সর্বশেষ আপডেট : ৮ ঘন্টা আগে
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

সিলেটি নাগরী লিপির নবজাগরণ

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রয়েছে একাধিক বর্ণমালা বা লিপি। তবে একই ভাষা ও সাহিত্যের একাধিক বর্ণমালার অস্তিত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল উদাহরণ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় ব্যবহৃত হয়েছে দুটো বর্ণমালা; একটি বাংলা বর্ণমালা, অপরটি সিলেটি নাগরীলিপি। সিলেটি নাগরীলিপিতে রচিত হয়েছে শত শত গ্রন্থ, দলিল দস্তাবেজ এবং পরিচালিত হয়েছে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। কয়েক শতাব্দী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রধানত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এ লিপির সাহিত্য। তবে, সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, অসম, করিমগঞ্জ ও শিলচরে এর ব্যবহার ছিল। নাগরীলিপিতে রচিত সাহিত্যের পুঁথি-পুস্তক এক সময় ছিল বিলুপ্তপ্রায় এবং বর্তমানে এর প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে অল্প পরিসরে পাকিস্তান আমলে এর চর্চা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদারদের হাতে বিধ্বস্ত হয় সিলেটি নাগরীলিপির ঠিকে থাকা একমাত্র ছাপাখানাটি। এরপর বিলুপ্তির কবলে পড়ে এ-ঐতিহ্যসম্পদ।

নাগরীলিপির বিকাশ ও চর্চার ইতিহাস :

কীভাবে নাগরীলিপির উদ্ভব ও কীভাবে এর প্রচলন হয় এ সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে রয়েছে নানামত। বাংলাপিডিয়াতে নাগরীলিপি সম্পর্কে মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সিলেটি নাগরী বাংলালিপির বিকল্প একপ্রকার লিপি, একসময় প্রধানত সিলেট অঞ্চলে এটি প্রচলিত ছিল। তবে সিলেটের বাইরে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা এবং অসমের কাছাড় ও করিমগঞ্জেও এর ব্যবহার ছিল। আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপির সংমিশ্রণে চতুর্দশ শতকের প্রথম দশকে এ লিপির উদ্ভব ঘটে। আরবী ও ফারসী ভাষার সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে যে মুসলমানি বাংলা ভাষার প্রচলন হয়, তার বাহক হিসেবে সিলেটি নাগরী ব্যবহৃত হতো। সিলেটের তৎকালীন মুসলমান লেখকগণ বাংলার পরিবর্তে এই লিপিতেই ধর্মীয় বিষয়সমূহ চর্চায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হযরত শাহজালাল (র.) সমসাময়িক মুসলমান ধর্মপ্রচারকগণ এই লিপিতে ধর্মমত লিপিবদ্ধ করতেন বলে জানা যায়।’

নাগরীলিপির ব্যবহার প্রধানত সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চলে-সদর, করিমগঞ্জ ও মৌলভীবাজার মহকুমায় এই লিপির প্রচলন বেশি ছিল। কাছাড় জেলায় ও ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহকুমায়ও এক সময় সিলেটি নাগরী পুঁথির প্রচার ছিল। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই লিপি বেশি ব্যবহার করতেন। অশিক্ষিত মুসলমান যারা বাংলা অক্ষর লিখতে পারত না-তারা শুধু নাগরী লিপিতেই তাঁদের নাম দস্তখত করতে পারত। কোন কোন প্রাচীন দলিলে নাগরী লিপিতে নাম দস্তখত দেখা যায়। রাজকার্যের সঙ্গে এই লিপি প্রচলনের কোন সম্বন্ধ ছিল না। নাগরী পুস্তকের কিছু নামাজ, রোজা, হজ, ইসলামী চালচলন, ইসলামের ইতিহাসবিষয়ক। কিছু মারফতিবিষয়ক। কিছু পুঁথিতে পীর ও আউলিয়াদের জীবনী লিখিত আছে। আর কিছু কিছু পুঁথি প্রেম-উপাখ্যান। এই সকল পুঁথি অশিক্ষিত জনসাধারণকে শোকে, দুঃখে সান্ত¡না ও বিশ্রামে আনন্দ দিয়েছে। নাগরী পুঁথি পল্লীর জীবন সরস করে পল্লীবাসীদের সাহিত্যধারা অক্ষুণ্ন রেখেছে। অভিজাত বংশীয়দের বাদ দিলে পল্লীবাসীর জনচিত্ত এই লিপিতে লিখিত সাহিত্যকে অবলম্বন করেই বিকাশ লাভ করে। কম পরিশ্রম ও কম সময়ে শেখা যায় বলে স্ত্রীলোকের মাঝেও এর বহুল প্রচার ছিল। সাধারণ্যে প্রবাদ ছিল যে, ‘নাগরী লিপি আড়াই দিনেই শেখা যায়’। নাগরী লিপি সংযুক্ত বর্ণ ও অনেক জটিল অক্ষর থেকে মুক্ত। এই কারণে সিলেটি নাগরী লিপি অতি সহজেই শেখা যায়।

উদ্ধারকৃত গ্রন্থ :

নাগরীলিপিতে দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনার কথা জানিয়েছেন গবেষক মোস্তফা সেলিম তার ‘সিলেটি নাগরী লিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থসমূহের বড় অংশই মুদ্রিত হয়েছে। কালের ধুলোর অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছিল পুঁথিগুলো। মোস্তফা সেলিম উদ্যোগী হয়ে নাগরী লিপিতে রচিত গ্রন্থগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ পর্যন্ত নাগরীলিপির ২৬টি পুঁথি পুনঃপ্রকাশ করে তিনি এ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে রাখছেন অসামান্য অবদান।

নাগরী বর্ণমালার উদ্ভব :

নাগরীলিপির উদ্ভব হয়েছে চতুর্দশ শতকের গোড়াতেই। হযরত শাহজালাল এবং তিন শ’ ষাট আওলিয়ার মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার লাভ করে এবং তাদের অনুসারীদের দ্বারা নাগরী লিপি সৃজিত হয়। অন্যপক্ষের মত হচ্ছে, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এ অঞ্চলে আফগান উপনিবেশ স্থাপিত হয়। এ সময় নাগরী লিপির উৎপত্তি হয়। আফগান মুদ্রায় সিলেটি নাগরী লিপির হরফের উপস্থিতি এক্ষেত্রে তাদের অকাট্য যুক্তি। অন্যদিকে তৃতীয় পক্ষ মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনের প্রাকলগ্নে এ লিপির উদ্ভব হয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে ইংরেজ আমলে বাঙালী মুসলমান নিজেদের স্বকীয়তা এবং হিন্দুদের প্রভাব মুক্ত থাকার অভিপ্রায়ে এটি সৃষ্টি করেন। তিন ভাগে মতামতগুলো বিভক্ত হলেও হযরত শাহজালাল ও তাঁর সহচরদের সিলেট আগমনের প্রভাবে যে নাগরী লিপির প্রচলন ঘটে, এ বিষয়ে অধিকাংশ গবেষক ঐক্যমত পোষণ করেছেন। সিলেটি নাগরী বর্ণমালায় বর্ণ সংখ্যা ৩২। বর্ণগুলো হচ্ছে : আ, ই, উ, এ,ও, ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম,র, ল, ড়, শ, হ। এ লিপি কোন মৌলিক বর্ণ নয়। বর্ণ দ্বৈতস্বর ও যুক্তব্যঞ্জন সিলেটি নাগরীতে বর্জন করা হয়েছে।

নাগরী সাহিত্যের বিষয়-আশয় :

সিলেটি নাগরীলিপির উদ্ভব আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরীর অনুসরণে। এ-লিপিতে রচিত হয়েছে শত শত গ্রন্থ, দলিল-দস্তাবেজ এবং পরিচালিত হয়েছে সেকালের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। নাগরীলিপির সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। নাগরীসাহিত্যে মূলত ইসলামী নানা কাহিনী বিধৃত হয়েছে; মানবিক প্রেম-প্রণয় উপাখ্যানও প্রাধান্য পেয়েছে। এছাড়াও নবিচরিত, ধর্মের বাণী, রূপকথা, সামাজিক রচনা, সুফিবাদ, ফকিরি গান, বীরগাথা এবং মরমী কাহিনীমূলক পুঁথি রচিত হয়েছে। প্রায় ছয় শ’ বছর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এ-লিপির সাহিত্য। তবে, সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, করিমগঞ্জ, শিলচর ও অসমের ব্যবহার ছিল।

নাগরী সাহিত্যের নবজাগরণ :

নাগরী পুঁথি-পুস্তক একটা সময় ছিল দু®প্রাপ্য। প্রায় ৫০ বছর পূর্বে এসব অমূল্য গ্রন্থ কালের গহ্বরে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। এটি হয়ে উঠেছিল বিস্মৃত ঐতিহ্যের নাম। প্রায়বিলুপ্ত নাগরীলিপির সাহিত্যের উদ্ধার বা নবজাগরণ ঘটেছে মোস্তফা সেলিমের শ্রমঘন প্রচেষ্টা এবং সৃজনশীল উদ্যোগে। আর তার সহযোগী হিসেবে সঙ্গ দেন মোঃ আবদুল মান্নান। প্রায় একযুগ ধরে বিলুপ্তপ্রায় এ লিপি ও সাহিত্য পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেছেন মোস্তফা সেলিম। ২০০৯ সালে ‘কেতাব হালুতন্নবী’ পুঁথিটি উদ্ধারের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর একের পর এক প্রায় ২৫টি গ্রন্থ এ যাবত উদ্ধার করে সঙ্কলন, সম্পাদনা ও প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করে শেকড় সন্ধানী প্রকাশনা সংস্থা উৎস প্রকাশন। শুধু প্রকাশনা নয়, প্রকাশনার বাইরে নবজাগরণে সভা, সেমিনার, প্রদর্শনীসহ নানাবিধ সৃজনশীল কর্মকা-ের মাধ্যমে এ লিপি ও সাহিত্যের বিস্তৃতি ও প্রসার ঘটিয়ে তিনি অনন্য এক ঐতিহ্যের সঙ্গী হয়েছেন। সিলেট অঞ্চলের দৈনন্দিন ব্যবহৃত ভাষা সাহিত্যের এ বিরল কাজটি করতে গিয়ে মোস্তফা সেলিম তার সময়, মেধা, ও শ্রম বিনিয়োগ করে দীর্ঘ প্রায় একযুগের বেশি সময় ধরে গবেষণার মাধ্যমে পাঠকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রায় হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যসম্ভার। ইতোমধ্যে নাগরী বর্ণমালা, নাগরীলিপি পরিচয়ের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে তার ৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে সাহিত্যসেবীদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই বহুমুখী প্রচেষ্টায় নাগরীলিপির সাহিত্য দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। এ লিপি ও সাহিত্য সংরক্ষণের জন ‘নাগরী জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। মোস্তফা সেলিমের নিবেদিত ভূমিকায় বাংলাদেশের বিলুপ্ত একটি লিপি ও তার সাহিত্যের সাম্প্রতিককালে নবজাগরণ হয়েছে। নাগরীলিপি বাংলাভাষা-সাহিত্য ইতিহাসের অনুপম অংশ, আর মোস্তফা সেলিম নাগরীলিপি, সাহিত্য পুনরুদ্ধার, প্রচার ও প্রসারে সহযোগী হয়ে ইতিহাসের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছেন।

লেখক : বদরুল হায়দার, সাময়িকী, জনকণ্ঠ

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: