সর্বশেষ আপডেট : ৯ ঘন্টা আগে
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

শিক্ষকদের নিকট জাতির প্রত্যাশা

লেঃ কর্নেল সৈয়দ মোঃ রফিকুল ইসলাম ::
শিক্ষকগণ গুরুজন, গুণীজন, মানুষ গড়ার কারিগর এবং একটি জাতির বিবেক। শিক্ষক হচ্ছেন পিতৃতুল্য, যাদের ভালোবাসা, স্নেহ ও শাসনে শিক্ষার্থীরা বিদ্যাপীঠে বেড়ে ওঠে, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে চলে যায় আলোকময় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, নেতৃত্ব দেয় রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে; ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। শিক্ষক শব্দটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, সমাজের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে যারা আছেন তারা হলেন শিক্ষক। কিন্তু পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষকরা কি তাদের মহামূল্যবান মর্যাদার আসনে আসীন আছেন? নির্দ্বিধায় বলা যায়, তাদের অনেকেই মর্যাদার সেই অবস্থানে নেই, স্থানচ্যুতি হয়েছে যথেষ্ট।

আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক ও পারিবারিক জীবন ব্যবস্থার কারণে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক মূল্যবোধ হ্রাস পেয়েছে অনেকাংশে। দূর্নীতি গ্রাস করেছে সমাজের সকল স্তরকে। শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থা এর বাইরে নয়। অতিমাত্রায় বৈষয়িক চিন্তায় মানুষ এখন বিভোর। শিক্ষকদের মাঝেও ঢুকেছে অতিমাত্রায় বৈষয়িক চিন্তা। দ্রুত ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁরাও পিছিয়ে নেই। ফলে শিক্ষক হিসেবে তাঁদের যা করার কথা তা জানা থাকলেও যেন পালন করার সময় নেই। অনেকেই পরিবর্তনশীল সমাজ ও সময়কে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরনে ব্যর্থ হচ্ছেন, ম্লান করছেন তাদের স্বীয় মর্যাদা। যদি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের জিজ্ঞাসা করা হয়, শিক্ষকদের নিকট কী প্রত্যাশা করেন? নিশ্চয়ই তারা বলবেন, শিক্ষকগণ হবেন এমন যাদের আদর্শ সকলের নিকট অনুকরণীয় হবেন। যাঁরা সততা, সত্যনিষ্ঠ, ন্যায় পরায়ণতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিকট দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন । শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ এবং সকল শিক্ষর্থীদের সঙ্গে সমভাবে আচরণ করবেন। শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের মাঝে শৃঙ্খলাবোধ ও নৈতিকতা জাগ্রত করবেন, শাসন করবেন তবে তিরস্কার করবেন না।

মনে রাখতে হবে, এই প্রজন্মের বাচ্চাদের খেলাধুলা ও শরীরচর্চার অভাব এবং কায়িক পরিশ্রমে অনভ্যস্ততা, খাদ্যাভ্যাস ও ভার্চুয়াল কেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থায় বেড়ে উঠায় তাদের শারীরিক, মানসিক ও মনোস্তাত্ত্বিক গঠনে এসেছে পরিবর্তন। এরা অতি মাত্রায় আবেগপ্রবণ এবং আবেগ/কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের তুলনামূলক কম, বিশেষ করে ছাত্রীদের। শাসন করা মানে অপমান কিংবা শারীরিক বা মানসিক আঘাত নয়, শিক্ষকদের শাসন হবে উপদেশ ও প্রেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষকদের আস্থা অর্জন করতে হবে যেন তাদের শাসন ও উপদেশ শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে; শাসন করতে যেয়ে যেন কোন বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। কোন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্তের পূর্বে অবশ্যই ঐ শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থীর এ সংক্রান্ত প্রফাইল তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত ।

শিক্ষকগণ হবেন এমন, যেন নিজস্ব বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের বাইরেও নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবেন, পরীক্ষার খাতাগুলো নিজে ভালভাবে দেখে ভুলগুলো চিহ্নিত করে তা সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিবেন। যে সকল শিক্ষার্থী শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ে সেই শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সুযোগ কিংবা পরীক্ষার খাতায় অধিক নম্বর দেওয়ার বহুল প্রচারিত অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ দিবেন না। শ্রেণিকক্ষে কিংবা এর বাইরে শিক্ষার্থীদের সকল প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকবেন, কখনও বিরক্ত হবেন না, কিংবা তাদের অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য রাগ করবেন না । ক্লাসে আনন্দের সঙ্গে পাঠদান করবেন, যেন শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আগ্রহভরে মনোযোগের সঙ্গে ক্লাসে অংশগ্রহণ করে। বইয়ের সঙ্গে বাস্তবের মিল দেখিয়ে পড়াবেন। শিক্ষকগণ সর্বদা পূর্ণপ্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসবেন, মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীদের বয়স কম হলেও তারা শিক্ষকদের এ বিষয়টি নিজেদের মতো করে মূল্যায়ন করতে সক্ষম। ক্লাসের জন্য নির্ধারিত সময়ের যথাযথ ব্যবহার করবেন, নাম ডাকা কিংবা অপ্রাসঙ্গিক গল্পের মাধ্যমে সময় নষ্ট করবেন না। শিক্ষকগণ কোচিং বাণিজ্যে লিপ্ত না হয়ে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শ্রেণিকক্ষেই পাঠদানের ব্যবস্থা করবেন এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস পরিচালনা করবেন। গাইড বই এর উপর নির্ভরশীল না হয়ে টেক্সট বইয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং নিজেরাই পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করবেন। সৃজনশীল শিক্ষাকে প্রসারিত করার জন্য শিক্ষকগণ সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, আধুনিক প্রযুক্তি বা শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারে সক্ষম হবেন এবং মূল শিক্ষার পাশাপাশি সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।

শিক্ষক নিজ সন্তানের ন্যায় শিক্ষার্থীদের বিপদে পাশে থাকবেন। শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব না দিয়ে দুর্বলদের দিকে অধিক নজর দিবেন। দুর্বলকে সবল করতে পারার মধ্যেই অধিক কৃতিত্ব ও আনন্দ উপলব্ধি করবেন। শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের কোনো ভুল অকপটে স্বীকার করবেন এবং অজানা বিষয়কে জেনে তাদের পরবর্তীতে জানাবেন। শিক্ষকগণ এমন হবেন যেন তাঁদের শিক্ষকতা, স্নেহ ও ভালোবাসা শিক্ষার্থীরা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করেন এবং তাঁদের বার্ধক্যেও শিক্ষার্থীরা খোঁজ রাখেন, শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ও তাদের দোয়া প্রার্থী হন।

বর্তমান সরকার শিক্ষার আমূল সংস্কারসহ সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ও এর প্রসার ঘটিয়েছেন। শিক্ষকদের সকল সুযোগ-সুবিধা, সম্মান ও সম্মানি বৃদ্ধি করেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত সরকারের সকল পদক্ষেপের সফল বাস্তবায়ন একমাত্র শিক্ষকদের মাধ্যমেই সম্ভব। তাই শিক্ষকদের নিকট জাতির প্রত্যাশা সীমাহীন, যা বর্ণনাতীত ।

লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, জাহানাবাদ, খুলনা।

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: