সর্বশেষ আপডেট : ৩৭ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

ভিক্ষা দাও আমার মেয়ের হাড্ডি

‘আমা’র মে’য়ের হাড্ডি ভিক্ষা দাও। হাড্ডি লইয়া দেশে যামুগা। আমা’র মে’য়ে আর বলবে না আব্বা আমা’রে দশটা টাকা দাও। দোজখের আ’গুন উঠে গেছে দেশে। আমা’র কলিজার টুকরা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। আমা’র দুনিয়াতে কেউই রইলো না। আমা’র বুকে ব্যথা লাগে স্যার। আমা’র মে’য়ের হাড়গুলো ভিক্ষা দেন।

দেশে নিয়া হাড়গুলো বুকে জড়িয়ে রাখমু।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লের সামনে এভাবেই মে’য়ের ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন বেল্লাল হোসেন। তার মে’য়ে মিতু আক্তার (১৪) কাজ করতো হাসেম ফুডের কারখানায়। অ’গ্নিকা’ণ্ডের পর থেকে আর মিতুর খোঁজ মিলছে না। স্বজনদের ধারণা ঢাকা মেডিকেলে যাদের লা’শ আনা হয়েছে তাদের মধ্যে মিতুর লা’শও আছে। তবে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোকেতো আর চেহারা দেখে চেনার উপায় নেই। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। শুধু বেল্লাল হোসেনই নন, ঢাকা মেডিকেলের ম’র্গ এলাকায় ভিড় করেন নি’খোঁজ আরও অনেকের স্বজনেরা। তাদের আহাজারিতে ভা’রি হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ।

বেল্লাল হোসেন বলেন, মিতু সকাল সাতটায় আমা’র কাছ থেকে দশটা টাকা নিয়ে যায়। আর আমা’র মে’য়ে দশ টাকা চাইবে না। মে’য়ের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, আমা’র মে’য়ের কি সুন্দর ছবি। কিন্তু মে’য়ে পুড়ে কয়লা হয়ে কই আছে। সে নি’খোঁজ। তার কঙ্কাল পড়ে আছে কই? বেল্লাল হোসেন বলেন, আমা’র মে’য়ে ক্লাস এইটে ওঠার পরে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল বন্ধ থাকায় সে চাকরিতে যায়। আঠারো বছর ধরে ঢাকায় থাকি। আমা’র মে’য়ে বলে, আব্বা আমা’র কোনো ভাই নেই। আম’রা দুই বোনে যদি কিছু কা’মাই করে টাকা দিতে পারি তোমা’র কিছুটা অভাব কমবে। তোমা’র তো ইনকা’ম করতে ক’ষ্ট হয়। আম’রা দুই বোন চাকরি করি। স্কুল খুললে আবার ছেড়ে দিব। দুই বোনে চাকরি করলে তোমা’র অভাব থাকবে না। টাকা গুছিয়ে আম’রা একেবারে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবো।

তিনি আরও বলেন, মে’য়ে আমা’র তিনমাস ধরে কাজে লাগছে। দুই মে’য়ে একসঙ্গে সেজানে কাজ করতো। মে’য়েরা ভেবেছিল কিছু টাকা পেলে কেনাকা’টা করে বাড়িতে চলে যাবো। বেল্লাল জানান, তার তিন মে’য়ের মধ্যে মিতু ছিল দ্বিতীয়। ছোট মে’য়ের বয়স আড়াই বছর। বড় মে’য়ে খাদিজা আক্তারও সেজানে চাকরি করতেন। নাইট ডিউটি থাকায় বাসায় ছিলেন। মাসে পাঁচ হাজার তিনশত টাকা বেতন ছিল মিতুর।

‘মাইয়া কই গেল আমা’র। মাইয়ার জীবন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমা’র মে’য়েটার শরীরে আ’গুন লাগছে। কী’ না জানি করছে মাইয়া আমা’র। ও মা তুই কই? বুকটার মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে।’ মে’য়ে তাসলিমা আক্তারের (২০) লা’শ শনাক্তের জন্য নমুনা দিতে এসেছিলেন মা পারভীন বেগম। সঙ্গে ছিল তার স্বামী বাচ্চু মিয়া। মে’য়ের সঙ্গে মা চাকরি করতেন ওই ভবনের ২য় তলায়। চারদিকে আ’গুনের শিখা দেখে জীবনের ভ’য় না করে নিচে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে যান তিনি। নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে ম’র্গের সামনে অঝোরে কাঁদছেন তিনি।

পারভীন বেগম বলেন, দুইতলায় বসে প্রথমে দেখি আ’গুন। তখন বিকাল চারটা বাজে। সবাই ছোটাছুটি করছে। আ’গুন লাগছে, আ’গুন লাগছে বলে চি’ৎকার করছে। পরে চারতলায় নসিলা সেকশনে মে’য়ের কাছে যাইতে চাইছি। আ’গুনের জন্য আর পারিনি। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামা’র চেষ্টা করি। নামতে পারি না। তারপর দেখি অনেকে বাঁ’চার জন্য লাফিয়ে পড়ছে। আমিও রাস্তায় জুসের গাড়িতে লাফিয়ে পড়ি। দশ মিনিটের মধ্যে আমা’র কি হয়েছে কিছুই বুঝিনি। দশ মিনিট পরে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি আ’গুন জ্বলছে দাউদাউ করে। তখন আমি আমা’র মে’য়েকে খুঁজছি। দেখি কোথাও নেই। মে’য়ে তার স্যার, ম্যাডাম’দের সঙ্গে ছিল চারতলায়। তারাও নামে না। আমা’র মে’য়েও নামে না। লাফিয়ে পড়ার আগে আমা’র জীবনের ভ’য় ছিল না। ছিল আ’গুনের ভ’য়। আমা’র সঙ্গে মিনা নামে একজন লাফিয়ে পড়ে। সে গাড়িতে না পড়ে রাস্তায় পড়ার কারণে সঙ্গে সঙ্গে মা’রা যায়। সেও আমা’র সঙ্গে দুই তলায় ললিপপ সেকশনে কাজ করতো।

তিনি আরও বলেন, আমি আর আমা’র মে’য়ে তাসলিমা আক্তার একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার কাজে গিয়েছি। এটা বুঝি আমা’র শেষ খাওয়া ছিল। বুকে ও মা’থায় আ’ঘাত পেয়েছি। মনে হচ্ছে বুকটার মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। একদিকে মে’য়ের শোক, অন্যদিকে শরীরের ব্যথা। আমা’র মে’য়ের তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই।

নি’হত তাসলিমা’র বাবা বাচ্চু মিয়া জানান, আ’গুন লাগার পরে তার স্ত্রী’ লাফিয়ে পড়ার পর একজনের মোবাইল দিয়ে ফোন দেয়। তারপর ছুটে আসি। মানুষের হাত-পা ধরে বাবা, মা ডেকে আমা’র মে’য়েটাকে খুঁজে দিতে বলেছি। কেউ ডাকে সাড়া দেয়নি। আমা’র মে’য়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। আর ফিরে আসবে না। ঘটনার দিন মে’য়েটা অফিসে যাওয়ার আগে আমা’র কাছ থেকে বিশ টাকা রিকশা ভাড়া নিয়ে বলে বাবা অফিসে যাচ্ছি।

তিনি আরও জানান, তিন বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালান। গ্রামের বাড়ি কি’শোরঞ্জ। রামগঞ্জের গো’লাকান্দাইলে স্ত্রী’ ও পাঁচ ছে’লে-মে’য়ে নিয়ে থাকেন তিনি। সংসারে অভাব থাকায় তার স্ত্রী’ ও তিন ছে’লে-মে’য়ে চাকরি করতেন। মে’য়ে তাসলিমা পাঁচহাজার টাকা বেতনে চাকরি করতো। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল বড়। বাকি দুই ছে’লে-মে’য়ের ওইদিন রাতে ডিউটি থাকায় তারা বাসায় ছিল।
আমা’র আম্মুকে এনে দাও: সোমা আক্তার বাস্তবতা বুঝে ওঠার আগেই হারাতে হয়েছে তার মা অমৃ’তা বেগমকে। মায়ের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে মেডিকেলের ম’র্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাত্র সাত বছরের শি’শুটি নির্বাক চোখে মা’কে খুঁজছে। কিন্তু কোথাও নেই মায়ের দেখা। কাঁদতে কাঁদতে সোমা আক্তার বলছে, আ’গুনের কথা শুনে মা’কে খুঁজতে আসছি। সারাদিন শুধু মায়ের জন্য কা’ন্না করতেছি। আম্মুকে দেখতে আসছি। কিন্তু আম্মুকে তো পাই না। আমা’র আম্মুকে এনে দাও।

নি’হত অমৃ’তা বেগমের ছোট বোন রোজিনা জানান, সকালে দুই বোন একসঙ্গে ডিউটিতে আসি। দুই বোন দুই সেকশনে চাকরি করতাম। বিকাল চারটায় আ’গুন লাগে। তখন আমাদের স্যাররা বলে ওঠেন আ’গুন লাগছে। পরে জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি অনেক আ’গুন। তারপর আম’রা মেশিন বন্ধ করে নিচে নেমে গেছি। নিচে নেমে দেখি শত শত শ্রমিক বাইরে বেরিয়েছে। কিন্তু আমা’র বোন নাই কোথাও। তারপর আবার গেটের দিকে যাই। দেখি সেখানেও আমা’র বোন নেই। সবার কাছে অনেক চিল্লাপাল্লা করি আমা’র বোনকে বাঁ’চানোর জন্য। বলি শ্রমিকগুলোকে বাঁ’চান। পরে দেখি গেটে তালা দিয়ে দিছে। চারতলা বন্ধ। পাঁচতলার মানুষ ছাদে উঠে গেছে। তিনতলার মানুষ লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খুঁজেছি বোনকে। কিন্তু কোথাও পায়নি। অনেককে বললাম আমা’র বোন এই চারতলার সেকশনে কাজ করে। আমা’র বোনটারে খুইজ্জা দেন। গেটে তালা মা’রা ছিল। এজন্য কেউ বাঁচতে পারে নাই। গত মাসের এক তারিখ থেকে সে কাজে যোগ দিয়েছিল। পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতো।
তিনি আরও বলেন, সকালে মে’য়েকে ঘুমিয়ে রেখে অফিসে আসছে তার বোন অমৃ’তা। এই এতিম মে’য়ের জন্য বিচার চাই। আমা’র বোন চাই। আমা’র বোনকে হ’ত্যা করা হয়েছে। মে’য়েটা এতিম হয়ে গেল। এই বাচ্চাটাকে আমি কি দিয়ে বুঝাবো।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: