সর্বশেষ আপডেট : ৫ মিনিট ২৯ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

৪বছরে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে হাওরে ৫১ জনের মৃত্যু

হাওরের জনপদ সুনামগঞ্জে ট্র্যাজেডি আরেক নাম বজ্রপাত। প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রা’ণ ঝরছে অসংখ্য মানুষের। বৃষ্টির মৌসুম এলেই হাওরাঞ্চলে দেখা দেয় বজ্রপাতের শ’ঙ্কা।

২০১৮ থেকে ২০২১ সাল এই চার বছরে সুনামগঞ্জ জে’লায় বজ্রপাতে মৃ’ত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির। এছাড়াও ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে আরও অর্ধশত প্রা’ণ হা’রানোর তথ্য রয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংস্থার কাছে। যদিও দু’র্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে বজ্রপাতে মৃ’ত্যুর সঠিক কোনও পরিসংখ্যান নেই।

সুনামগঞ্জের পু’লিশ সুপার ও জে’লা দু’র্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি মানুষ বজ্রপাতে মা’রা যায় ২০১৮ সালে। সেই বছর সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে বজ্রপাতে ২৫ জন মা’রা যান এবং সেটিই সুনামগঞ্জের এক বছরের সর্বোচ্চ মৃ’ত্যু। ২০১৯ সালে প্রা’ণ হারান ৯ জন, ২০২০ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রা’ণ হারিয়েছেন আরও ১০ জন এবং চলতি বছরের ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃ’ত্যু হয়েছে সাতজনের।

২৮ এপ্রিল ধান কাটতে গিয়ে প্রা’ণ হারান দিরাই উপজে’লার ভাটিপাড়ার ইউনিয়নে মধুরাপুর গ্রামের ফকরুল ও ফজলু মিয়া নামের দুই সহোদর। পরিবারের দুই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। দুই পরিবারের ১২ সদস্য নিয়ে শোক সাগরে ফজলু ও ফখরুলের স্ত্রী’। এছাড়াও বজ্রপাতে দোয়ারাবাজারে ২ জন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ১ জন, ছাতক উপজে’লায় ১ জন ও বিশ্বম্বরপুর একজনসহ মোট সাতজনের মৃ’ত্যু হয়। ২০১৯ সালে বজ্রপাতে একই পরিবারের বাবা-ছে’লের মৃ’ত্যুর ঘটনা ঘটেছে তিনটি। বজ্রপাতের কবলে মৃ’ত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে কৃষক, জে’লেসহ নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি।

দু’র্যোগকালীন সময়ে চাষাবাদ, ফসল সংগ্রহ ও মৎস্য আহ’রণের ক্ষেত্রে বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দেশের বজ্রপাত প্রবল এলাকায় বজ্রপাত প্রতিরোধে এখনও পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তাই দাবি উঠেছে হাওর এলাকায় বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের।

এদিকে ২০১৭ সালের নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়, সারা’বিশ্বে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কঙ্গোর কিনমা’রা ডেমকেপ এলাকায়, মা’র্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে এবং জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার মা’রাকাইবো লেক এলাকায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত আ’ঘাত হানে।

সুনামগঞ্জে মা’র্চ থেকে মে, এ তিন মাসে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আ’ঘাত হানে। ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই বেশি। ভা’রতের খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় মা’র্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত মেঘ জমে থাকে। স্তরীভূত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে ওই এলাকার পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জে’লায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি হয়ে থাকে। আর এ বজ্রপাতে বাংলাদেশের হাওর প্রধান জে’লা সুনামগঞ্জে প্রতিবছর প্রা’ণ হারায় অনেক মানুষ।

কৃষি ও মৎস্য আহ’রণ এই দুইটি সুনামগঞ্জের আয়ের প্রধান উৎস হলেও সেই হাওরেই প্রতিবছর বজ্রপাতে প্রা’ণ দিতে হয় অনেককে। সরকার থেকে বজ্রপাতে মা’রা যাওয়া পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ও আ’হত ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়। তাছাড়া বজ্রপাতে মা’রা যাওয়া পরিবারের পুনর্বাসনের জন্যে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ হয়নি। পরিবারের আয়ের একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয় অনেকের।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজে’লার চরানচর ইউনিয়নের ললুয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক। ২০২০ সালের ৪ জুন প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের মধ্যে উপজে’লার মিলন বাজার সংলগ্ন হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মা’রা যায় তার বড় ছে’লে তকবির হোসেন (২০)। তকবির ছিলেন একজন জে’লে। হাওরে মাছ শিকার করে আয়ের টাকা দিয়েই পরিবারের ভরণ পোষণ হতো। কিন্তু একটি দুর্ঘ’টনায় পরিবারের কোনও সদস্যও এখন ভালো নেই। ছে’লে মা’রা যাওয়ার পর আব্দুল খালেকের সুখের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। ছে’লে মা’রা যাওয়া পর পুনর্বাসনের জন্য কোনও সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

খালেক মিয়া বলেন, আমা’র ছে’লে তকবির হোসেন হাওরে মাছ ধরত। আমা’র তিন ছে’লে এক মে’য়ের সংসারে সে ছিল সবার বড়। কিন্তু গেল মাসের ৪ জুন টেলা জাল দিয়ে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে আমা’র ছে’লে বজ্রপাতে মা’রা যায়। সে মা’রা যাওয়ার পর থেকে আমি রোজ কা’মলার কাজ করি। কোনদিন ১৫০ টাকা তো কোনদিন ২০০ আবার কোনদিন এক টাকাও না। এছাড়া কোন ব্যাংকও আমাদের ঋণ দেয় না।

দিরাই উপজে’লার ভাটিপাড়ার ইউনিয়নে মধুরাপুর গ্রামের ফজলু ও ফখরুল নামে দুই ভাই ছিলেন বর্গা চাষি। ২৮ জুন ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মৃ’ত্যু হয় তাদের। ফজলু ও ফখরুলের পরিবারে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী’ সন্তানসহ সদস্য ১২ জন। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে শোক সাগরে পরিবারটি। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতের দিকে নাবালক সন্তানদের।

এভাবে বজ্রপাতে পরিবারের ক’র্তাব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা অনেক পরিবার। বজ্রপাতে নি’হত পরিবারের পাশে সরকারের পাশাপাশি মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এদিকে হাওরে বজ্রপাত থেকে মানুষদের সচেতন ও প্রা’ণহানি কমাতে তালগাছ না লাগিয়ে হাওরে ও খোল জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বজ্র নিরোধক যন্ত্র লাগানো ও বজ্রপাতে মা’রা যাওয়া পরিবারকে মোটা অংকের একটি অনুদান এবং সকল হাওরের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সচেতনমূলক প্রচারণা জো’রদার করার দাবি জানান হাওর উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা।

হাওর হাওর বাঁ’চাও সুনামগঞ্জ বাঁ’চাও আ’ন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, সুনামগঞ্জ সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ এলাকা। প্রতি বছরই বজ্রপাতে প্রা’ণ যায় নিম্ন আয়ের মানুষের। সরকারকে সুনামগঞ্জ জে’লার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে হাওর ও খোলা জায়গায় অ’তিদ্রুত বজ্র নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া মা’রা যাওয়া পরিবারের পুনর্বাসনে আর্থিক অনুদানসহ হাওর এলাকার মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার তাগাদা জানান বিজন সেন।

জে’লা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন  বলেন, সুনামগঞ্জে প্রতি বছর হাওরে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে কৃষক, জে’লেসহ নিম্ন আয়ের মানুষ মা’রা যান। বজ্রপাতে মৃ’ত্যুর হার কমিয়ে আনতে হাওরে গাছ লাগানোর কথা চিন্তা করছি আম’রা।

জে’লা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বজ্রপাতে নি’হত পরিবারকে এককালীন ২০ হাজার ও আ’হত ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানা তিনি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: