সর্বশেষ আপডেট : ১৩ ঘন্টা আগে
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

প্রতারণায় সাহেদের নাটকীয় উত্থান

কখনও আওয়ামী লীগ নেতা, কখনও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা- এমন অসংখ্য পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ। কখনও কখনও সেনা কর্মকর্তা ও প্রশাসনের বড় পদের কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন তিনি। মাঝে মাঝে দেখা যেত টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে।

নিজের ক্ষমতা প্রমাণে ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে টানিয়ে রাখতেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা রয়েছে এ ধরনের অসংখ্য ছবি।

এসব করেই হাসপাতাল পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম-জালিয়াতি আড়াল করতেন। ভয় দেখিয়ে রোগীদের কাছ থেকে ভুতুড়ে বিল আদায় করতেন।

ইতোমধ্যেই সাহেদের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করায় তার মালিকানাধীন উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল এবং ওই হাসপাতালের মিরপুর শাখা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

সোমবার উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গ্রেফতার করা হয় ৮ জনকে।

মঙ্গলবার বিকালে হাসপাতালটির উত্তরা শাখা ও অফিস সিলগালা করে র্যাব। ওই দিন রাতে স্বাস্থ্য অধিদফতর রিজেন্টের গোটা স্বাস্থ্য কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার হাসপাতালটির মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেয়া হয়। ইতোমধ্যে তার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট)।

করোনা টেস্টের নামে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া ও ভুতুড়ে বিল ধরিয়ে দিয়ে রোগীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায়সহ নানা অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার গ্রেফতার হওয়া ৮ জন রয়েছেন। সাহেদসহ ৯ জন এখনও পলাতক রয়েছেন।

গ্রেফতার হওয়া আট আসামিকে বুধবার আদালতে হাজির করা হল। এর মধ্যে এক কিশোরকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ এবং অপর সাত আসামির ৫ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন বিচারক।

আদালতে রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ বলেন, আসামিরা করোনাকালীন মহাদুর্যোগের সময় অসহায় রোগীদের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে প্রতারণা করেছে। রিজেন্ট হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিনিময়ে জনগণকে বিনামূল্যে সেবা দেবে বলে চুক্তি করলেও তা করেনি।

উল্টো জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি করোনা টেস্টের কথা বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরে দুই কোটি টাকার বিল দাখিল করেছে। তারা করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিত। ফাঁদে ফেলে রোগী ভর্তি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিত।

রিমান্ডে যাওয়া সাত আসামি হল- রিজেন্ট হাসপাতালের অ্যাডমিন মো. আহসান হাবীব, এক্সরে টেকনিশিয়ান মো. আহসান হাবীব হাসান, মেডিকেল টেকনিশিয়ান হাতিম আলী, প্রজেক্ট অ্যাডমিন মো. রাকিবুল ইসলাম সুমন, এইচআর অ্যাডমিন অমিত বণিক, এক্সিকিউটিভ অফিসার আবদুর রশিদ খান জুয়েল ও ড্রাইভার আবদুস সালাম।

এখন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে খুঁজছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। বুধবার দুপুরে র্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, র্যাব ছাড়াও অন্যান্য বাহিনী সতর্ক থাকায় তিনি (সাহেদ) দেশ ছেড়ে পালাতে পারবেন না।

শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, দুই রাত ধরেই তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন জায়গায় আমরা খোঁজ করছি। তার বিষয়ে অন্যান্য সংস্থাও সতর্ক। সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, অভিযানের পরই সে গা-ঢাকা দিয়েছে।

মঙ্গলবার রাতেও আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছি। সাহেদের মোবাইল নম্বর বন্ধ। প্রথম দিন ফেসবুকে অ্যাকটিভ ছিলেন, কিন্তু এখন তিনি সবকিছু থেকেই নিষ্ক্রিয়। তবে আশা করছি দ্রুত তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হব।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলের বাসিন্দা। ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়তেন। পরে চলে আসেন ঢাকায়। পিলখানায় রাইফেলস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।

এরপর তিনি আর লেখাপড়া করেননি। সাহেদ ঢাকায় এসে নামের খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করলেও তার মূল নাম সাহেদ করিম। সাহেদ করিম থেকে মো. সাহেদ হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক এখন সাতক্ষীরার টক অব দ্য টাউন।

সাতক্ষীরার একজন আইনজীবী বলেন, আমি সাহেদ করিমদের সাতক্ষীরার বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। প্রতারণার মামলায় সাহেদ করিম ২০১১/২০১২ সালে গ্রেফতার হয়ে জেলও খাটেন। ভারতে বসে ঢাকায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলায় জামিন নেন।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরা থেকে যাওয়ার পর ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার দাদার বাসায় থাকতেন সাহেদ করিম। এরই মধ্যে তিনি উত্তরায় একটি ক্লিনিক গড়ে তোলেন। ওই ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে তিনি অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।

তার বাবা সিরাজুল করিম অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও তার মা সাফিয়া করিম ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০১০ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান সাহেদ করিমের মা সাফিয়া করিম।

জানা যায়, একমাত্র ছেলে সাহেদ করিমের ঠগবাজি, প্রতারণা, মিথ্যাচার এবং নানা অপকর্মে অতিষ্ঠ ছিলেন তার মা। সাহেদ এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলেও সমসাময়িকদের অনেকে জানিয়েছেন।

মিরপুর শাখায়ও তালা : করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ায় রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখাও বন্ধ করে দিয়েছে র্যাব। বুধবার শাখাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, বিকাল ৪টায় রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখায় গিয়ে সেটি সিলগালা করে দেন তারা। সেখানেও বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন তারা।

সাহেদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই : আদালতে পুলিশের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাহেদ একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রশ্নে তার কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই।

তিনি তার সহযোগীদের সহায়তায় কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কোনো রোগী প্রতারণার কথা বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করলে তিনি বিভিন্নভাবে তাদের হুমকি দিতেন।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের নমুনা পরীক্ষার ফর্মে পরীক্ষা বিনামূল্যে করার কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা এবং পুনরায় পরীক্ষার জন্য এক হাজার টাকা করে নিতেন তিনি।

এছাড়াও আইসিইউ ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি রেখে মোটা অংকের অর্থ আদায় করতেন। তিনি প্রায় ছয় হাজার রোগীর কোভিড-১৯ পরীক্ষা করে পরীক্ষার ফি বাবদ প্রতারণার মাধ্যমে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এছাড়াও চিকিৎসায় প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে সরল রোগীদের কাছ থেকে ২০ মার্চ থেকে অদ্যাবধি প্রায় তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

বিনামূল্যে কোভিড-১৯ সেবার নামে প্রতারণা : সরকারের কাছ থেকে টাকা নেবে, বিনিময়ে জনগণকে বিনামূল্যে সেবা দেবে বলে ১২ মে রিজেন্ট হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তি করে।

রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেয়া সত্ত্বেও রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে ১ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রাপ্তির জন্য বিল দাখিল করে।

সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য নয় -ড. শাম্মী : রিজেন্ট গ্রুপের মালিক মো. সাহেদ বর্তমানে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য নয় বলে দাবি করেছেন দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ।

বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মো. সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য নয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত কোনো উপকমিটির অনুমোদন দেননি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত মেয়াদে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য ছিলেন মো. সাহেদ। গত বছরের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ওই উপকমিটি বিলুপ্ত হয়। নতুন উপকমিটি এখনও অনুমোদন দেয়া হয়নি।

কিন্তু উপকমিটি না থাকলেও মো. সাহেদ সব জায়গায় নিজেকে এর সদস্য হিসেবেই পরিচয় দিত। তার ফেসবুক পেজ এবং ভিজিটিং কার্ডেও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য হিসেবেই নিজের পরিচয় উল্লেখ করেছেন।

সাহেদের ব্যাংক হিসাব তলব : সাহেদ ও তার পরিবারের সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব তলব এবং তা খতিয়ে দেখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট)। বুধবার রাতে সংস্থাটির প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিপোর্ট থাকলে বা কারও ব্যাপারে তথ্যের দরকার হলে আমরা ব্যাংক হিসাব তলব করি। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিকের ব্যাংক হিসাবও আইন মেনে তলব করা হয়েছে। সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী প্রধানদের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: