সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শনিবার, ২৮ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

সুর সম্রাট বিটোফেন: বধিরত্ব বনাম নাইনথ সিম্ফনি

নিউজ ডেস্ক:: ক্যালিফোর্নিয়ার প্রখ্যাত এক মেডিসিনের প্রফেসর একবার ক্লাস নেওয়ার সময় মেডিকেল ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘ধরো বাবা ভুগছেন সিফিলিস রোগে, মা যক্ষা রুগী, এ পর্যন্ত তাদের চারটি ছেলেমেয়ে হয়েছে। প্রথমটি অন্ধ, দ্বিতীয়টি মৃত, তৃতীয়টি কানে শোনে না এবং চতুর্থটি যক্ষা রুগী। মা আবার সন্তানসম্ভবা, সেই মুহুর্তে ঐ দম্পতি তোমাদের কাছে আসলো পরামর্শের জন্য, তোমরা তাদের কি পরামর্শ দেবে?’

এবার ছাত্ররা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে আলোচনা করে তাদের সিদ্ধান্ত প্রফেসরকে জানালো। প্রতিটি গ্রুপই বললো,অবশ্যই ওই নারীর গর্ভপাত করানো উচিত। সেটাই তার জন্য ভালো হবে।

তখন প্রফেসর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘অভিনন্দন তোমাদের, তোমরা এইমাত্র সুরসম্রাট বিটোফেনের জীবনটা নিয়ে নিলে!’

ওই শিক্ষক কিন্তু মিথ্যা বলেননি। ওই দম্পতির পঞ্চম সন্তান হচ্ছেন বিখ্যাত সুরকার বিটোফেন। তার পুরো নাম  লুডউইগ ভন বিটোফেন। তার জন্ম ১৭৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর, জার্মানির বন শহরে। পাশ্চাত্য সংগীতের ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক যুগের অন্তর্বর্র্তীকালীন সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, সংগীতজ্ঞ ও শ্রোতারা তার কাছে নানাভাবে ঋণী।

শৈশবেই বিটোফেনের সংগীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। এ সময় তিনি বাবার কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। বনে প্রথম ২২ বছরের জীবনে তিনি বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ মোজার্টের সঙ্গে অধ্যয়ন করতেন। সংগীতের আরেক দিকপাল যোশেফ হেইকেনও তার বন্ধু হয়েছিলেন এ সময়েই। ১৭৯২ সালে বিটোফেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে আসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানেই থাকেন। ফরাসি বিপ্লব এই মহান সুরকারকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার অনেক কম্পোজিশন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এর মধ্যে ‘মুনলাইট সোনাটা’র সঙ্গে স্নিগ্ধ আর বিষাদ ভাব রয়েছে বলে এর খ্যাতি আকাশচুম্বী। বিটোফেন পিয়ানোয় ‘পিয়ানো সোনাটা নং ফোরটিন ইন সি সার্প মাইনর’ নামে একটি কম্পোজিশন করেছিলেন, যা কোয়াসি ইনা ফানটাসিয়া নামে পরিচিত। এটিই সাধারণভাবে ‘মুনলাইট সোনাটা’ নামে পরিচিত। তবে বিটোফিনের সবচেয়ে বিখ্যাত কম্পোজিশন হচ্ছে নাইন সিম্ফনি।

নাইনথ সিম্পনি এবং বিটোফিনের বেদনা

জার্মানীর এই বিশ্বখ্যাত মিউজিক কম্পোজার আমাদেরকে বিমোহিত করে রেখেছেন তার নাইনথ সিম্ফনী দিয়ে, যা এখনো বিশ্বের বড়ো কোনো ইভেন্টে বাজানো হয়ে থাকে। বার্লিন প্রাচীর ভাঙার দিনও এটি  বাজানো হয়েছিলো। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, নাইনথ সিম্ফনী কম্পোজ করার সময় বিটোফেন বধির ছিলেন। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প আছে, নাইনথ সিম্ফনীর প্রিমিয়ার শেষে শ্রোতাদের তুমুল করতালি শোনার আশায় বিটোফেন চারপাশে তাকালেন, সবার করতালি দেখতে পেলেন কিন্তু কিছুই শুনতে পেলেন না। তিনি কাঁদতে থাকলেন। এর কিছুকাল পর, ১৮১১ সালের দিকে বিটোফেন নিজের পিয়ানো কনসার্টে কানে না শোনার জন্য একদমই পারফর্ম করতে পারেননি, সেটাই ছিল তার শেষ কনসার্ট।

কানে কম শোনার সমস্যা বিটোফেনের ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকেই শুরু হয়। ১৮০১ সালে ডাক্তারের পরামর্শমতো হাওয়া বদল করতে অস্ট্রিয়ার শহর হেলিগেন্সট্যাডে গেলে সেখান থেকে ১৮০২ সালে তার দুই ভাই জোহান এবং কার্লের কাছে একটি চিঠি লিখেন, যা ১৮২৭ সালে বিটোফেনের মৃত্যুর পর তাঁর ডেস্কেই পাওয়া যায়। তারমানে চিঠিটা কখনোই পোস্ট করা হয় নি।

ওই চিঠিতে বিটোফেনের তখনকার মানসিক দুরবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায়। চিঠির প্রতিটি পরতে পরতে কানের সমস্যার জন্য তার আত্মহত্যা করার সুতীব্র বাসনা ফুটে উঠে, শেষে তাঁর দুই ভাইকে অনুরোধ করেন তার মৃত্যুর পর তার এই শারীরিক সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখতে। তাঁর অনুরোধের প্রায় দুইশত বছর পর এই সমস্যার কারণ জানা গেছে, সম্পূর্ণ অদ্ভুত এক উৎস থেকে, আর তা হলো বিটোফেনের নিজের মাথার চুল!

সর্বকালের সেরা ইয়োরকা বিটোফেন

বিটোফেন তার তিন নাম্বার সিম্ফনি ইরোয়কা উত্সর্গ করেছিলেন সম্রাট নেপোলিয়ানের উদ্দেশ্যে। ১৮০৩ সালে লেখা এ সিস্ফোনি ১৮০৫ সালে ভিয়েনার মঞ্চে প্রথম পরিবেশন করা হয়। ২০১৬ সালে পৃথিবীর সেরা সুরকারদের কম্পোজিশনগুলো নিয়ে জরিপ চালায় বিবিসি মিউজিক ম্যাগাজিন। এতে সর্বকালের সেরা সিম্ফনি হিসেবে নির্বাচিত হয় ইরোয়কা। এ তালিকায় আরো রয়েছে ১৮২৪ সালে লেখা বিটোফেনেরই নবম সিম্ফনি ‘কোরাল’। এখানেই শেষ নয়, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ সুরকারের পঞ্চম সিম্ফনিটি রয়েছে বিবিসির তালিকার ১১ নম্বরে।

বিবিসি ম্যাগাজিনের এডিটর অলিভার কন্ডি বলেন, বিটোফেন ইরোয়কা সৃষ্টি করেছেন প্রায় দুইশ বছর আগে। কম্পোজিশনটির মৌলিকতা আজো অটুট। কনডাক্টররা এখনো এটি পরিবেশন করতে ভালোবাসেন। সুরের ওঠানামা আর বাঁকবদলের এক অপূর্ব নিদর্শন সিম্ফনিটি।

অলিভার থেকে আরো একধাপ এগিয়ে ব্রিটিশ কনডাক্টর জোনাথন নট বলেন, বিটোফেনের এ কম্পোজিশনটি অনেকটা প্রথাভাঙ্গা। যেখানে কেবল অসীমের উপাসনা করা হয়নি। এতে রয়েছে মানবতা, লড়াই, স্পর্ধা ও জয়ের গল্প।

তবে ইরোয়কা সম্পর্কে যে তথ্যটি না জানালে নয়, তা হলো—নেপোলিয়ান বোনাপার্টের কর্মজীবনকে উদযাপন করার প্রয়াসে লেখা বলে শুরুতে বিটোফেন এ সিম্ফনির নাম রেখেছিলেন বোনাপার্টে। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন নেপোলিয়ান নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন ও নিজেকে অত্যাচারি রাজা হিসেবে জাহির করেছেন, তখন পাণ্ডুলিপি থেকে নেপোলিয়ানের নামটি ঘষেমেজে উঠিয়ে দিয়েছিলেন বিটোফেন, যার প্রমাণ যায় মূল পাণ্ডুলিপির কিছু সুক্ষ্ম ছেদে।

হৃৎস্পন্দনের সাথে মিলিয়ে সঙ্গীত রচনা করতেন বিটোফেন

তিনি  ছিলেন সঙ্গীতের জগতে ক্ল্যাসিক্যাল এবং রোমান্টিক স্টাইলের মাঝে মেলবন্ধন সৃষ্টিকারী। অনেকেই বলেন তার সঙ্গীত একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তার কারণ হতে পারে এই, যে তিনি নিজের হৃৎস্পন্দনের সাথে মিলিয়ে সঙ্গীত রচনা করতেন। বিটোফেনের সবচাইতে বিখ্যাত কিছু সঙ্গীতের মাঝে দেখা যায় বিরল ছন্দ। ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত বিটোফেনের অ্যারিদমিয়া নামের এক হৃদরোগের সাথে এই ছন্দের যোগ আছে। গবেষকদের মাঝে ছিলেন একজন কারডিওলজিস্ট, একজন মেডিক্যাল হিস্টোরিয়ান এবং একজন মিউজিকোলজিস্ট। তারা ধারণা করেন এই কম্পোজারের এই রোগটি থাকতে পারে এবং এর প্রকাশ ঘটতে পারে তার সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে। । তারা বিটোফেনের কিছু কম্পোজিশনের ছন্দ বিশ্লেষণ করেন এবং আসলেই দেখা যায়, কারডিয়াক অ্যারিদমিয়ার ছন্দের সাথে এদের মিল রয়েছে। হৃদরোগের ফলে যখন হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে, তখন তাতে কিছু নির্দিষ্ট ছন্দ দেখা যায়। গবেষকেরা এমনই কিছু ছন্দ খুঁজে পান বিটোফেনের সঙ্গীতে। কারডিয়াক অ্যারিদমিয়ার ফলে হৃৎস্পন্দন বেশি ধীর, বেশি দ্রুত অথবা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এমনই ছন্দ দেখা যায় বিটোফেনের “কাভাটিনা” এর শেষের দিকে, পিয়ানো সোনাটা এ-ফ্ল্যাট মেজর, ওপাস ১১০ এসব সঙ্গীতে অনিয়মিত ছন্দ দেখা যায়। বিভিন্ন হিস্টোরিয়ান এবং ফিজিশিয়ানদের কাছে এমন তথ্য আছে যাতে প্রমাণ করা যায় অন্যান্য অসুস্থতার পাশাপাশি বিটোফেনের হৃদরোগ থাকতে পারে। এছাড়া বধির হবার কারণে নিজের হৃদস্পন্দনের প্রতি তিনি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকতে পারেন, যে কারণে তার সঙ্গীতের ওপর এর প্রভাব দেখা যায়।

সুরের জাদুকর বেটোফিনের অনেক আক্ষেপ ছিল তার বধিরত্ব নিয়ে। আঠারশ সালের গোড়া থেকেই তার কানে কম শোনা শুরু।  মৃত্যুর আগের দশকে পুরোপুরি বধির হয়ে পড়েন। ১৮২৭ সালের আজকের এই দিনে (২৬ মার্চ) পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই সুরবিশারদ মৃত্যুবরণ করেন।

নাইনথ সিম্ফনির ভিডিও

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: