেই অ’ভিবাসন প্রত্যাশীরা জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে ইতালিতে আসে। প্রতিদিন হাজার হাজার এমন অ’ভিবাসন প্রত্যাশী আসে। এদের মধ্যে যাদের ভাগ্য খা’রাপ তারাই ধ’রা পড়ে।

২০ জনের শরীরে আ’ঘাতে চিহ্ন : আন্তর্জাতিক মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স সংস্থার পক্ষে ইতালির ল্যামপেদুসা দ্বীপে কর্ম’রত সেবিকা আলিদা সেরাচিয়ারি জানান, এখন পর্যন্ত ২০ জনের শরীরে আ’ঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাদের গায়ে আ’গুনে পোড়ার দাগ ও গু’লির চিহ্ন রয়েছে। বেশিরভাগই প্রচণ্ড ক্লান্ত এবং তাদের দেহে পানির অভাব দেখা গেছে।

শীর্ষে বাংলাদেশি তরুণরা : বেসরকারি উন্নয়নধ’র্মী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়া লোকজনের মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশের নাগরিক। এর আগে, ২১ জুন লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে ১৭ বাংলাদেশি প্রা’ণ হারায়। তিউনিসিয়ার কোস্ট গার্ড ভূমধ্যসাগর থেকে বাংলাদেশিসহ ৩৮০ জনকে জীবিত উ’দ্ধার করে। এর আগে গত ২৪ জুন ২৬৭ জনকে উ’দ্ধার করে তিউনিসিয়ার কোস্ট গার্ড, যার মধ্যে ২৬৪ জনই বাংলাদেশি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের তথ্য উল্লেখ করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশে^র যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছে তার মধ্যে সাড়ে ১৪ শতাংশই বাংলাদেশি। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলছে, ২০০৯ সাল থেকে অ’বৈধ উপায়ে ৬০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে।

ব্রাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা সবচেয়ে বেশি ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ৩১ থেকে ৩৫ বছরের মানুষ সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক বছরে ইউরোপ ও লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ২ হাজার ২৮৪ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঢাকা, নোয়াখালী, কি’শোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাÑ এসব জে’লা থেকে সবচেয়ে বেশি লোক এভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। একেকজন এভাবে ইউরোপে যেতে ৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছে।

১৮ রুটে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা : বাংলাদেশ থেকে মোট ১৮টি রুটে মানুষ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। ফ্রন্টেক্স বলছে, পৃথিবীর যে দেশ থেকেই অ’ভিবাসন প্রত্যাশীরা আসুক, ইউরোপে প্রবেশ করার মোট নয়টি পথ আছে। বাংলাদেশিরা বেশি ব্যবহার করেছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যেটি সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। এ পথে ৩৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছে। গত কয়েক বছরে সড়কপথে বলকান রুট দিয়েও প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বাংলাদেশি প্রবেশ করেছে। এভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে বসনিয়ার জঙ্গলে এখনও শতাধিক বাংলাদেশি আ’ট’ক আছে।

ব্র্যাক জানিয়েছে, বাংলাদেশিদের দুবাই এবং ওমান থেকে নিয়ে আসা হয় ওমানের মাসকট বন্দরে। মাসকট বন্দর থেকে স্পিডবোটে ওমান উপসাগর অ’তিক্রম করে নিয়ে যায় ই’রানের বন্দর আব্বাসে। তারপর ই’রানের বিভিন্ন শহর ও জঙ্গলে আ’ট’কে রাখে। সেখান থেকে ই’রাক ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা চলে।

একজন ভুক্তভোগীর কথা : ব্র্যাকের সূত্রে কিছু ভুক্তভোগীর বর্ণনায় পাওয়া গেছে, যারা এসব পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে সব হারিয়েছেন তাদেরই একজন ময়মনসিংহের মনজুরুল ইস’লাম। তিনি জানান, তাকে কাজের কথা বলে প্রথমে আবুধাবি নেওয়া হয়। সেখান থেকে শারজাহ হয়ে প্রথমে ওমানে যান। ওমানে একটি ঘরে তিনদিন থাকার পর সেখান থেকে সাগর পাড়ে আরেকটি ঘরে পাঁচ দিন থাকতে হয়। এরপর গ্রিস যাওয়ার জন্য এক দিন রাতে ২০-২২ জনকে একটি নৌকায় উঠিয়ে ই’রানের বন্দর আব্বাসে নেওয়া হয়। সেখানে মুক্তিপণ হিসেবে তার পরিবার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপর ই’রান থেকে তুর্কি, সেখান থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যান। এরপর মেসেডোনিয়া, সার্বিয়া ক্রোয়েশিয়া, অস্ট্রিয়া হয়ে জার্মানি যান। সেখানে পু’লিশ তাকে আ’ট’ক করে দেশে পাঠিয়ে দেয়।

কী’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা : ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশ সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার দিক থেকে প্রথম, যা আমাদের জন্য লজ্জার। বাংলাদেশের সঙ্গে এই তালিকায় সিরিয়া, আ’ফগা’নিস্তান, সুদান কিংবা ইরিত্রিয়া আছে; কিন্তু এই দেশগুলো যু’দ্ধ বা দারিদ্র্যপীড়িত। বাংলাদেশের অবস্থা কিন্তু তাদের মতো নয়, বাংলাদেশ এখন অনেক উন্নত। তিনি আরও বলেন, গত এক দশকে ৬২ হাজার লোক অ’বৈধ উপায়ে ইউরোপে গেছে। মানবপাচার প্রতিরোধে আমাদের মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ সংক্রান্ত মা’মলাগুলোরও বিচার হতে হবে।

অ’ভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, এসব ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তাই যারাই বিদেশ যেতে চায় তাদের বিদেশ যাওয়ার আগে সঠিক পড়াশোনা বা নিজেকে প্রস্তুত করেছে কি না তা দেখা উচিত। এ বিষয়ে ইমিগ্রেশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং অ’ভিবাসন বিশেষজ্ঞ মো. শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশ অ’বৈধ অ’ভিবাসনে বিশ্বা’স করে না। বাংলাদেশের এখন যে আর্থ-সামাজিক অবস্থা তাতে অ’বৈধ উপায়ে এভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা নয়। তারপরও লোকজন কেন যাচ্ছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান করতে হবে, প্রয়োজনীয় গবেষণা করে তা বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি সরকারি যে সংস্থাগুলো আছে যারা দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে গেট’কিপার হিসেবে কাজ করে, তাদেরকে কঠোর হতে হবে। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গেট’কিপারদের শক্তিশালী করা গেলে এভাবে অ’ভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 61
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    61
    Shares
নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: