সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET
Fapperman.com DoEscorts

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

‘রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে-কবি এসে দাঁড়ালেন মঞ্চে/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি-‘এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’

আজ সেই অগ্নিঝড়া ৭ মার্চ। বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের একটি অনন্য ও অনবদ্য এবং অসামান্য দিন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চের এই দিনটির জন্যই যেন বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছিল বাঙালি জাতি-যেদিন বিশ্বের রাজনীতির ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠতম জনসভায় শ্রেষ্ঠতম ভাষণ দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র সাড়ে ১৮ মিনিটের ভাষণে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার আকাঙ্খা এবং পূর্বাপর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তির সংগ্রামের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের আজকের এই রৌদ্রস্নাত বিকেলের বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি বাঙালির জন্য ছিল একটি অগ্নিমন্ত্র এবং একটি অদম্য অনুপ্রেরণার উৎস-যে বজ্রকন্ঠ শুনে মুক্তিযোদ্ধরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো-যে বজ্রকণ্ঠ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে বেজে উঠলেই বাঙালিরা তা শুনে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর সব আক্রমণ, অত্যাচার, নির্যাতন, বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করেও স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠতো-আজ সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ।

১৯৭১-এর ১ মার্চ পাকিস্তানের জল্লাদ প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ৩ মার্চ থেকে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনিদিৃষ্টকালের জন্য বাতিল ঘোষণার প্রতিবাদে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ৭ দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোসণা করেন-তারই ধারাবাহিকতায় আসে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (আজকের সোহরাওংয়ার্দী উদ্যান) ১৯৭১-এর ৭ মার্চের জনসভা। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ দিনটি ছিল রোববার।

১৯৭১-এর ৭ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। সকাল থেকেই ‘মুজিব একটি নাম-মুজিব একটি ইতিহাস’ শীর্ষক একটি ট্যাবলয়েট পত্রিকা রেসকোর্স ময়দানের মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে দিয়ে যায় কয়েকজন হকার। এই শিরোনামে প্রকাশিত পত্রিকাটির মূূল বিষয়বস্তু ছিল রেসকোর্স ময়দানে আজকের জনসভায় বাঙালির মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন-তার ওপর বিভিন্ন পর্যালোচনা এবং আলোচনামূলক প্রতিবেদন।

হাজার হাজার মানুষ লঞ্চে, বাসে, ইস্টিমারে, ট্রেনে এবং পায়ে হেঁটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে আসতে শুরু করে। মুখে তাদের স্লোগান-‘শেখ মুজিবের পথ ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো- সোনার বাংলা মুক্ত করো।’ কারো হাতে বাঁশের লাঠি, কৃষকের হাতে লাঙ্গল ও জোয়াল, মাঝির হাতে নৌকার বৈঠা-বাঙালি জাতি ছুটে এসেছে আজ একটি মোহনায়-তারা শুনতে এসেছে বাঙালি জাতির এই ঘোরতর দুর্দিন আর দুঃসময়ে বাঙালির মহান নেতা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ঘোষণা দেন-কী দিক নির্দেশনা প্রদান করেন-তার জন্য লাখো মানুষের ঢল বিস্তৃত হয় রেসকোর্স ময়দান, প্রেসক্লাব, রমনা পার্ক, শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকায়। ঢাকা শহরের পথে পথে শুধু মানুষ ছুটে চলেছে রেসকোর্স ময়দানের দিকে-আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মিলিটারি সাজোয়া গাড়ির বহর সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে রমনা রেসকোর্স ময়দানের চারিদিকে-আকাশের ওপরে চক্কর দিচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার তারা মেশিনগানের নল তাক করে চক্কর দিয়ে যাচ্ছে জনসমুদ্রের ওপর দিয়ে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে ১৮ মিনিটের ভাষণে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা
কর্মসূচি অনুযায়ী ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বেলা আড়াইটায় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নানা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র এবং বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বিকেল সাড়ে ৩ টায় রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভার মঞ্চে এসে দৃপ্ত পায়ে উঠলেন বাঙালির শার্দুল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন রেসকোর্স ময়দান পরিণত হয়েছে এক জনসমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে। লাখো মানুষ বাঁশের লাঠিতে ছন্দ তুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়ি বহর রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই গর্জে ওঠে-‘শেখ মুজিবের পথ ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
মঞ্চে উঠেই ১৯৭১-এর ৭ মার্চের পড়ন্ত বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারিদিকে তাকিয়ে জনসমুদ্রের গর্জনের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শুরু করলেন তার অমর সেই ভাষণ-‘ভায়েরা আমার-আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন-আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়- আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভায়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়। বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়। বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম-নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন।

আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলী বসবে-আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো-এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়-২৩ বৎসরের ইতিহাস-বাংলার মানুষের করুণ আর্তনাদের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস-বাংলার মানুষের রক্তের আর্তনাদের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস-এদেশের মুমূর্ষু নরনারীর রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ নালে রক্ত দিয়েছি-১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই-১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে ১০ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে-১৯৬৬ সালে ৬ দফার আন্দেলনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ এভাবে পাকিস্তানি শাসক ও শোষক গোষ্ঠির ২৩ বছরের শোষণের করুণ ইতহাস এবং বাঙালি জাতির ওপর বঞ্চনার বিবরণ তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তির আকাঙ্খা তুলে ধরে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির উদ্দেশে কঠিনতম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের ওপর হত্যা করা হয়-তাহলে তোমাদের ওপর কাছে আমার অনুরোধ রইলো-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো-তোমাদের যা কিছু আছে-তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখ বা রক্ত যখন দিয়েছি-রক্ত আরো দেবো-এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম আর আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়ে এসেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিলেন বাঙালি জাতিকে। কিন্তু ১০ লাখ মানুষের এই সমুদ্র যাতে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াই পরিকল্পিতভাবে শুরু করতে পারে-সে জন্য কিছুটা সময় দিয়ে বললেন-‘আমি যুিদ হুকুম দেবার নাও পারি-তোমরা রাস্তা ঘাট-যা যা আছে সবকিছু বন্ধ করে দেবে।’ তারপর তিনি উচ্চারণ করলেন বাঙালি জাতির সেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ উচ্চারণ-শ্রেষ্ঠ ঘোষণা-‘এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম-সংগ্রাম।’ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটির সঙ্গে বাঙালি জাতি একাত্ম হলো। এরপর আর বাঙালি জাতিকে ফিরে তাকাতে হয়নি-বাঙালি জাতি পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: