সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

মেয়ে হয়েও ছেলের ভান করে ১৮ বছর পার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: অন্য মেয়েদের মতো লম্বা চুল রাখার স্বপ্ন দেখেন সিতারা ওয়াফাদার। কিন্তু আফগান কিশোরী হওয়া সত্ত্বেও এক দশকের বেশি সময় ধরে নিজেকে ছেলে হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরে আসছেন তিনি। বাবা-মা তাকে এভাবে মেয়ে হয়েও ছেলের বেশে থাকতে বাধ্য করেছেন।

পাঁচ বোন রয়েছে সিতারার; কিন্তু ভাই নাই। ‘বাছা পোশি’ নামে সেখানে এক ধরনের সামাজিক রীতি-নীতি আছে। দারি এলাকায় এই প্রথা অনুযায়ী ছেলেদের পোশাক মেয়েরা পরে। পিতৃতান্ত্রিক আফগানিস্তানে পরিবারের দায়-দায়িত্ব পালন করতে হয় ছেলেকে।

পূর্বাঞ্চলের নানগারহার প্রদেশের দারিদ্রপীড়িত এক পরিবারে জন্ম সীতারার। সেখানে একটি মাটির ঘরে বসবাস করেন ১৮ বছর বয়সী সিতারা; যার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটে গেছে ছেলের ভান করে।

jagonews24

প্রত্যেকদিন সকালে সীতারা ঢিলেঢালা শার্ট ও ট্রাউজার পরার পাশাপাশি আফগান তরুণদের মতো গলায় মাফলারের মতো একখণ্ড কাপড় ঝুলিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, তার ছোট বাদামী চুল ঢেকে রাখতে হয় স্কার্ফে; কণ্ঠ নিচু করে ছেলেদের মতোই কথা বলতে হয়।

সীতারা বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, আমি নিজেকে কখনোই মেয়ে মনে করি না। নানগারহার প্রদেশের একটি ইট-ভাটায় তার বাবার সঙ্গে কাজ করেন সীতারা। ইট-ভাটার মালিকের কাছে থেকে অর্থ ধার নেয়ায় সপ্তাহে ছয়দিন তাদের কাজ করতে হয়।

‘‘বাবা সব সময় বলেন, ‘সিতারা আমার বড় ছেলের মতো। মাঝে মাঝে… তার বড় ছেলে হিসেবে আমি অনেকের শেষকৃত্যেও অংশগ্রহণ করি।’’ এই শেষকৃত্যে কখনই একজন মেয়ে অংশ নেয়ার অনুমতি পায় না।

jagonews24

কঠোর রক্ষণশীল আফগানিস্তানে ‘বাছা পোশি’র দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যেখানে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অনেক বেশি মূল্যবান মনে করা হয় এবং নারীরা একরকম গৃহে বন্দিজীবন কাটান।

স্বাভাবিকভাবে যে পরিবারে উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো পুরুষ নেই; তারা পরিবারের মেয়েকে ছেলের পোশাক পরিয়ে দেন; যাতে সে কোনো ধরনের হয়রানি অথবা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া ছাড়াই পরিবারের দায়-দায়িত্ব পালন করতে পারে।

কিন্তু আফগানিস্তানে এমন অনেক নারী আছেন যারা স্বেচ্ছায় ছেলেদের মতো করে চলার পথ বেছে নেয়। দেশটিতে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে মনে করা হয় নারীদের। ছেলেদের মতো অবাধ ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ নিতে তারা এ কৌশল অবলম্বন করেন।

jagonews24

তবে বয়োঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর অনেক মেয়েকে আর ছেলের পোশাক পরতে দেয়া হয় না। সীতারা বলেন, ‘ইট-ভাটায় নিজের সুরক্ষার জন্য তিনি ছেলেদের পোশাক পরা অব্যাহত রেখেছেন।’

‘আমি যখন কাজে যাই, তখন অনেক মানুষই বুঝতে পারেন না যে, আমি একজন মেয়ে। তারা যদি বুঝতে পারে যে ১৮ বছর বয়সী একজন মেয়ে সকাল-সন্ধ্যা ইট-ভাটায় কাজ করছে; তাহলে তারা অনেক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এমনকি আমাকে অপহরণও করা হতে পারে।’

‘‘স্বপ্ন যখন রশিতে বাঁধা’’

সীতারার বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন থেকেই ইট-ভাটায় কাজের শুরু। তার অন্য চারবোনের দেখানো পথেই ইট-ভাটাকে বেছে নিতে হয় তাকে; যারা স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে যাচ্ছে ইট-ভাটায়। বিয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের এ পেশা চালিয়ে যেতে হবে; বিয়ের পর বন্দি হতে হবে গৃহে।

jagonews24

একদিনে সর্বোচ্চ ৫০০ ইট বানাতে পারেন সীতারা, বিনিময়ে পান মাত্র ১৬০ আফগানি মুদ্রা (যা ২ ডলারের একটু বেশি)। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ইট তৈরির কাদা-মাটির মিশ্রণ তৈরি করেন তিনি। পরে সাচে ভরিয়ে মাটিকে ইটের রূপ দেয়ার পর রোদে শুকাতে দেন; সকাল সন্ধ্যার এ কাজে কড়া রোদে তার ত্বক বাদামী রঙ ধারণ করেছে।

‘আমি যা করছি সেটা নিয়ে লজ্জা অনুভব করি না। কিন্তু মানুষ আমাকে বলে, তুমি বয়োঃসন্ধিতে পৌঁছেছো এখন তোমার ইট-ভাটায় কাজ করা ঠিক নয়। কিন্তু আমি কি করবো? আমার তো অন্য কোনো পথ নেই।’

সীতারার বাবা নুর বলেন, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে ছেলে সন্তান দেন নাই। মেয়েকে ছেলের মতো পোশাক পরানো এবং কাজে বাধ্য করানো ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।’

ওই ইট-ভাটার মালিক ও তার স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় ২৫ হাজার আফগানি মুদ্রা ঋণ নিয়েছে এই পরিবারটি। সীতারার মা ডায়াবেটিকে আক্রান্ত হওয়ার পর তার চিকিৎসায় এ অর্থ ব্যয় হয়েছে।

নুর বলেন, ‘আমার যদি একটি ছেলে সন্তান থাকতো তাহলে এসব সমস্যার মুখোমুখি হওয়া লাগতো না এবং আমার মেয়েদের জীবনও শান্তিপূর্ণ ও সুখের হতো।’

jagonews24

‘সব দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র আমার ও সীতারার কাঁধে। পরিবারের ভরণ-পোষণ ও ঋণ শোধ করতে হয় আমাদের।’

‘‘আমার যদি একটা ভাই থাকতো’’

কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক বারিয়ালাই ফেতরাত বলেন, আফগানিস্তানের বিশেষ রক্ষণশীল এলাকাগুলোতে ‘বাছা পোশি’ রীতি-নীতি চালু আছে। পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়ে হয়েও কিছুদিন ছেলের পোশাক পড়ায় অনেক সময় মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরেন।

ফেতরাত বলেন, স্বামীর বাধ্যগত স্ত্রী হিসেবে থাকা অথবা স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরে যাওয়া এই তরুণীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে তারা হতাশাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া সহিংস হয়েও উঠতে পারে তারা।

সীতারার মা ফাতিমার চাওয়া তার মেয়ে নারীদের পোশাক পরে বাড়িতে থাকুক। কিন্তু ‘তাকে বাজার-পাট করতে হয়, মাকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়। এছাড়া আমার স্বামীর বয়স বেড়ে যাওয়ায় সীতারাকে অন্যান্য কাজও করতে হয়।’

সীতারা তার এই পরিণতিকে ‘অবিচার’ এবং ‘অন্যায়’ হিসেবে মনে করলেও তার এক ছোট বোনের কথা চিন্তা করে ইট-ভাটার কাজে সায় দিলেন। সীতারা বলেন, ‘তিনি যদি এই কাজ এখনই বন্ধ করে দেন তাহলে ১৩ বছর বয়সী ছোট বোনকে একই পরিণতি বরণ করতে হবে।’

‘আমি কঠোর পরিশ্রম করবো; কারণ আমি চাই না আমার ছোট বোনও ছেলেদের পোশাক পরুক এবং ভাটায় কাজ করুক। যদি আমি কাজ না করি তাহলে আমাদের অনেক দুঃখ-কষ্ট এবং সমস্যা দেখা দেবে।’

প্রায় এক দশক ছেলের ভান করে কাটিয়ে দিলেও সীতারা কল্পনা করেন যদি তার একটা ভাই থাকতো তাহলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, লম্বা চুল রাখা ও স্কুলে যাওয়ার দৃশ্যটা কেমন হতো।

‘ছেলেদের পোশাক পরার সময় আমার মনে হয়, যদি আমার একটা ভাই থাকতো তাহলে হয়তো স্বপ্ন পূরণ হতো।’

এএফপি অবলম্বনে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: