fbpx

সর্বশেষ আপডেট : ৯ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

“বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য” বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ


মোঃ কায়ছার আলী: প্রায় চার হাজার বছর ধরে ইহুদীরা ছিল উদ্বাস্তু দন্ডিত এবং উৎপীড়িত। তারা মিশরে ও ব্যাবিলনে দাসত্ব করেছে। মধ্যযুগে তাদের পড়তে হয়েছে কলঙ্কিত পোশাক। জার্মানীতে বছরে মাত্র চব্বিশ জন ইহুদী বিয়ে করার অনুমতি পেতেন। বিকেল চার টার পর কোন ইহুদীর ঘর থেকে বেরুনোর অনুমতি ছিল না। তাদের কোন রেস্তোরা ও পার্কে প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। লক্ষ লক্ষ ইহুদীকে বন্দী শিবির গুলোতে দাস শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হত।

অনাহারে নির্যাতনে তারা মারা পড়তে থাকে। হলুদ তারকা জার্মান না ইহুদী পরিচিত এর জন্য তাদের ব্যাজ পরিধান করতে বাধ্য করা হয়। নাৎসি জার্মানীতে ইহুদীদের হত্যাকান্ডের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। মাঝে মাঝে গবেষকরা বলেন দেড় থেকে দুই কোটি। এক সময়ের সেই হতভাগ্য ইহুদীরা আজ সারা বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এবং বিশ্বের সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইহুদীদের মত কালো মানুষদের অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। আমেরিকার পাঁচশ বছরের মধ্যে তিনশ বছরই কালোরা ছিল দাস। তাদেরও রেস্তেরায় ঢোকার অনুমতি এবং ভোটের অধিকার ছিল না।

রেস্তেরায় লেখা থাকত ‘নো ডগ নো নিগ্রো।’ ১৯৬৫ সালের ৭ই মার্চ এলবামা রাজ্যের সেলমায় কৃষ্ণাঙ্গ জননেতা মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে যে মিছিলটি হয়েছিল সেই মিছিলের ওপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশেরা নির্মম বেত্রাঘাত আর ঘোড়া চাপিয়ে দেওয়ার দৃশ্য এখন কি লজ্জা দেয় না আমেরিকানদের? ১৯৬৫ সালে কংগ্রেস নাগরিক অধিকার আইনে কৃষ্ণাঙ্গদের চাকরি, শিক্ষা, বাসস্থান, বর্ণবৈষম্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শোষনমুক্ত সমাজ, শিশুদের সমঅধিকার (স্কুল, খেলার মাঠে এবং এক টেবিলে বসার) বৈষম্যমূলক আইন প্রত্যাহার করে সর্বোপরি সরকার তাদের ভোটাধিকার দেন। মাত্র তেতাল্লিশ বছরেই তারা (শ্বেতাঙ্গ) কি ভেবেছিল যে, একজন কালো মানুষ পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি বারাক ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে হোয়াইট হাউজে বসবেন? এর আগে কলিন পাওয়েল এবং কন্ডোলিসা রাইস মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হোন। প্রকৃতির নিয়ম-কানুন বড়ই জটিল। কে কখন উত্থান পতনের চক্রে পড়বে তা কোন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক জাতি এক রাষ্ট্র এই ধারণার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এর উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, দৈহিক গঠন প্রনালী প্রভৃতি কারণে বাঙ্গালী জাতি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা। স্বাভাবিক কারণে আমাদের মনে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ ঘটে। যিশু খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে এ গাঙ্গেয় অববাহিকায় বসবাসকারী প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীর সাথে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এসে বসবাস শুরু করে।

যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের উত্তর -পশ্চিম দিক থেকে আলপিনু-ককেশীয় আর্য উপজাতি ভারতবর্ষে আগমন করে। যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৮ শত বছর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরব জাতি এসে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। কালক্রমে গাঙ্গেয় বঙ্গে বসবাসরত এ সকল বিভিন্ন উপজাতির সংমিশ্রনকে বাঙ্গালী জাতি নামে অভিহিত করা হয়েছে। বস্তুত এত বিচিত্র বর্ণ, আকৃতি বাঙ্গালিদের মধ্যে রয়েছে যে, বাঙ্গালিদের আদর্শ নৃতাত্বিক গঠন প্রকৃতির বর্ণনা করা কষ্টকর। মোটামুটিভাবে বলা যায় গায়ের শ্যামলা রং, মাথার কালো চুল, মধ্যম আকৃতি, মুখের ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ও সর্বজননীতা বাঙ্গালী জাতিকে বর্মী কিংবা বালুচদের থেকে পৃথক করা হয়েছে। প্রাচীন যুগে বাংলা নামে কোনো অখন্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না।

বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন বঙ্গ, পুন্ড, হরিকেল, সমতট, বরেন্দ্র, এরকম প্রায় ১৬ টি জনপদে বিভক্ত ছিল। বাংলার বিভিন্ন অংশে অবস্থিত প্রাচীন জনপদগুলোর সীমা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। কেননা বিভিন্ন সময়ে এসব জনপদের সীমানা হ্রাস অথবা বৃদ্ধি পেয়েছে। হাজার বছরের বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের শুরু থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত এই বাঙলার মাটিতে কোন বাঙালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন কোন ব্যক্তিত্ব স্বাধীন বাঙালি জাতির শাসক বা পরিচালক ছিলেন না। শক, হুন, পাল, সেন, মোগল, পাঠান, ফরাসী, বৃটিশ , পাঞ্জাবী সকল শাসকই ছিলেন বহিরাগত। জন্মভাষা কৃষ্টি ইত্যকার সকল দিক থেকেই তারা ছিলেন অবাঙালি। কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মহানায়ক যিনি বাংলার মাটিতে, বাঙালী পরিবারে বাংলা ভাষার উত্তরাধিকার নিয়ে ভূমিষ্ট এবং স্থান কাল পরিবেশ শত প্রতিকুলতার মধ্যেও বাঙালী চিন্তা চেতনার ধারক বাহক।

শেখ মুজিব তাঁর স্কুল জীবনের শুরু থেকেই বাংলা ও বাঙালীর কথা ভাবতে শুরু করেন। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার লাল সবুজ বিজয় পতাকা এনে দেওয়ার আগে সামরিক শাসকের অধীনে ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে জাতির কাছে বঙ্গবন্ধুর আবেদনের একাংশ হল-প্রিয় ভাইবোনেরা, বাংলার যে জননী শিশুকে দুধ দিতে দিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তেজগাঁওয়ে নাখালপাড়ায় মারা গেল, বাংলার যে শিক্ষক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন দিল, বাংলার যে ছাত্র স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামে রাজপথে রাইফেলের সামনে বুক পেতে দিল, বাংলার যে শ্রমিক কুর্মিটোলার বন্দি শিবিরে অসহায় অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হল, বাংলার যে কৃষক ধানক্ষেতের আলের পাশে প্রাণ হারাল-তাদের বিদেহী অমর আত্মা বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, ঘরে ঘরে ঘুরে ফিরছে এবং অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার দাবি করছে। রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে যে আন্দোলন তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন, সে আন্দোলন ৬ দফা ও ১১ দফার। আমি তাঁদেরই ভাই। আমি জানি, ৬-দফা ও ১১-দফা বাস্তবায়নের পরই তাঁদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। কাজেই আপনারা আওয়ামী লীগের প্রতিটি প্রার্থীকে ‘নৌকা’ মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে জয়যুক্ত করে আনুন।

আমার দৃঢ়বিশ্বাস, যে জালেমদের ক্ষুর ধার নখদন্ত জননী বঙ্গভূমির বক্ষ বিদীর্ন করে হাজারো সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা জয়যুক্ত হবো। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমাদের সহায় হবেন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে প্রতিমুহূর্ত ছিল টান টান উত্তেজনা। বিজয়ী পার্টির জননেতা হিসেবে স্বাধীনতার মহানায়ক ৭ই মার্চ দুপুর তিনটার খানিক পরে রমনা রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চে উঠেন। সভায় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। বঙ্গবন্ধু কালো ভারী ফ্রেমের চশমাটি খুলে রাখলেন ঢালু টেবিলের ওপর। তারপর সামনে তাকিয়ে শান্ত গভীর কন্ঠে বললেন “ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।

আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। সারা মাঠ হঠাৎ শান্ত। শুধু আছড়ে পড়ছে চারদিকে বঙ্গবন্ধু ভরাট কন্ঠস্বর। ২৩ বছরের ইতিহাস, এসেম্বলীতে যাওয়ার চার শর্ত উল্লেখ করে বললেন শর্তগুলো মানলে তিনি বিবেচনা করে দেখবেন এসেম্বলীতে যোগদান করবেন কিনা, তখন সারা রেসকোর্স হাততালি দিয়ে তার দাবিকে সমর্থন জানাল। কিন্তু মানুষজনদের শংকা, যদি পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেফতার করে, হত্যা করে তাহলে কী হবে? এটি বুঝেই বোধ হয় বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন- “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। বক্তৃতা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু জাতিকে নিরাশ করলেন না।

সবশেষে দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষনকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। ঊনিশ মিনিটের অলিখিত ভাষনে তাঁকে একবারও থমকাতে হয়নি। উপস্থিত-অনুপস্থিত জনতা কোন পরিস্থিতিতে কি করনীয়, তিনি গ্রেফতার হলে কি করতে হবে এ ভাষনে তারও নির্দেশনা আছে। কঠিন সংকটে এত ভারসাম্যপূর্ণ অথচ আবেগময় বক্তৃতার সংখ্যা পৃথিবীতে বিরল।

তিনি পেরেছিলেন বলেই তো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক, স্বাধীনতার মহান স্থপতি বাংলাদেশের মহানায়ক। আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গের ভাষনের সময় তিনি ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি চেয়েছিলেন দাস প্রথা তুলে দিয়ে রাজ্যগুলোর গৃহযুদ্ধ থামিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করতে। বাঙ্গালীর মহামুক্তি এই সনদপত্র বা ভাষন স্বাধীনতার আহ্বান-কীভাবে লড়াই করতে হবে তার পরিপূর্ণ সঠিক নির্দেশনা। মহান সৃষ্টিকর্তা বঙ্গবন্ধরু নেতৃত্বে আমাদেরকে সারা বিশ্বে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি ও দেশ হিসেবে পরিচিত করবেন বলেই হয়তো তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভরসা করে সেদিন বলেছিলেন- “এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইন্শাআল্লাহ।”

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: