সর্বশেষ আপডেট : ৩০ মিনিট ২৫ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

জীবন সংগ্রামে সফল  বড়লেখার ৪ জয়িতার গল্প

আব্দুর রব, বড়লেখা :

নানা প্রতিবন্ধতকা, সীমাবদ্ধতা ও চরম দারিদ্রতার মধ্যেও জীবন সংগ্রামে উদ্যমী অনেক নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যারা কঠিন সংগ্রামে যোগ্যতা অর্জন করে চাকুরী ও স্ব-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে নিজেরা হয়েছেন স্বাবলম্বী, এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন অন্যদেরও। কিন্তু জীবন সংগ্রামে বিজয়ী এদের প্রতিষ্ঠা লাভের দুর্বিসহ গল্প জানেননা অনেকেই। এবারের জয়িতা অন্বেষণে অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও চাকুরী, সংসার ও নারী নির্যাতনের বিভীষিকা মূছে ফেলে ঘুরে দাঁড়ানো এমনই চারজন সফল নারীকে খোঁজে এনে আর্ন্তজাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসে সংবর্ধনা দিয়েছে বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। এ চারজনের একজন পারভীন আক্তার উপজেলা ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ট জয়িতা নির্বাচিত হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
স্মৃতি রবি দাস : শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারীর নাম স্মৃতি রবি দাস। উপজেলার বাহারপুর গ্রামের হত দরিদ্র সহদেব রবি দাস ও সুমিতা রবি দাসের মেয়ে স্মৃতি রবি দাস তালিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিইসি পাস করে ২০০১ সালে তালিমপুর বাহারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হন। ৫ ভাইবোনের মধ্যে ৩ জনই লেখাপড়া করতো। বাবা পরিবারের ব্যয়ভার বহন করে লেখাপড়ার প্রয়োজনীয় টাকা দিতে পারতেন না। তাই অর্থনৈতিকভাবে অনেক কষ্টে মাধ্যমিক শিক্ষা চালিয়ে যান। লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ দেখে স্কুলের শিক্ষক সুবোধ চন্দ্র দাস স্মৃতি রবি দাসকে উৎসাহ দিতেন এবং গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে ফ্রি প্রাইভেট পড়াতেন। ফলে ২০০৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উক্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে সংসারের কাজকর্ম, অসুস্থ বাবা ও মায়ের চিকিৎসা ব্যয় মিটানোসহ পরিবারের সবকিছুরই দায়িত্ব নিতে হয় নিজের কাঁধে। চরম অর্থ সংকটে এবং পারিবারিক দুরাবস্থার কারণে লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে বড়লেখা বর্নি এম. মুস্তাজিম আলী মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ফ্রি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। কলেজ কর্তৃপক্ষ টিউশন ফি মওকুফ করায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয়নি। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ২০০৮ সালে এইচএসসি পাশের পর স্নাতকে লেখাপড়ার জন্য অনেক কষ্টে ২টি টিউশনি যোগাড় করেন। অধ্যয়নকালীন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ও মৌখিক পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গলগজা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ওই চাকুরীই তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ আরো সুগম করেছে। ২০১৩ সালে বিএসএস পাস করেন। ওই বছর অসুস্থ বাবা মারা যান। পরের বছর মাও চলে যান। কোন বিপদই তাকে লেখাপড়া ও সংসারের হাল ধরা থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ২০১৬ সালের এমএসএস পরীক্ষায় উক্তীর্ণ হন। পরে টাকা জমিয়ে এক ভাইকে বিদেশ পাঠান। জীবন সংগ্রামে সফল নারী স্মৃতি রবি দাস স্বামী ও এক সন্তান নিয়ে এখন সুখী জীবনযাপন করছেন।
রুপিয়া বেগম : অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারীর নাম রুপিয়া বেগম। তিনি উপজেলার পশ্চিম দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত ইশাদ আলী ও মৃত তছিরুন নেছার মেয়ে। ৫ বছর বয়সে বাবা মারা যান। ৫ বোনের চতুর্থ রুপিয়া বেগম ৬ষ্ট শ্রেণীতে অধ্যায়নকালিন মা মারা যান। অভাব অনটনের মধ্যেও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। নিজের বাড়িতে কুঠির শিল্পের দোকান দিয়ে সংসার চালান। নিজের উপার্জনের টাকায় ছোট বোনকে বিয়ে দেন, পাকার ঘর তৈরি করেন। নিজে বিয়ে না করে বড় বোনকে বিয়ে দেন। ৮ বছর পর বোনের স্বামী মারা যাওয়ার পর বোনের পরিবারেরও দায়িত্ব নিয়েছেন। বোনের তিন সন্তানের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ তিনি বহন করছেন। বিধবা ওই বোনের এক মেয়ে বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। বাড়িতে কুঠির শিল্পের দোকান দিয়ে সংসার নির্বাহ করছেন। রুপিয়া বেগম জানান, সরকারী দপ্তর থেকে ঋণ পেলে দোকান সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেকার অনেক নারীকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী করতে পারবেন।
শিবু রানী দাস : একক প্রচেষ্টায় দারিদ্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিভিন্ন পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত সফল জননী শিবু রানী দাস। স্বামী মৃত প্রহলাদ চন্দ্র দাস ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাদের ৪ মেয়ে এবং ২ ছেলে। ২০০০ সালে স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। অসুস্থ থাকায় চাকরি পূর্ণ হবার পূর্বেই স্বামীর পেনশনের টাকা তুলতে হয়েছিল। স্বামীর চিকিৎসায় তা ব্যয় হয়ে যায়। তখন ৩ মেয়ে এবং ২ ছেলের পড়ালেখাসহ জীবন যাপন কষ্টকর হয়ে পড়ে। পেনশন ভাতা পেতেন মাত্র ১৮৮০ টাকা। যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য। তখন ছোট মেয়ে তৃতীয় শ্রেনীতে, ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেনিতে, বড় ছেলে এইচএসসিতে এবং বড় দুই মেয়ে ডিগ্রীতে পড়তো। এমতাবস্থায় তাদের লেখাপড়ার খরচ এবং জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তখন তিনি সন্তানদের কোনো চাহিদাই মেটাতে পারতেন না। ছোট ছেলে-মেয়েরা কোন বায়না ধরলে কত মিথ্যা বুঝাতেন। এই অবস্থায় দুই দেবরের সহায়তায় বড় দুটি মেয়ের বিয়ে দেন। তারপর ৪ ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালাতে প্রচন্ড চাপে পড়েন। কিন্তু তিনি থামেননি। নিজে না খেয়েও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যান। বড় ছেলের অনার্স শেষ হওয়ার পর তার জীবনে নেমে আসে এক কঠিন পরীক্ষা। ধরা পড়ে হার্টে ব্লক। তখন জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সন্তানরাও মারাত্মক ভেঙ্গে পড়ে। সেই সময় এক দেবরের সহায়তায় বাইপাস অপারেশন করান। সেই থেকে এখন প্রতি মাসে চেকআপ করাতে ২০-২৫ হাজার টাকা লাগতো। প্রথম দিকে চেকআপ করা কষ্টসাধ্য হলেও এখন আর সমস্যা হয় না। কারণ বড় ছেলে পুলিশের ইন্সপেক্টর (তদন্ত) পদে কর্মরত। টাকার সমস্যা হচ্ছে না। ছ্টো ছেলে ও ছোট মেয়ে প্রাইমারিতে শিক্ষকতা করছে। ছোট মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে আজ স্ব ক্ষেত্রে তারা প্রতিষ্ঠিত। জয়িতা শিবু রানী দাস জানান, ছোটবেলা অভাব অনটনের কারণে যাদের ছোট্ট কোন বায়না মেটাতে পারতাম না আজ তারা আমার কোন চাহিদাই অপূর্ণ রাখছে না।
পারভীন আক্তার : নির্য়াতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করে সফলতা অর্জনকারী নারী বড়লেখার পারভীন আক্তার জানান, তার বাবা একজন ঠিকাদার ছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় পড়াশুনা করানোর অঙ্গীকার নিয়ে আবুল হোসেন নামে এক যুবকের সাথে মা তার বাল্যবিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী তাকে স্কুলে যেতে দেয়নি। বইপত্র ও স্কুল ব্যাগ পুড়িয়ে ফেলে। এরপর লুকিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যান। কিছু দিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন স্বামী মাদকাসক্ত। এরপরও ঘরসংসার করতে থাকেন এবং স্বামীর অগোচরে পড়াশুনা চালিয়ে এসএসসি পাস করেন। এর মধ্যে তাদের দুই সন্তানের জন্ম হয়। এদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বামীর সব অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করছিলেন। কিন্তু কোনভাবেই সে সংশোধিত না হয়ে অত্যাচারের মাত্রা বাড়াতে থাকে এবং পরনারীতে আসক্ত হয়ে উঠে। অবশেষে বাধ্য হয়ে ২০০৯ সালে স্বামীকে তালাক দিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেন। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে একটি বেসরকারী টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ফিজিওথ্যারাপি মেশিনের ব্যবসা চালিয়ে সফলতা পান। যোগ দেন মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্সে। ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চালিয়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এর সুবাদে বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেন। জীবন সংগ্রামে থেমে না থাকা এ নারী ২০১৪ সালে বড়লেখা উপজেলার হিনাইনগর গ্রামের কাতার প্রবাসী ইকবাল হোসেনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ট জয়িতা পারভীন আক্তার জানান, প্রথম স্বামীর নির্যাতনের বিভীষিকাময় স্মৃতি আর হতাশার জীবন মুছে বর্তমানে তিনি ৩ সন্তান ও প্রবাসী স্বামী নিয়ে সুখের সংসার করছেন। জীবন সংগ্রামে তার পথ চলা থেমে নেই। যেতে চান আরো অনেক দুর।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামছুন্নাহার জানান, পাঁচ ক্যাটাগরীর জয়িতা অন্বেষণ কার্যক্রমে এবার বড়লেখায় সমাজ উন্নয়ন ক্যাটাগরীতে কাউকে নির্বাচিত করা যায়নি। অন্য চার ক্যাটাগরীতে জীবন সংগ্রামে সফলতা অর্জনকারী ৪ নারীকে (জয়িতা) নির্বাচিত করে তাদেরকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে পারভীন আক্তার জেলা শ্রেষ্ট জয়িতা নির্বাচিত হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: