সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
বুধবার, ৪ অগাস্ট ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

সিলেটের যে টিলায় ৬৫ বছর ধরে বেরোচ্ছে গ্যাস

সুউচ্চ টিলা। কিন্তু এতে সবুজের কোনো স্পর্শই নেই। নেই সবুজ ঘাস কিংবা গাছ গাছালি। টিলার গায়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় গর্ত। যেগুলো দিয়ে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে গ্যাস। ৬৫ বছর ধরে এভাবেই গ্যাস বেরোচ্ছে এই টিলা দিয়ে। স্থানীয়দের কাছে এটি জ্বলা টিলা নামে পরিচিত। সিলেটের হরিপুর এলাকার উতলার পাড় গ্রামে এটির অবস্থান। দেশের প্রথম গ্যাসের সন্ধান মিলেছিল এই স্থানে। টিলার অদূরেই রয়েছে আরো একটি তাক লাগানো পুকুর। সেটির অবস্থাও একই। ৬৫ বছর ধরেই পুকুরের পানি দিয়ে বুদবুদ করে গ্যাস বের হচ্ছে। বুদবুদ থেকে সৃষ্ট ফেনা জমিয়ে আগুন দিলে পুকুরের পানিতেও আগুন জ্বলে।

১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে প্রথম প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পায় ১৯৫৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (পিপিএল)। গ্যাস তোলার লক্ষ্যে একই বছরেই কূপ খনন কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু গ্যাসের অতিরিক্ত চাপের কারণে বড় ধরণের বিষ্ফোরণ ঘটে। বিষ্ফোরণে কারণে অনুসন্ধানে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

ভূমিধসে ওই স্থানে পুকুরে মত গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে পুকুরের পানিতে সর্বদা বুদবুদ দেখা যায়। যেখানে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালেইে পানিতে আগুন ধরে যায়। পুকুরের পাশে অবস্থিত একটি টিলাও পোড়ামাটির আকার ধারণ করে আছে। সে টিলায় ৫০ বছরেও কোন লতাপাতা গজায়নি। ওই স্থানে মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ওই ফাটল দিয়েই গ্যাস উদ্গীরণ হচ্ছে, যা আশপাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি উতলারপার এলাকায় পোড়া টিলায় নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। সেই ফাটল দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যাচের কাঠিতে টোকা পড়লেই যত্রতত্র জ্বলে উঠছে আগুন। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে গ্যাসফিল্ড কর্তৃপক্ষ এলাকায় ‘বিপজ্জনক’ সতর্কবার্তা জারি করেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জ্বলা টিলার প্রতিটি ফাটল দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। গ্যাসের ঝাঝালো গন্ধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের বেলা গ্যাসে আগুন জ্বললে চোখে পড়ে না কিন্তু রাতের বেলায় আগুন দেখা যায়। সন্ধ্যার পরে সেই আগুনের রঙও বদলে যায়।

এদিকে টিলা থেকে গ্যাস বের হওয়ার দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা আসেন। অনেকে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে আগুন ধরাতে দেখা গেছে। তাছাড়া বুদবুদ উঠা সেই পুকুরের পানিতেও আগুন জ্বালিয়ে উপভোগ করছেন। গ্যাস কর্তৃপক্ষ এই এলাকায় আগুন ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়ে সাইনবোর্ড সাটিয়ে রেখেছেন। তবে পর্যটকরা এসবের তোয়াক্কা করছেন না।

ঢাকা মিরপুর থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবি মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা অভিভূত। এভাবে টিলা থেকে গ্যাস বের হচ্ছে, সেখানে দিয়াশলাই দিলে আগুন জ্বলে। বাচ্চারা এই বিষয়টিকে খুব উপভোগ করছে। তবে এটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এই এলাকাটিকে সংরক্ষণ করা দরকার। তা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

ঢাকার কবি নজরুল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী খালেদা জাহান বলেন, পুকুরে গ্যাস বুদবুদ করছে। বুদবুদ থেকে সৃষ্ট ফেনাতে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বাললেই আগুন জ্বলে। তাছাড়া পাহাড়ের ফাটল দিয়ে গ্যাস বের হয়। প্রকৃতির এই লীলা সত্যিই আকর্ষণীয়। হরিপুরের উতলারপাড় পুরো এলাকাটিকে একটি পর্যটন স্পট ঘোষণা করা দরকার। সংশ্লিষ্টরা আরো একটু প্রচারণা চালালে এটি হতে পারে সিলেটের আরো একটি সম্ভাবনায় পর্যটন স্পট।

উতলার পাড়ের জ্বলা টিলার বের হওয়া গ্যাসে আগুন জ্বালিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে কিশোর সাকিব আহমদ। রাতের বেলায় একটি বেকারিতে চাকরি করে সে। বিকেল হলেই জ্বলা টিলায় চলে আসে সাকিব। ডেইলি বাংলাদেশকে সাকিব বলে, প্রতিদিনিই অনেক মানুষ ঘুরতে আসে এখানে। শুক্রবারে পর্যটকদের ঢল নামে। সবাই গ্যাসে আগুন জ্বলে কি না দেখতে চায়। আমিও আগুন জ্বালিয়ে তাদের দেখাই। বিনিময়ে কিছু বকশিস পাই। প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা আয় হয়।

ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহাব উদ্দিন বলেন, প্রায় ৬০-৬৫ বছর ধরে জলাটিলা ও পুকুর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। আগে বেশি পরিমাণে বের হতো এখন গ্যাসের পরিমাণ কম। এই গ্যাস আমাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করছে না।

শাহাব উদ্দিন আরো বলেন, প্রতিদিনই এখানে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসেন মানুষ। এলাকাতে দেখার অনেক জায়গা আছে। পর্যটন স্পট হিসেবে ওই এলাকাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সরকারেরও লাভ হবে। আমরাও লাভবান হবো।

সেভ দ্য এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেরিটেজ এর প্রধান এবং লেখক ও গবেষক আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, এই এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। একই সঙ্গে পর্যটন স্পটও। যেভাবে টিলার ফাটল থেকে গ্যাস বের হচ্ছে তা ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যাস ফিল্ড কর্তৃপক্ষ এই এলাকাটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে শুধু একটি সাইনবোর্ড সাটিয়ে দায় এড়ানো সম্ভব না। যদি এটি ঝুঁকিপূর্ণ তাহলে টিলা ও পুকুরটিকে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। আর ঝুঁকিপূর্ণ না হলে জায়গাটিকে পর্যটন স্পট নির্ধারিত করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রচারণা ছাড়াই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এসে ভিড় করেন। যদি ঝুকিপূর্ণ না হয় আর প্রচারণা চালালে এটি সিলেটের আরো একটি পর্যটন স্পট হিসেবে স্থান পাবে।

এ ব্যাপারে হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের ব্যবস্থাপক ও ইনচার্জ মো. শাহজাহান আলী জানান, বিষ্ফোরণের পর থেকে এই টিলার ভেতর দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। এটা বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। গ্যাস নির্গমনের কারণে স্থানীয়দের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে না। তারপরও ঝুঁকি এড়াতে আগুন না জ্বালানোর জন্য ‘সাইনবোর্ড’ সাটানো আছে। পর্যটকদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: