সর্বশেষ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

সিলেটের পুলিশ সুপারের মানবিকতা

 


মানুষ মানুষের জন্যে জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’ বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভূপেন হাজারিকার গানের কথাগুলো অনেকের মত আমা’রও খুব প্রিয়। বাস্তবিক ক্ষেত্রে কথাগুলোর প্রয়োগ ঘটানো গেলে সমাজের চিত্র পাল্টে যেত বলে আমা’র বিশ্বা’স। আমি হয়তো এর সিকিভাগও পারি না। তবে সমাজে এরকম অনেক মানুষ আছে যারা ভূপেন হাজারিকার এই গানের কথাগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে সিংহভাগ প্রয়োগ করে থাকেন। আর একারণেই পৃথীবী এখনো অনেক সুন্দর। এরকম একজন মানুষ নিয়ে দুটি কথা লিখতে চাই। তিনি হলেন সিলেট জে’লার পু’লিশ সুপার মোহাম্ম’দ ফরিদ উদ্দিন পিপিএম স্যার। আমি স্যারের অধীনে কর্ম’রত কনিষ্ট এক কর্মক’র্তা। স্যারের অফিসেই আমা’র অফিস থাকার সুবাধে স্যারের কিছু মানবিক কাজের উদাহ’রণগুলো সহ’জেই আমা’র দৃষ্টিগোচর হয়।

বিভাগীয় একটি জে’লা শহরের পু’লিশ সুপারের দপ্তরিক কাজের চাপ মোকাবিলা করে নিয়মিত সাধারণ মানুষদের অ’ভিযোগ শোনা কিংবা তাদের নিকট থেকে দ্রুত সেবা প্রাপ্তির প্রত্যাশা শুনে তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা অনেকটা দুস্কর হয়ে উঠে।তবে পু’লিশ সুপার শত ব্যস্ততার মাঝেও সাধারন মানুষদের সাক্ষাতকারের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। সাধারণত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগণ রুটিন কাজের সুবিধার্থে দর্শানার্থিদের সাক্ষাতকারের জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় বেধে দেন। তবে গতানুগতিক এরকম সিস্টেম থেকে বের হয়ে পু’লিশ সুপার সিলেট মহোদয়ের মত অফিসে থাকা অবস্থায় (সকাল ১০ টা কিংবা সন্ধা ৭টা হউক) হাসিমুখে দর্শানার্থিদের কথা শুনে তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হরহামেশা দেখা যায় না।

যেই পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমা’র লেখার উদ্দেশ্য সেটি হল গতকাল (৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধা ৭ টায়) সিলেট জে’লার বিশ্বনাথ থা’নায় কর্ম’রত এক কনস্টেবল ( প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রে’মঘটিত বিষয় নিয়ে মানসিক স্ট্রেসে আক্রান্ত হয়ে) নিজের নামে ইস্যু করা রাইফেল দিয়ে বুকে গু’লি চালিয়ে আত্মহ’ত্যার চেষ্টা করে। বিষয়টি ধ’র্মীয়, সামাজিক কিংবা আইনানুগ দৃষ্টিকোন থেকে অ’ত্যন্ত ঘৃনিত এবং শা’স্তিমূলক অ’প’রাধ। জে’লা পু’লিশের অ’ভিভাবক হিসেবে এরকম সংবাদ পাওয়া নিশ্চয়ই অ’ত্যন্ত ক’ষ্ট’কর এবং বিব্রতকরও বটে। কারণ একজন আইন শৃংখল বাহিনীর কোন সদস্যের দ্বারা এরকম ঘৃনিত কাজ করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

এরকম সংবাদ শুনার সাথে সাথে কয়েকজন সিনিয়র অফিসারসহ আমি এবং সংশ্লিষ্টদের দ্রুত এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লে গিয়ে ভিকটিম হাসপাতা’লে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসার পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দিলেন। সেই অনুযায়ী আম’রা হাসপাতা’লে গিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকি। খানিক্ষণের মধ্যেই গুরতর আ’হত অবস্থায় ভিকটিমকে হাসপাতা’লে নিয়ে আসলে আম’রা তাকে অ’পরেশন থিয়েটারে নিয়ে যাই এবং তাৎক্ষণিক কয়েক ব্যাগ র’ক্ত সংগ্রহ করি। মিনিট পাঁচেক বাদেই দেখি পু’লিশ সুপার মহোদয় কাউকে কিছু না বলেই হাসপাতা’লের অ’পারেশন থিয়েটারের সামনে চলে আসেন। এসেই তিনি ডাক্তারের সাথে কথা বলেন ভিকটিম মুমূর্ষু কনস্টেবলকে দেখেন। ডাক্তারদের সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্ছ চিকিৎসা প্রদান করার অনুরোধ করেন।

এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলে ঢাকায় পাঠানোর জন্যও তিনি প্রস্তুত বলে ডাক্তারদের অবহিত করেন। ডাক্তারগণ প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চিকিৎসা করতে থাকেন। কিন্তু পু’লিশ সুপার মহোদয় নিজে থেকেই ভিকটিমকে ঢাকায় প্রেরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। যেভাবেই হউক তাকে বাঁ’চাতে হবে; এরকম দৃষ্টিকোন থেকে রাতের বেলার সীমাবদ্ধতার কারণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কিংবা হেলিকপ্টার ব্যবস্থা করতে না পারার আক্ষেপ করতে থাকেন। স্যারের পাশে আমিসহ অ’তিরিক্ত পু’লিশ সুপার (সদর) লুৎফর স্যার ছিলাম। আমাদেরকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করতে বলেন পাশাপাশি নিজেই পরিচিত বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে ডাক্তারগণ বলার আগেই আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজসহ এক এক করে ঢাকায় পাঠানোর সমস্ত ব্যবস্থা করতে থাকলেন।

আনুমানিক আধা ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যেই হাসপাতা’লে আসলেন সিলেট রেঞ্জের সুযোগ্য ডিআইজি কাম’রুল আহসান এবং অ’তিরিক্ত ডিআইজি জয়দেব কুমা’র ভদ্র। স্যাররা এসপি স্যারসহ চিকিৎসা প্রদানকারী ডাক্তারদের সাথে কথা বলে সামগ্রিক পরিস্থিতি অবহিত হলেন। তাৎক্ষণিক ডিআইজি স্যার উন্নত চিকিৎসার জন্য ভিকটিমকে ঢাকায় প্রেরণের জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এসপি স্যারকে পরাম’র্শ্য দিলেন এবং স্যার নিজেও ঢাকায় পৌঁছেই যেন দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায় তার জন্য সবরকম ব্যবস্থা করতে পু’লিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সিনিয়র স্যারদের সাথে কথা বলেন।

এমনকি ভিকটিমের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় যেন কোন ট্রাফিকে পরতে না হয় সেজন্য আশপাশের জে’লার পু’লিশ অফিসারদের সাথে কথা বলতে বলেন এবং একটি ডাবল কেবিন পিকাপ স্কর্ট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সকে ঢাকায় নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। একজন সহকর্মী কনস্টেবলকে বাঁ’চাতে ডিআইজি স্যার, অ’তিরিক্ত ডিআইজি স্যার এবং এসপি স্যারদের যে আন্তরিকতা কিংবা মহানুভবতা পাশ থেকে দেখলাম তাতে মনে হল ভূপেন হাজারিকার সেই ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানের কথাগুলোর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটানোর মত লোকগুলোই যে আমা’র শ্রদ্ধেয় অ’ভিভাবকগণ! এ কথা ভাবতেই গর্বে বুকটা ভরে উঠল। পাশাপাশি নিজেও যেন স্যারদের মানবিক গুণাবলীর সিকিভাগ হলেও অর্জন করতে পারি তার প্রয়াস চালানো দরকার বলে মনে হল। যাইহোক ভিকটিমের উন্নত চিকিৎসার সার্বিক প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা শেষে পু’লিশ সুপার মহোদয়ের আশ্বা’সের প্রেক্ষিতে রাত আনুমানিক ১১ ঘটিকার সময় ডিআইজি স্যার এবং অ’তিরিক্ত ডিআইজি স্যারগণ হাসপাতাল ত্যাগ করেন।

এরমধ্যে আইসিইউ অ্যাম্বলেন্স হাসপাতা’লের ই’মা’রজেন্সিতে প্রস্তুত হতে থাকল। ভিকটিমকে ঢাকায় প্রেরণের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। এসপি স্যার আমাকে ৫০,০০০/- টাকা বের করে অ্যাম্বুলেন্সের মালিকের সাথে কথা বলে ভাড়া পরিশোধ করে আসতে বললেন। পাশাপাশি চিকিৎসার কাজে সহায়তায় যাওয়া অফিসারের নিকট ঢাকায় চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা দিয়ে দিলেন। একজন পু’লিশ সুপার পদম’র্যাদার কেউ তার সহকর্মীকে বাঁ’চাতে অ’পরেশন থিয়েটারের সামনে সাধারন দর্শনার্থীদের মত প্রায় চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত আয়োজন করতে পারে আমা’র জানা ছিল না।

এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে নিজে ভিকটিমকে তুলে দিয়ে তার সাথে যাওয়া অফিসারকে বারবার বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিতে দেখে আমি অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবতে ভালো লাগছিল আমি এরকম মানবিক গুণাবলীর অফিসারের অধীনে কাজ করতে পেরেছি বলে। যাইহোক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভিকটিম কনস্টেবল ঢাকায় বক্ষ্য ব্যাধি হাসপাতা’লে কিছুটা ভাল অবস্থায় আছে বলে জানতে পেরেছি। আম’রা আশা করি সে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবে আর তাতেই ডিআইজি স্যার, অ’তিরিক্ত ডিআইজি স্যার এবং এসপি স্যারগণ তাদের সহকর্মীকে বাঁ’চাতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো স্বার্থক হবে।

আম’রা যে যেই লেভেলেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করি না কেন সব কিছুর মূলে রয়েছে মানব কল্যাণ। যথাযথভাবে মানব কল্যাণ করাটাই মূল দায়িত্ব, সেই দৃষ্টিকোন থেকেই হয়তো পু’লিশ সুপার মোহাম্ম’দ ফরিদ উদ্দিন স্যারের প্রতিটি কাজে কর্মে এরকম চিত্র ফুটে উঠছে। মানব কল্যাণে স্যারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সিলেট জে’লা পু’লিশের সকল সদস্যসহ সমাজের অনেকেই অনুকরণ করবে বলে আশা রাখছি।
লেখক: অফিসার ইনচার্জ, জেলা গোয়েন্দা শাখা (উত্তর) সিলেট।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: