সর্বশেষ আপডেট : ৩৪ মিনিট ৩২ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

যৌন বিকৃতদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

13140504_1032318993522253_1340180766_nদিনাজপুর টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটে প্রকাশ্য দিবালোকে ক্লাসে ঢুকে এক ছাত্রীকে মারধরের পর উলঙ্গ করে ভিডিও করা হয়েছে। অপরাধী ছাত্র দুজন হচ্ছে ৫ম পর্বের সুলতান মাহমুদ সিহাব এবং ইমরান হোসাইন। সিহাবের ক্রমাগত যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় অসহায় মেয়েটিকে আব্রু নষ্টের মাধ্যমে এভাবে অপমান অপদস্ত করা হয়! এমন ধৃষ্টতা আ্ইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের কথা স্মরণ করায়। মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথা মনে করায়।

এরা কি সত্যিই মানুষ, নাকি মানুষ নামের কলঙ্ক! দিন-দুপুরে মেয়েটির উপর এমন অত্যাচার হল; না এগিয়ে এলো ছাত্র-ছাত্রী, না এগিয়ে এলো কতৃর্পক্ষ। টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের কর্তৃপক্ষ এদেরকে কেন পুলিশে দিল না?

অবাক লাগে যে দিনাজপুর একদিন পুলিশের হাতে নির্যাতিত ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল। সেই দিনাজপুরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সারাদেশে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে এবং ভুক্তভোগি মেয়েসহ তাঁর পুরো পরিবারকে অসীম যন্ত্রণা, মানসিক নিগৃহের শিকার হয়ে এক ঘরে হতে হচ্ছে লোকলজ্জার ভয়ে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে কেবল মেয়েটির দোষ এবং তাঁর নির্যাতনের ছবি দেখতেই ব্যতিব্যস্ত। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে সমাজ একটি মেয়েকে অসম্মান করে কুৎসা রটনা করে তাঁর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিপতিত করতে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত একজন পুরুষেরও শাস্তির ছবি আসেনি, খবরও প্রিন্ট কিংবা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া যায়নি। তার মানে অপরাধ সংঘটিত করে অবাধে পার পেয়ে যাচ্ছে ক্রিমিনাল বা দোষী ব্যক্তি। দিনাজপুরে শ্রেণিকক্ষ থেকে অন্যান্য ছাত্র- ছাত্রীদের বেরিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে সাক্ষীর অভাব থাকার কথা নয়। ঘটনার পর নির্যাতিত মেয়েটিসহ অন্য ২২ জন শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সম্বলিত অভিযোগ পত্র অধ্যক্ষের কাছে দাখিল করলে কর্তৃপক্ষ ইমরানকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। কিন্তু মূল আসামী সিহাব ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়।

একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বের করে দিয়ে একটি মেয়ের সম্মানহানি যখন করা হচ্ছিল, তখন অধ্যক্ষ কি অভিযোগপত্র পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবেন এ আশায় বসে ছিলেন? শিক্ষাঙ্গনের শ্রেণিকক্ষেও যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন তাহলে অভিভাবকরা কেন মেয়েদেরকে শিক্ষাঙ্গনে পাঠাবেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের প্রসার ঘটিয়ে বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্র নায়কের আসনে, সেখানে এ কোন অসভ্য শক্তি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীর সম্ভ্রম নেয়ার ঔদ্ধত্য দেখায়।

অভিযোগ উঠেছে ছাত্র নামধারি কুলঙ্গার, নরপশু দুজন ছাত্রলীগের! ছাত্রলীগের ইতিহাস রক্তে লেখা গৌরবের ইতিহাস। ছাত্রলীগের ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে আত্মত্যাগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু নিজেই গর্ব করে বলতেন- ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। একদিন বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কমী হিসেবে গণতন্ত্রের সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেছিলাম বলে গৌরববোধ করি। ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষার অধিকার বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় একজন আদর্শ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে তৈরির জন্য মনোযোগী হবার কথা। ছাত্রলীগের রাজনীতি হবে আদর্শের পথে। বয়ে আনবে মানুষের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু এ দুইজন যদি সত্যি সত্যি ছাত্রলীগের কমী হয়ে থাকে তাহলে সমাজের জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠা এ আগাছা নির্মূলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উচিত দ্রুততার সাথে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। যাতে করে আর কেউ তাদের নোংরা মানসিকতা, অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে যেয়ে ছাত্রলীগকে কলঙ্কিত করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে। একই সঙ্গে আইনের আওতায় দ্রুত বিচারে এনে এদের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। আমাদের দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসকে এরা যেন কলুষিত করতে না পারে সেজন্য ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নের্তৃত্বকে কঠোর হতেই হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করার সাহস এদের কে দিয়েছে? মনে রাখতে হবে একটি সুন্দর বাগান নষ্ট করার জন্য একটি বানরই যথেষ্ট।

মাত্র দু’দিন আগে আহসান উল্ল্যাহ ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে। থাকতেন ইস্কাটনে। নির্লজ্জ শিক্ষকটি উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়েও পান্থপথে শ্বশুরের কাছ থেকে যৌতুকের ফ্ল্যাট নিয়েছিলেন। সেই ফ্ল্যাটে ছাত্রীদের ব্ল্যাকমেইল করতেন, যৌন নির্যাতন করতেন। এখানেও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অধ্যাপক মাহফুজুর রশীদ ফেরদৌসের মত যৌন বিকারগ্রস্ত শিক্ষকদের কাছে এর আগেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের উপর যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

যৌন বিকৃত কিছু কিছু পুরুষের লালসার শিকার হচ্ছে কিশোরী, তরুণী ও নারী। লোকলজ্জার ভয়ে, সমাজের ভয়ে, অভিভাবকদের শাসনে, বিয়ে-সংসারের আতঙ্কে সবগুলোর খবর হয় না। সমাজের নানা শ্রেণী পেশা থেকে শুরু করে পরিবারে সমাজে নারীর সম্ভ্রমের উপর বিকৃত পুরুষের পাপের চোখ পড়ছে। বিষের হাত পড়ছে। বেশিরভাগই গোপন থেকে যাচ্ছে। প্রকাশ হলেও সমাজ যেন, সমাজের কর্তারা যেন মেয়েটির দিকে, নারীটির দিকে বাঁকা চোখ দিচ্ছে। যে লাঞ্ছিত হচ্ছে, যেন লজ্জা তার! যে কারণে যৌন বিকৃত পুরুষ নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সম্ভ্রম লুটে নিতে ঔদ্বত্য দেখাচ্ছে।

দিন বদলাচ্ছে, নারী এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবার,সমাজ, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাঙ্গন, কর্মস্থল, ডাক্তারের চেম্বার, হাসপাতালের শয্যা, কোথাও নারী একা নিরাপদ নয়। এই লজ্জা নারীর নয়, নির্লজ্জ যৌন বিকৃত পুরুষের। সময় এসেছে নারীকে চুপ না হয়ে প্রতিবাদের, পাল্টা অপমানের।

সমাজের সামনে এদের মুখোশ খোলার সময় এসেছে। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমে এই অপরাধীদের ছবি ও পরিচয় তুলে ধরবার সময় এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। একটি আধুনিক একুশ শতকের সমাজ বিনির্মাণে নীরবে সহ্য না করে এখন সময় এদের বিরুদ্ধে সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার, প্রতিবাদ করার। মুষ্টিমেয় যৌন বিকৃত তরুণ ও পুরুষের জন্য একটি আলোকিত সমাজে অন্ধকার নেমে আসতে পারে না। দুদিন আগেই কুষ্টিয়া কলেজের অধ্যক্ষ বদরুদ্দোজা খালি বাসভবনে কুষ্টিয়া থেকে ডেকে নিয়ে তার যৌন লালসার চরিতার্থের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই ছাত্রীটি বের হয়ে গিয়ে সবাইকে জানালে প্রতিবাদের অগ্নিরোষ দেখা দেয় অধ্যক্ষের বাসভবন ঘিরে। নারীর সম্ভ্রমের ওপর যেখানেই যৌন বিকৃত কালো হাত এগিয়ে আসবে সেখানেই রুখে দাঁড়াতে হবে।

এটা মধ্যযুগ নয়। শিক্ষা সচেতনায় অর্থনীতিতে সমাজে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারী এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। লোক জানাজানির আর ভয় নেই। প্রতিবাদের ঝড় তুললেই মানুষের ঘৃণার দৃষ্টি অপরাধীর দিকেই নিক্ষিপ্ত হবে। যার সম্ভ্রমরে ওপর আঘাত এসেছে তার ওপর নয়। এই যৌন বিকৃত কালো শক্তির বিরুদ্ধে নারী-পুরুষ এক কাতারে রুখে না দাঁড়ালে একটি সভ্য নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই যৌন বিকৃত পুরুষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ। এই আকুতি আজ প্রতিটি লাঞ্চিত নারীরই নয়, নিরাপত্তাহীনতায় পথ হাঁটা প্রতিটি মেয়ের। নিরাপদে ঘরে না ফেরা প্রতিটি মেয়ের মা-বাবার।

লেখিকা: খুজিস্তা নূর-ই নাহারীন মুন্নী, সূত্র- পূর্বপশ্চিম।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: